আমার কাছে এভাবে একই চিঠি নিয়ে কতবার যে তারা আসে।—এই পড়ে শোনাই।
-সকালে তো পড়ে শোনালাম।
–আবার পড়।
—না পারব না। নতুন কী আর আছে।
—পড় না। লক্ষ্মী ছেলে। পড় শুনি।
ওদের মুখ দেখলে আমার কষ্ট হত। আমারও চিঠি আসে। মা চিঠি দেন, বাবা দেন সব উপদেশ, যেন নষ্ট হয়ে না যাই, আভাসে বাবা এসবই চিঠিতে লিখতে চান। কে কেমন আছে, বাড়ির কোজাগরি লক্ষ্মীপূজায় আমি নেই বলে মা নাকি চোখের জল ফেলেছে। একই চিঠি আমিও বার বার পড়তে ভালোবাসি। যেন চিঠি তো নয়, মায়ের হাতের স্পর্শ। সব চিঠিই আমার বালিশের নীচে জমা থাকে। একই চিঠি কতবার যে পড়া হয়ে গেছে-মুখস্থ হরে গেছে, তবু পড়ি। বাড়ির চিঠি হাতে নিয়ে বসে থাকি। সমুদ্রের নীল জলরাশি, কিংবা কোনো দ্বীপের একটি নিঃসঙ্গ ফার্ন গাছের চেয়ে চিঠির জাদু যে কত অধিক টের পাই, যখন কেউ জাগিয়ে দিয়ে বলে, এই ওঠ। ওয়াচে যাবি। দেখি বুকের উপর চিঠি পড়ে আছে, যেন হৃৎপিণ্ডটার উষ্ণতা নিচ্ছিল চিঠিটা।
আমাদের দেশে ফেরা সুতরাং অনিশ্চিত। কবে ফিরব জানি না। মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছি। জাহাজ বন্দরে বাঁধাছাদা হচ্ছে। ভারি সুন্দর শহর। নীল সবুজ হলুদ রঙের কাঠের বাড়ি পাহাড়ের উপত্যকার পাহাড়ের ঠিক নীচে বিশাল জলাশয়। সমুদ্রে নুড়ি পাথর ফেলে দুটো পাড় গড়ে তোলা হয়েছে। একদিক খোলা। জাহাজ ঢুকবার পথ। ছোট্ট বন্দর। সাত আটটা জাহাজ জেটিতে বাঁধা। জেটি পার হয়ে সমুদ্রের বালিয়াড়ি। অজস্র নারী-পুরুষ প্রায় উলঙ্গ হয়ে সাঁতার কাটছে কিংবা চেয়ারে ছাতার নীচে বসে বই পড়ছে। এসব দৃশ্য চোখে সয়ে গেছে। কাজ এখন কম। বিকেল চারটে বাজলে ছুটি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ডেকে উঠে রেলিঙে ঝুঁকে দাঁড়ালেই কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যাই। কিছু ভালো লাগছে না।
কিছু তো করার নেই, নিয়মকানুনের বান্দা, লম্বা সফর হলে অনেক টাকা, যারা টাকাই জীবনে সব ভেবে নিয়েছে, তারা খুশি। অবশ্য বেচারাদেরও দোষ নেই, তারা তো চায় লম্বা সফরে বেশি টাকা নিয়ে ঘরে ফিরতে। অসুবিধা আমাদের মতো জাহাজিদের, কিংবা সদ্য বিয়ে করে আসা জাহাজিদের। দু-চার বছর হয়ে গেলেও কষ্ট—কিন্তু একটা সময়ে অনেকেই লম্বা সফর পছন্দ করে। আমাদের মতো বাড়িঘরের টানে কাহিল না। ফলে বিক্ষোভ আংশিক।
তবু রক্ষে এই বন্দর এবং শহরে গাছপালা আছে। বিকেল হলেই যেমন সেজেগুঁজে নেমে যাওয়া তেমনি সাজগোজের পালা চলছে। আফটার-পিকে বাথরুম। স্নানের হুড়োহুড়ি। তেল কালি বার্নিশের কাজ এখন বেশি। মাত্র একটা বয়লার চালু রাখা হয়েছে। একজন করে ফায়ারম্যান ওয়াচে। আর সবার সাফ সুতরোর কাজ। কাজ সেরেই সবাই যে যার গরম জল নিয়ে ছুটছে বাথরুমে। ঝেড়ো শীতের হাওয়ায় মাস্তুলের দড়িদড়া ঠিক রাখা যাচ্ছে না।
আমরা নেমে গেলাম।
আমি দেবনাথ বন্ধু।
জেটি পার হয়ে ডানদিকে সি-ম্যান মিশন। ওখানে ঢুকে সস্তায় দু-মগ বিয়ার খাওয়া গেল প্রথমে। আসলে শীতের ঠান্ডা থেকে আত্মরক্ষা করা। আমাদের ওই হয়েছে ঝামেলা—এখন এ-দেশে গ্রীষ্মকাল, অথচ গ্রীষ্মের শীতেই কাবু, শীতকালটা তবে কি ভয়াবহ, অবশ্য বরফের শীতও আমরা পেয়ে এসেছি, হামবুর্গ বন্দরে। যতদূর চোখ যায় শুধু সাদা বরফ, তার উপর দিয়ে হেঁটে যাও, ইচ্ছে করলে সাইকেল, চালিয়েও যাওয়া যায়—লেদার জ্যাকেট ওভারকোট থেকে শুরু করে হাতে সাদা দস্তানা পরে বরফের উপর দিয়ে হেঁটে যাবার মজাই আলাদা।
সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে এখন মজা পাই না। বিকেলে হয়তো বেরই হতাম না—কিন্তু বন্ধু দেবনাথ এমন সব সুন্দর বাড়িঘরের কথা বলল যে, আর চুপচাপ শুয়ে থাকা গেল না। মাউরি মেয়ে-পুরুষরা একেবারে বাঙালিদের মতো দেখতে। দেখলে নাকি ভুল হবার কথা, ভুলে বাংলায় কথাও বলে ফেলতে পারি। গাউন স্কার্ট না পরলে শাড়ি পরলে বাঙালি ললনা। লম্বা চুল, বেণী বাঁধে। এসব শোনার পর ঠিক থাকি কী করে! মাউরি উপজাতিরাই এই দ্বীপের আদি বাসিন্দা। বড়ো গরিব। যা হয়ে থাকে সব দেশেই। পুরুষরাও একসময় লম্বা চুল রাখত, এখন রাখে না, তারা সাধারণত ফলের বাগান পাহারা দেয়, অথবা খামারবাড়ি আগলায়, চাষ আবাদ দেখে। দোকানে কেউ কাজ করে। অবশ্য পয়সাওয়ালা লোকও আছে। তবে শহরে বিশেষ তাদের দেখা যায় না।
বন্দরের মুখেই ট্রাম পেয়ে গেলাম। ছোট্ট পাহাড়ি শহর। এক বগগা ট্রামে চড়ে পাহাড়ের চড়াই-উত্রাই ভাঙার সময় দেখলাম, সুন্দরী বালিকা কিংবা যুবতীরা হেঁটে যাচ্ছে। ট্রামেও আছে তারা। আমরা জাহাজি, তারা ঠিক চিনতে পারে। শহরে কোথায় কী আছে দেখবার, এরা ঠিক বলে দেয়। তবে বন্ধু দেবনাথ আগের এক সফরে এখানটায় এসেছিল বলে সব জানে—আমাদের শুধু ঘোরা, দোকানে ঢুকে এর ওর সঙ্গে আলাপ করা, আসলে নারীসঙ্গ, কারণ কাউন্টারে সুন্দর সব মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে খদ্দের ধরার জন্য। আমরা কী কিনব নিজেরাও ঠিক বুঝতে পারি না। এখানকার বিখ্যাত গির্জা দেখতে যাওয়া যায়, কিংবা উপত্যকা পার হয়ে কোনো আপেলের বাগানে ঢুকে গেলে ঝরা পাতার খেলা দেখা যেতে পারে।
ঠিকই বলেছে ওরা, মাউরি মেয়ে দেখলেই চেনা যায়। শ্যামলা রং, মুখের গড়ন ভারি কোমল, চোখ টানা। শহরের একদিকটায় মার্কেট। দু-তিন ফার্লংয়ের মতো পথ আমরা হেঁটে এসেছি ট্রাম থেকে নেমে। বাসে ওঠা যায়, কিন্তু বাসে উঠলে দু পাশের বাড়িঘরের ঠিক উত্তাপ পাওয়া যায় না। বাড়ির লাগোয়া বাগান, লাল সাদা গোলাপের ঝড় বয়ে যাচ্ছে যেন বাগানে, ক্ষণিকের জন্য আমাদের দাঁড়িয়ে থাকা, বড়ো ঝকঝকে লাল নীল কাঠের পাটাতন করা বাড়ি। দালান কোঠা আছে, তবে কম। বাড়িগুলির পেছনে কমবেশি সবারই পাইনের অরণ্য। অনেকটা জায়গা নিয়ে বাড়িঘর। বোঝাই যায়, লোকজন কম। জমির ফলন ভালো, এ-দেশ থেকে রপ্তানি করার জন্য ফলের চাষ, গমের চাষ আর পাল পাল ভেড়া উপত্যকায় ছড়ানো ছিটানো। এক উদার পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে গেলে যা হয়—আমরা একটা বড়ো টিলার উপরে উঠে এসে পেছনে অনেক দূরে এগমন্ট হিল দেখতে পেলাম। সৰ্যাস্ত। হচ্ছে। পাহাড়ের মাথায় যেন অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়ে গেছে। লাল হয়ে গেছে উপরের আকাশ। অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিলাম—পাখিরা উড়ে যাচ্ছে দূরে অদূরে—আকাশে এক বিন্দু মেঘ নেই—যেন এই শহরে যদি কোনো আলোর ব্যবস্থা না থাকত এগমন্ট হিলের সোনালি রংই যথেষ্ট। এমন দৃশ্য দেখে মুহ্যমান হয়ে পারা যায় না, চুপচাপ নেমে এসেছিলাম টিলা থেকে—এবং শহরে আলো জ্বলে উঠেছে, কী করে যে চোখ গেল সেই যুবতীর দিকে জানি না, যুবতী না বালিকা, কত যেন চেনা আমার নেশা ধরে গেল। ফলের কাউন্টারে সে দাঁড়িয়ে। ঢুকতেই মিষ্টি হাসল মেয়েটি। এমন হাসি দেখতে পেলে সারাদিন কেন, সারা জীবন মেয়েটির পাশে বসে থাকা চলে।
