বললাম কত দাম?
মেয়েটি ফ্রক সামান্য তুলে বাউ করল। দাম বলল। খোঁপায় ফুল গোঁজা। সোনালি ফ্রক গায়। আমি যেন চিনি তারে—এই কি সেই মেয়ে, সে নীলনদের পাড় ধরে হেঁটে যায় কিংবা মিসিসিপির বনেজঙ্গলে সে কুঁড়েঘর বানিয়ে থাকে— অথবা শীতলক্ষ্যার পাড়ে আম জাম গাছের ছায়ায় বড়ো হয়। মুগ্ধ চোখ তার পৃথিবীর রহস্য বয়ে বেড়ায়।
কী হল কে জানে! এক ঠোঙা আপেল কিনে পয়সা দিলাম।
মেয়েটি আমায় বাউ করল, ঠোঙাটা হাতে দিয়ে মিষ্টি হাসল। যেন বলল আবার এস।
বন্ধু বলল, তুই কি পাগল, এগুলো কিনলি কেন? কে খাবে?
বের হবার সময় পেছন কিরে তাকালাম–ঠোঁটে সেই রহস্যময় হাসি। আমাকে দেখছে। একেই মরণ বলে কী না জানি না।
পরদিন একা বের হচ্ছি দেখে, সারেঙ সাব বললেন, কোথায় যাবি?
বললাম, চার্চে।
চার্চ।
দেবনাথ পাশ থেকে বলল, মিছে কথা বলতে মুখে আটকায় না। তুই ঠিক সেই মেয়েটার কাছে যাচ্ছিস।
সুবোধ বালকের মতো বললাম, না চাচা! আমি গির্জা দেখতে যাচ্ছি।
এই শহরের প্রেসবেটেরিয়ান চার্চের খ্যাতি আছে। দেয়ালে নিপুণ কারুকাজ, বিশাল এলাকা নিয়ে চার্চ। পাইনের জঙ্গলে সহজে সেখানে হারিয়ে যাওয়া যায়। তবে এ-পাইন সে পাইন নয়। কৌরি-পাইন। বিশাল তার কাণ্ড, ডালপালা আকাশ ছুঁয়ে দিতে চায়।
গির্জা আমি দেখতে যেতেই পারি, কিন্তু একা বের হচ্ছি দেখেই সারেভ সাব প্রমাদ গুনলেন।
প্রশ্ন করলেন তিনি, বন্ধু দেবনাথ যাবে না?
দেবনাথ বলল, না, আমাদের সঙ্গে বের হবেন না তিনি।
আমি দেরি করতে পারছি না। পরে কী কথা হয়েছে জানি না। ঠিক সাঁজ লাগার মুখে দোকানের সামনে হাজির। মেয়েটি খদ্দের সামলাচ্ছিল। আমাকে দেখতে পায়নি। ভিতরে ঢুকলে, আবার সেই মিষ্টি হাসি। এ-যেন সেই আমাদের রাজকুমারীর গল্প, হাসলে মুক্তা ঝরে, কাঁদলে হিরে।
সে যে ব্যস্ত এটুকু বোঝানোর জন্য কাউন্টারের পাশের একটা চেয়ারে বসতে বলল। ও কি টের পেয়েছে, অকারণ আমি গণ্ডা দুয়েক আপেল কিনে নিয়ে গেছি। ও কি আজ বলবে, তুমি তো আপেল কিনতে চাওনি, আমাকে খুশি করার জন্য আপেল বাধ্য হয়ে কিনেছ! অমন খদ্দের আমি চাই না। বলতে গেলে কেমন একটা অজানা আতঙ্কে ডুবে গেলাম—আমাদের দেশে দোকানে কোনো নারী কিছু বিক্রি করছে ভাবতেই পারি না। কেনার জন্য না, তাকে দেখার জন্য যাই-বুঝতে পারলে খুব ছোটো হয়ে যাব।
মুখ ব্যাজার আমার। এভাবে একা সত্যি আসা ঠিক হয়নি। অপরিচিত জায়গা, কার মনে কী আছে কে জানে! এখন মানে মানে চলে যেতে পারলে বাঁচি।
আমার দিকে সে তাকাচ্ছে না। খদ্দের সামলাচ্ছে। এ-সময়টায় ভিড় বোধ হয় বেশি হয়। আগে আগে চলে এসেছি। চেয়ারে বসে অস্বস্তি হচ্ছিল।
বললাম, আমারটা দাও।
সে হাসল। বলল, বোস।
আবার বসে থাকা। আমি যে আপেল কিনতেই এতদূর এসেছি, তাকে দেখতে নয়, এটা যেন প্রমাণ না করতে পারলে ইজ্জত থাকবে না। এত সস্তা যদি ভাবে তবে মানুষের অহংকারে ঘা লাগে।
উঠে দাঁড়ালাম। ঘড়ি দেখলাম, যেন আমার তাড়া আছে। ওকে বেশ গম্ভীর মুখে বললাম, আমি কি খদ্দের না! সবাইকে দিচ্ছ, আমাকে বসিয়ে রাখছ?
মেয়েটির মুখে সেই হাসি। একটু হালকা হয়ে কাউন্টারে ঝুঁকে বলল, তুমি জাহাজি, ইণ্ডিয়ান।
অবাক, এত জানে কী করে?
বললাম, হ্যাঁ।
—দেখেই বুঝেছি। না হলে এতদূর কেউ আপেল কিনতে আসে।
আমি কী কাল ওর সঙ্গে কোনো নির্লজ্জ আচরণ করেছি। ইণ্ডিয়ানদের সম্পর্কে কি ওর কোনো ভালো ধারণা নেই। কিন্তু তেমন আচরণ তো করিনি। অথবা আমার মুগ্ধতা থেকে কি টের পেয়েছে, আমি যতদিন এ-বন্দরে আছি, একবার অন্তত তার দোকানে ফল কেনার ছলে তাকে দেখতে আসবই।
দোকানটা যে তার নয় পরে জেনেছিলাম। সে কাজ করে। মালিক রাতের দিকে এসে সব হিসাব মিলিয়ে ক্যাশ গুনে নিয়ে যায়। তার বাঁধা মাইনের কাজ। তার দাদু আছে। শহর থেকে এগমন্ট হিলের দিকে যে বড়ো সড়ক চলে গেছে, দু-পাশে চড়াই উত্রাই ভেঙে, তারই কোনো টিলায় সে থাকে।
সেদিন ওকে আমি পাত্তা দিতে চাইনি। আপেল কিনে বের হয়ে আসছিলাম, সে আমাকে ফের ডাকল। ফিরে গেলে বলল, আপেল কেনার জন্য এতদূরে আসার তোমার দরকার নেই। পোর্টের কাছে ওয়াগাদের অনেক বড়ো ফলের দোকান আছে। ট্রাম গুমটির ঠিক পাশে। সস্তায় আপেল পাবে। তোমার টাকার দরকার। অযথা এতদূর এসে সামান্য ফলের জন্য টাকা নষ্ট করবে কেন? যাওয়া আসার ভাড়াতে তোমার ফল কেনা হয়ে যাবে।
মেয়েটির এই ঔদ্ধত্যে আমি হতবাক। যেন সোজাসুজি বুঝিয়ে দিতে চাইল, আর আসবে না।
মুখ ব্যাজার করে ফের বের হয়ে আসতেই আবার ডাকল, কি খারাপ পেলে? আমি মাউরি নই। ইন্ডিয়ান। আমার নাম লতা বুচার। তোমরা ঠকলে কষ্ট হয়।
নামটা আদ্ভুত।
লতা বাংলা নাম। বুচার! বুচার কি পদবি।
বললাম, তোমরা বুচার। কসাই।
মেয়েটি হেসে বলল, না কসাই নই। বুচার আমার দাদুর বাবা খ্রিস্টান হবার সময় পদবি নিয়েছিলেন। আমার দাদু ওয়াগাদের আপেল বাগান পাহারা দেয়। বুড়ো হয়ে গেছে বলে সাঁজবেলাতেই ঘরে ফিরে যায়। ওয়াগা কোম্পানির বিশ্বাসী লোক। আমার দাদু ঠকেছে সারাজীবন, আমার বাবা মা ঠকেছে। আমার ঠাকুরদার বাবা এদেশে বিয়ে করে থেকে যান। তিনি জাহাজি ছিলেন। তিনিও ঠকেছেন। মনে হয় তিনি না এলে আমি ইন্ডিয়ার লোক হতে পারতাম। আমার ভালো লাগে না, কাজটা ছেড়ে দেব।
