এত সব শোনার ধৈর্য আমার ছিল না। তবু দাঁড়িয়ে সব শোনার পর বললাম, ধন্যবাদ। আর আসছি না। আমি জান গির্জা দেখতে বের হয়েছিলাম, এখন দেখছি গির্জায় সহজে কেউ যেতে পারে না, ইচ্ছে থাকলেও না। আমার মোহ ভেঙে দেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
-গির্জা।
–কাল সারারাত গির্জায় স্বপ্ন দেখেছি। তারপর কেন যে মুখ ফসকে বের হয়ে গেল, গির্জায় সিঁড়িতে তুমি আমি সারাক্ষণ বসেছিলাম স্বপ্নে। বিকেলে বের হয়ে পড়েছিলাম, আবার যদি সিঁড়িতে বসার সুযোগ পাই।
লতা বুচার আমার কথায় কী ভাবল কে জানে। সামান্য সময়, দূরে কী দেখল। তারপর বলল, তুমি এমনি আসতে পার। এলেই ফল কিনতে হবে কেন? ফল কেনার জন্য যদি আস তবে বোকামি করবে।
মেয়েরা এত সহজে এমন কথা বলতে পারে আগে জানতাম না। তার অকপট কথাবার্তায় আমার টান আরও বেড়ে গেল। সে কী বোঝাতে চাইল জানি না, একবার ভাবলাম জাহাজে ফিরে বন্ধু দেবনাথকে সব বলব—এ কথা বলল কেন! এমনি আসতে পার। ফল কেনার জন্য যদি আস তবে ঠকবে।
কেন যে বলতে গেলাম, তুমি কাউকে ভালোবাস? এও যেন মুখ ফসকেই বের হয়ে গেল। এত কথা মেয়েদের সঙ্গে বলার আমার অভ্যাস নেই। দেশে এই বয়সের কোনো অনাত্মীয়া নারীকে এমন বলতে পারি দূরে থাক, কথা বলতে গেলেই বুক কাঁপত। কে কী ভাববে! আমায় কো-এডুকেশন কলেজে ছাত্রীদের আগলাতেন অধ্যাপকরা।
লতার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হবার পর, আমায় কলেজ জীবনের কথা শুনে সে হেসে লুটিয়ে পড়ছিল!—বল কী! মেয়েদের জন্য আলাদা কমন রুম! অধ্যাপকদের পেছনে তারা আসে। ক্লাস হয়ে গেলে অধ্যাপকদের পেছন পেছন আবার চলে যায়। ভাবা যায় না।
আমি বললাম, সত্যি।
ত্রিশ-বত্রিশ বছর আগে আমাদের কলেজ জীবনের কথা ভাবলে এখন আমারও হাসি পায়। লতার কথা ভাবলে মন আমার এখনও খারাপ হয়ে ওঠে। কী সুন্দর মেয়েটা, শেষে কী না…
লতা সেদিন বলেছিল, কাউকে ভালোবাসি না। কাউকে না। ওর চোখ মুখ কেমন জ্বলছিল ক্ষোভে অপমানে। লতা আর আমার সঙ্গে একটি কথা ও বলেনি। সে তার কাজ করে যাচ্ছিল। পালকের ঝাড়ন দিয়ে থাক থাক ধুলো বালি ঝাড়ছিল। ঝুড়ি থেকে বের করে আপেলগুলো নেকড়া দিয়ে মুছে সাজিয়ে রাখছিল। আমি বলেছিলাম, উঠি।
সে বলেছিল, কাল আসছ?
–বলতে পারব না।
চলে আসছিলাম। সে ফেল ডাকল—শোনো।
আমি ফিরে গেলে বলল, গির্জার সিঁড়িতে বসে থাকব দুজনে। এখানেই অপেক্ষা করব। দোকান বন্ধ থাকবে কাল। এলে এমনিতেই পেতে না।
কাল আমারও ছুটি। কাল রবিবার। সবার ছুটি। লতা বুচারেরও। আমি কেন জানি সিঁড়িতে বসার লোভ সামলাতে পারলাম না।
পরদিন গেলে দেখলাম সে আমার জন্য সত্যি অপেক্ষা করছে। সে আমাকে নিয়ে হেঁটে গেল। গির্জার সিঁড়িতে বসে থাকল। তার দাদুর গল্প, মা-বাবার গল্প করল। মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। কাজটা না করলে, সে আর তার বুড়ো দাদু খুব অসহায়, খেতে পাবে না, আশ্রয় থাকবে না এমন সব বললে, টান আরও বেড়ে
জাহাজ আমাদের বিশ বাইশ দিন বন্দরে এমনিতেই থাকার কথা, কিন্তু ধর্মঘটের জন্য, কবে মাল খালাস শুরু হবে কেউ বলতে পারছে না।
কবে জাহাজ ছাড়ছে জানা নেই।
বিকেল হলেই আমার মন উতলা হয়ে উঠত। দোকানে গিয়ে বসে থাকতাম। সে খদ্দের সামলাত। আমি নিজেও তার হয়ে অনেক কাজ করে দিতাম। টাকা পয়সা গুনে দেওয়া পর্যন্ত। সে তার টিফিন বের করে খেতে দিত। না খেলে রাগ করত। কোনোদিন সে একটা আপেল দিয়ে বলত, খাও। জাহাজ তোমার কবে ছাড়ছে?
বলতাম, জানি না। সে টের পেত জাহাজের খবরে বিষণ্ণ হয়ে পড়েছি। বাড়ি না থাকায় আমার মা কোজাগরি লক্ষ্মীপূজায় চোখের জল ফেলেছে মন থেকে কেমন সব মুছে গেছে। এক অনাত্মীয়া এমন নিজের হয়ে যায়, এই প্রথম টের পেলাম।
এক রবিবারে সে আমাকে তাদের ট্যুরিস্ট স্পটে নিয়ে গেল। বিশাল বনভূমি, হ্রদ, পাহাড় টিলা, ঝোপ-জঙ্গল এবং এমন গভীর জঙ্গলের ভিতর কেন ঢুকে যাচ্ছে বুঝতে পারছি না। আমি কেমন কাতর হয়ে পড়ছি। বলছি, কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?
সে শুধু বলল, এস না!
সে কি আমাকে আজ জীবনের আরও কোনো গভীর বনভূমির খবর দিতে চায়। ও পরেছে, নরম উলের জ্যাকেট, পায়ে সাদা জুতো, নাইলনের মোজা, পায়ের রঙের সঙ্গে মিলে গেছে। হাত পা এত পুষ্ট, স্তন এত ভারী যে সে নড়চড়া করলে তারাও লাফিয়ে ওঠে। আমার মধ্যে এক অতর্কিত বাঘের আক্রমণ ঘটছে টের পেলাম। সে আমাকে নিয়ে পাশে বসল। জনহীন। দূরে কোনো পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। বিশাল গাছ সব চারপাশে। টিলার ছাদে উঠে এসে আমি হাপাচ্ছিলাম। ছোট্ট সবুজ উপত্যকা। সে আমার হাত টেনে শরীরের উষ্ণতা দেখল। ফ্লাকস থেকে কফি, ব্যাগ থেকে স্যাণ্ডউইচ, কিছু গ্রিন পিজ সেদ্ধ, চিজ এ-সব বের করে খেতে দিল—কিন্তু আমি টের পাচ্ছিলাম, তার শরীর আমাকে প্রলুব্ধ করছে। অতর্কিতে বাঘের আক্রমণ ঘটলে যা হয়ে থাকে, হঠাৎ সে আমার চোখে কী আবিষ্কার করে সব ফেলে দৌড়োতে থাকল।
আমি ডাকছি, সব ফেলে চলে যাচ্ছ কেন?
সে নেমে যাচ্ছে। বাঘের মতো আমাকে যেন ভয় পাচ্ছে।
আবার চিৎকার করে ডাকলাম, তুমি আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছ কেন? ফ্লাকস, ব্যাগ তুলে নিয়ে পিছনে ছুটছি। ওর কি মাথা খারাপ আছে! এ কিরে বাবা, নিয়ে এল আর এখন কিনা আমাকে ফেলে, ফ্লাকস ব্যাগ সব ফেলে ছুটছে।
