আর আশ্চর্য সে রাতে শুয়ে পড়তেই ঘুমিয়ে পড়ল। এবং নাক ডাকতে থাকল। কিছুক্ষণ পর নাক ডাকা বন্ধ হয়ে গেল। কেউ যেন তাকে ডাকছে। অমা দেখ এসে কী ব্যাপার। সে উঠে গেল জানালায়! আবার নতুন কারা আসছে। এবার একজন দুজন নয়। সে দেখল, গাছটার নীচে সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। চারপাশ থেকে পঙ্গপালের মতো ধেয়ে আসছে। মাথায় হাঁড়ি পাতিলা, বৌ একটা নয়, একেবারে সার দিয়ে এবং সবার কোলে বাচ্চা। পাঁচটা সাতটা করে অপোগণ্ড, উলঙ্গ প্রায় তারা সব, চুল সনের মতো, এবং অভাবী মানুষ। ওদের সঙ্গে আছে সব পচা শাকসবজি, উচ্ছিষ্ট খাবার। পচা পরিত্যক্ত মাছ-মাংসের হাড়। মাছি ভন ভন করছে। কত দিন চান করে না এরা, যেন এরা ক্রমে শহরের সব কিছু অধিকার করে নিতে আসছে। এবং সে দেখতে পেল, অফিস-কাছারি করতে পারছে না মানুষ, রাস্তা পার হতে পারছে না। ডিঙিয়ে যেতে হচ্ছে। পায়ে হাতে সেই গন্ধ নাকে এসে লাগছে। মানুষেরা চারপাশে যারা আছে অক অক বমি করছে। চোখের ওপর একটা বেড়াল ছানা আগুনে লোহার শিকে সেঁকে নিচ্ছে। আদিম বন্য হিংস্র এক জাতি এসে এমন সুসময়ে কলকাতার সব জুড়ে বসতে চাইছে। রানু, মালতী সে পাশের ফ্ল্যাটে, নীচের ফ্ল্যাটে এবং সর্বত্র সেই অক অক জল বমি। প্রায় মহামারীর মতো সব শহরকে গ্রাস করছে। এক প্রাগৈতিহাসিক জীবের মতো ওদের সার সে রানু মালতীর হাত ধরে শহর লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে। প্রায় আধমরা হয়ে আসছে। চোখ-মুখ ছিটকে বের হয়ে যাবার মতো। যেন এবার তারা কোণঠাসা করে মারবে তাকে। সব কলকাতা এ-ভাবে পঙ্গপালে ছেয়ে গেল। সে চিৎকার করে উঠল, সুকুমার বাঁচাও।
ওর ঘুম ভেঙে গেল। সে গলা শুকনো বোধ করল। জানালা খোলা। ভয়ে জানালায় পাশে যেতে সাহস হচ্ছে না। জিরো পাওয়ারের আলো জ্বলছে। মালতী অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ও-ঘরে রানু। সে পা টিপে টিপে এগোতে থাকল। ওরা এখনো ঘুমোচ্ছে। তার চিৎকার পর্যন্ত শুনতে পায়নি। শহরের ফুটপাতে এত মানুষ যাচ্ছে টের পাচ্ছে না। সে কোনো রকমে পা টিপে টিপে জানালার গিয়ে দাঁড়াল। আশ্বিনের বাতাস। দূরে ঢাকের বাদ্যি বাজছে। আর চাঁদের মরা আলোতে সে দেখতে পেল ভূতুড়ে দেবদারু গাছটা একাকী। নীচে একটা রাস্তার কুকুর শুয়ে আছে। গাছটার নীচে কেউ চলে আসেনি। কলকাতা আবার নিরিবিলি নিজের ভেতর ডুবে আছে। কলকাতা আছে কলকাতাতেই।
গির্জার সিঁড়িতে সারারাত
আমরা আশা করছিলাম জাহাজ এবার দেশে ফিরবে। সেই প্রায় মাস এগারো আগে সফরে বের হয়েছি—কত কাল আগে যেন, নতুন জাহাজিরা দেশে ফিরতে চাইবেই। কারণ রক্তে নোনা জলের নেশা এখনও ঢোকেনি। তাছাড়া একটানা, শুধু নীল জল, নীল আকাশ, কতদিন ভালো লাগে! বন্দরে এলে দিনগুলি তবু কোথা দিয়ে যে শেষ হয়ে যায়। তখন মন খুব একটা খারাপ থাকে না। টাকা থাকলে ফুর্তি-ফার্তার অভাব হয় না।
তবে সবাই একরকমের হয় না। জাহাজিরা প্রায় সবাই সংসারী মানুষ। টাকা উপার্জনের জন্য ঝড়তুফান ঠেলে পরিবার পরিজন থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে—যত দিন যায় তত দেশে ফেরার জন্য উন্মুখ। কোম্পানির ঘরে কত টাকা জমল, কলকাতায় ফিরে কত টাকা নিয়ে ঘরে ফেরা যাবে এসব হিসেব-নিকেশও শুরু হয়ে গেছে। এগারো-বারো মাসের সফর খুবই লম্বা সফর।
মুশকিল ব্যাংক লাইনে নিয়ম বালাই কম। একবার জাহাজ কলকাতা থেকে ছাড়লে, আবার কবে খিদিরপুরে কিংবা জর্জ ডকে ফিরবে কেউ বলতে পারে না। লম্বা সফর হলে বিশ-বাইশ মাসও হয়ে যায়। কখনও তারও বেশি।
আমি একেবারেই নতুন। ভদ্রা জাহাজের ট্রেনিং শেষ করে মাস দুই লেগেছে সি ডি সি পেতে। তারপরই এক ভাঙা লজঝরে কয়লার জাহাজে বের হয়ে পড়েছি। প্রথম দিকে সে কি অবস্থা গেছে। ফার্নেসে টন টন কয়লা বয়ে নিয়ে যাওয়া, ছাই ফেলা—আট ঘণ্টার ওয়াচ কখনও দশ বারো ঘণ্টায়ও শেষ হত না। যখন স্টকহোলড থেকে সিঁড়ি ধরে বোট-ডেকে উঠে আসতাম, মনে হত এবার হয়তো বেঁচে গেলাম, পরের ওয়াচে ঠিক পড়ে যাব। জাহাজ দুলছে, সামনে পিছনে কিংবা ডাইনে বাঁয়ে ঠিক হয়ে দাঁড়াতে পারছি না। মাথা ঘুরছে। খেতে গেলে ওক উঠছে, খেতে পারছি না। সারেঙ সাব পই পই করে বলেছেন, দেখ পারবি কি না। কয়লার জাহাজ, বয়লারগুলো রাক্ষসের মতো কয়লা খায়—পেরে উঠবি না। রক্তবমি হবে। মাথা ঘুরে পড়ে যাবি—এমন সব সাংঘাতিক কথাবার্তার পরও ঠিক করে ফেলেছি যাবই। তাছাড়া উপায়ও নেই। একটা কাজ না হলে চলছে না, ভাই বোন বাবা মা সব আশায় আছে। বন্দরে জাহাজ আসে, চলেও যায়, মাস্তারে দাঁড়িয়ে থাকি, আমাকে নেয় না। দাড়ি-গোঁফ ভালো করে ওঠেইনি, পারবে কেন জাহাজের ধকল সামলাতে। আমিও নাছোড়বন্দা, কয়লার জাহাজ, তাই সই। উঠে পড়েছি। তারপর দিন যত যায়, কেমন মনমরা। যত দূরে যাই, তত আমার বাড়িঘর গাছপালা টানে।
আশা এবারে ঠিক খবর পেয়ে যাব, জাহাজ দেশে ফিরছে।
জাহাজে ফসফেট বোঝাই। নিউল্লাইমাউথ বন্দরে ঢুকছি। মাল এখানে খালাস হবার পর গম নিয়ে হয়তো দেশের দিকে ফিরতে পারব। এখন থেকে না হোক অস্ট্রেলিয়ার কোনও বন্দর থেকে গম বোঝাই হবে। সবাই এমনই যখন ভাবছি তখনই ডেক সারেঙ খবর দিল, এখনও বাড়িয়ালারা খসাচ্ছে না।
