জাহাজের বাড়িয়ালা মানে কাপ্তান। সেই বলতে পারে সব। এনজিন সারেঙের কাছে গেলাম। আমি বন্ধু দেবনাথ—আমরা বাঙালিবাবু, কারণ সেই ত্রিশ-বত্রিশ বছর আগে জাহাজি বলতে চিটাগাং নোয়াখালির মানুষজনদেরই বোঝাতো। দেশ ভাগ হয়ে যাবার পর তাদের উপর ভরসা করে থাকা চলে না। দলে দলে আমরা ঢুকছি। জাহাজে ডেকজাহাজি আর এনজিন-রুম জাহাজির সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। আমরা মাত্র তিনজন বাঙালিবাবু, বাকি সবাই সন্দীপ নোয়াখালির লোক।
বঙ্কু, দেবনাথের এটা নিয়ে পাঁচ-সাতবার সফর হয়ে গেছে। আমার প্রথম সফর। একঘেয়ে সমুদ্র, শুধু জল আর জল কাঁহাতক ভালো লাগে। নিজের গরজেই এনজিন সারেঙের ফোকসালে ঢুকে গেলাম। বললাম, চাচা, কোনো খবর পেলেন?
তিনি বয়লার স্যুট পরে উপরে উঠে যাবার জন্য ব্যস্ত। সহসা কেমন ক্ষেপে গিয়ে বললেন, কত বলেছি, ভেবে দ্যাখ, ব্যাংক লাইনের সফর করবি কি না! এখন মনমরা হয়ে থাকলে চলবে কেন? বাড়িয়ালা কী বলবে? তিনি কি জানেন! এজেন্টের অফিস থেকে খবর আসবে। খবর না এলে রা খসাবে কী করে! আল্লার বান্দাও জানে না, জাহাজ কবে ফিরবে!
বুঝতে পারছি, আমার কষ্ট তাঁকে পীড়া দিচ্ছে। মনমরা দেখলে তিনি আরও ক্ষেপে যান। হয়তো জাহাজ বন্দরে নোঙর ফেলেছে, বিকেলে সেজেগুঁজে জাহাজিরা কিনারায় নেমে যাচ্ছে, আমি যাচ্ছি না, ফোকসালে নিজের ব্যাংকে শুয়ে আছি—শুনেই ক্ষেপে যেতেন। ঝড়ের বেগে ঢুকে যেতেন আমার ফোসকালে, এই ওঠ, ওঠ বলছি। বন্ধু দেবনাথের সঙ্গে কিনারে ঘুরে আয়। ভালো লাগবে।
আমার কখনও মনে হত আর হয়তো দেশেই ফেরা হবে না। আর হয়তো কখনও আমি আমার প্রিয় বাদশাহি সড়ক ধরে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে বের হতে পারব না, কিংবা রেললাইন পার হয়ে লালদীঘির ধারে বসে সেই গাছগাছালির ফাঁকে দূরের স্টেশন দেখতে পাব না। চোখ জলে ভার হয়ে আসত।
কত বন্দরে গেছি, কত নারীর মুখ দেখেছি, ইশারায় কেউ ঘরে নিয়ে যেতে চেয়েছে, অবলীলায় আমাদের কেউ কেউ চলে গেলেও আমি যেতে সাহস পাইনি। নারী রহস্যময়, বড়ো টানে। কিন্তু জাহাজিদের মারাত্মক ব্যাধির কথা আমার জানা হয়ে গেছে। যৌন-সংসর্গ এড়িয়ে যতটা থাকা যায়। এসব কারণে দেবনাথ কখনও ক্ষেপে যেত, বলত তুই বেটা মরবি। জাহাজের কাজ তোকে দিয়ে হবে না। একেবারে ঈশ্বরের পুত্র সেজে বসে আছিস। তুই কি মানুষ না!
এত সব অভিযোগ সত্ত্বেও কোনও কার্নিভেলে গেছি, কোনোদিন পানাহার, এই পর্যন্ত। তার বেশি নয়। একদিন শুধু ব্রাজিলের ভিক্টোরিয়া পোর্টে বেসামাল হয়ে পড়েছিলাম। জাহাজের সিঁড়ি ধরে উপরে উঠতে পারছিলাম না। আমাকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে গেছিল সবাই। সারেং আমার সঙ্গে প্রায় এক মাস কথা বললেন, তুই শেষে এই! তোর মা-বাবার কথা মনে হয় না! টাকা নষ্ট করতে কষ্ট হয় না!
না পেরে আমিও খেকিয়ে উঠেছিলাম, বেশ করেছি। আরও করব। আপনি যা পারবেন করবেন। আসলে আমি যে বাটলারের রসদের খাতাপত্র লিখে উপরি রোজগার করছি। হাতে কাঁচা টাকা থাকলে যা হয়, নতুন বাটলার, কাপ্তান-বয়ের কাজ করত, ডারবানে অসুস্থ হয়ে বাটলার চলে গেলে, কাপ্তান-বয়কেই দায়িত্বটা দেওয়া হয়েছিল। পার্কসার্কাসের ইব্রাহিম বাটলার হয়ে গেল। উর্দুভাষী মানুষ। সামান্য লেখাপড়া আছে। কিন্তু এ-বিদ্যায় রসদের জমাখরচের খাতা রাখা তার পক্ষে কঠিন। জাহাজিদের মধ্যে আমিই লেখাপড়া জানা, কলেজে গেছি—এত যার বিদ্যার বহর তারই শরণাপন্ন হওয়া সুবিধাজনক, সে এসে আমায় ডেকে নিয়ে গেছিল কেবিনে, কাজটাতে সাহায্য করলে সে কাপ্তানের একটা সার্টিফিকেট পেয়ে যাবে। পরের সফরে সে বাটলার হয়ে জাহাজেও উঠে যেতে পারবে। আমাকে খুশি করার জন্য নিউপোর্টে নেমে নতুন কালো রঙের এক জোড়া স্যুট করিয়ে দিয়ে বলেছিল, একেবারে ইংরাজের বাচ্চা। বহুত সুন্দর এবং এমন সব বলার পর, বন্দর এলেই কাঁচা টাকা পেয়ে যেতাম। স্যুট পরে বের হয়ে বাটলার একদিন আমার সঙ্গে ছবিও তুলল। সত্যি চেনা যায় না বাঙালিবাবুকে।
যা বলছিলাম, আসল কথাটাই বলা হল না এখনও। ডেকে সারেংই খবর দিল, জাহাজ দেশে ফিরছে না। নতুন চুক্তি হয়েছে। ওসানিকা, কাকাতিয়া আর নেরু দ্বীপগুলো থেকে খোল ভর্তি ফসফেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে ফেলতে হবে। মেলবোর্ন, ফ্রিমেন্টাল, সাউথ ওয়েলসের উপকূলে ঘোরাঘুরি করবে জাহাজ।
ক-মাসের চুক্তি তা অবশ্য জানা গেল না।
জাহাজিরা কেউ মনমরা, কেউ খুশি। মনমরা আমার মতো অনেকে। একসময় টাকা উপার্জন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়, আবার একসময় ঘরে ফেরার জন্য পাগল হয়ে যেতে হয়। আমরা এই ঘরে ফেরার দলের জাহাজিরা সারেঙের ঘরে ঢুকে যথেচ্ছ গালাগাল করলাম। তিনি বললেন, নসিব। তাঁর কিছু করার নেই।
আমার নিজেরই খারাপ লাগল বুড়ো মানুষটার কথা ভেবে। সাদা দাড়ি, সাদা চুল, বড়ো অমায়িক এবং ধর্মভীরু। মানুষটিকে আমি একদিনও কিনারায় নামতে দেখিনি। অবসর সময়ে ধর্মগ্রন্থ পাঠ ছাড়া তাঁর আর কিছু করণীয় আছে দেখলে বোঝা যায় না। মনকে প্রবোধ দিই সবারই পরিবার পরিজন আছে। দেশের চিঠি এলে বার বার করে পড়ে। চিঠিটা শিয়রে রেখে দেয়। যারা পড়তে পারে না, তারা পড়িয়ে নেয়।
