সে বলেছিল পাবেন, আপনারাও পাবেন। বাড়ির সামনে এই সব বেওয়ারিশ মাল অখাদ্য–কুখাদ্য এনে জড়ো করছে, না পেয়ে যাবেন কোথায়!
এবং বৌটার খোলা বুকে একটা নতুন বাচ্চা, এই মনে হয় দু-চার দিনও হয়নি, একেবারে বুকের ভেতর মুখ লাগিয়ে রেখেছে। হাত-পা কাঠি কাঠি সবুজ শরীরটা, আজ কি কাল, যেমন রানু হবার সময় সে হাসপাতালে গিয়ে একদিনের বাচ্চা রানুকে দেখেছিল, চামড়া কোঁচকানো, এবং চোখ মেলে তাকাতে পারছে না। আর তখনই জানালার নীচে সুকুমার, সে প্রায় স্বর্গ পাবার মতো চিৎকার করে বলল, এলে সুকুমার! পাশে দেখেছ?
সুকুমার চারপাশে তাকাল। সে এমন কিছু দেখতে পেল না। কোথাও কোনো গণ্ডগোল নেই, কেউ বাস চাপাও পড়েনি, কোনো মৃতদেহ বাড়ির পাশে কেউ ফেলে রেখে যায়নি, বরং বুড়োটা তার দুই নাতি নিয়ে, দুজন যুবক ছোঁড়া, এবং কিছু বেশি বয়সের দু-তিনটে মানুষ গোল হয়ে কলকাতার আকাশ পরিষ্কার দেখে খ’নি বাজিয়ে গান ধরেছে। পাশে পোস্টাফিসে আলো জ্বালা হয়ে গেছে। আকাশের মাথায় ভাঙা চাঁদ। দেবদারু গাছটা ভারি সজীব। সুন্দর মতো এক যুবতী স্বামীর সঙ্গে পানের দোকানে দাঁড়িয়ে আছে। পান খেয়ে রাঙা ঠোঁট উলটে পালটে দেখছে। কোথাও কিছু সে অস্বাভাবিক দেখতে পেল না। সত্যদার মেয়েটার ক-মাস থেকে কী একটা অসুখ কখনো ভালো হয়ে যায়, কখনো বিছানা থেকে একেবারে উঠতেই পারে না—এসব খবর সে পেয়েছে। দু-চারবার সে দেখেও গেছে। কী একটা গন্ধ পায় সংসারে। মেয়েটা আসলে ভারি আদরে মানুষ, ন্যাকা। একটুতেই ঘাবড়ে যায়। এমন একটা বয়সে বালিকারা ভারি কৌতূহলী হয়ে যায়। সংগোপনে সব কিছু দেখে বেড়াবার স্বভাব। আর কিনা মেয়েটা রূগ্ন বালিকার মতো জানালায় দাঁড়িয়ে থাকছে! ভেতরে আসলে সেই অসুখ হয়তো, বড়ো হতে গেলে কিছু অসুখ শরীরে আসবেই—সে এই সব ভেবে সিঁড়ি ভেঙে যত উঠছিল তত মনে হচ্ছিল, সত্যনারায়ণদা, ভারি মুসিববতে পড়ে গেছে।
সুকুমার বলল, কিছু তো দেখলাম না!
কিছু না?
না তো!
তোমাদের চোখ নেই! তোমরা এত ভোঁতা মেরে গেছ।
সুকুমার অবাক। চোখ-মুখ ভয়ংকর রকমের ভীভু, ভূতটুত দেখলে এমন চোখ মুখ হবার কথা। সুকুমার মনে মনে বলল, তোমার মাথাটা গেছে। চুরি করে ফাঁক করে দিচ্ছ—ধরা পড়ে যাবে ভয়ে শালা তুমি এমন মুখ করে রেখেছ। পাগলামী করলেও রেহাই নেই। এবারে চাঁদ সত্য কথাটা বলে ফেল।
সুকুমার বলল, রানু কেমন আছে দাদা? দুদিন বেশ খাচ্ছিল, আজ আবার খেতে পারছে না গন্ধ।
অনেক তো করলেন!
হঠাৎ কেমন অসহায় মানুষের মতো চেপে ধরল সুকুমারের হাত। বলল, তুমি বাঁচাও। তুমিই পার।
সুকুমার বলল, আপনি বসুন তো। উতলা হবেন না। বৌদি বৌদি! সে দরাজ গলায় ডাকলে, মালতী এসে দাঁড়াল সামনে। ওরও চোখ-মুখ কেমন শুকনো। সেই নির্মল হাসিটুকু নেই।
আপনাদের কী হয়েছে?
জানি না ভাই। আর ভালো লাগছে না। সত্যনারায়ণ বলল, থানায় তোমার দাদাকে একটা খবর দিতে হবে।
কেন? দেবদারু গাছটা সাফ করা দরকার।
গাছে কী হয়েছে?
গাছের নীচে সব পঙ্গপাল। অখাদ্য কুখাদ্য খায়।
খাচ্ছে খাক না। আপনার কী তাতে?
নীচে যা তা সেদ্ধ করে খাবে, আর ওপরে আমরা থাকব। সে কখনো হয়? গন্ধ! বলেই যেন ছুটে বের হয়ে গেল সত্যনারায়ণ!
মালতী বলল, বুঝলেন!
হুঁ বুঝছি। দেখি। এদের সরানো যায় কী না।
সত্যনারায়ণ ফিরে এসে বলল, যা হয় করো একটা ভাই। আমরা না হলে মরে যাব। দুদিন বাদে ঠিক মালতীও বমি করে দেবে। তখন আমরা তিনজন, আমি বলছি, কেউ বাদ যাবে না, পাশের ফ্ল্যাট, নীচে সবাই। আস্তে আস্তে সবাই পাবে। সবাই মরবে। একটা কিছু করো।
সুকুমার প্রথমে ওর দাদার কাছে গেল। ওর দাদা বলল, আইনে নেই। তাড়াবার কোনো আইন নেই। শেষে স্মরণ নিতে হল ছেলেদের।
ওরা বলল, সরে পড়।
কোথায় যাব বাবু!
আমরা কী জানি কোথায় যাবে!
বুড়ো লোকটা বলল, চলে যাব বাবু। সকালে চলে যাব।
এক্ষুনি। তোমাদের জন্য ভদ্রলোকেরা আর শহরে থাকতে পারবে না। সব অকর্ম-কুকর্ম করে বেড়াচ্ছ, আমরা বুঝি জানি না!
ছেলেগুলো সব পোঁটলাপুঁটলি মাথায় নিয়ে ফেলেছে ততক্ষণে। হাঁড়ি-পাতিল বুড়ো মানুষটা। চুল সাদা, কানি পরণে, নাকের ভেতরে বড়ো গর্ত, কান বড়ো এবং লোমে ভরতি। বুড়ো মানুষটা, দু-বছরের বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলে আরও দু-চারজন এসে ঘিরে দাঁড়াল। এবং যা হয়ে থাকে বেশ সোরগোল পড়ে গেল। আর তখন যায় কোথায়। দৌড়ে পালাতে পারলে বাঁচে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ওরা দৌড়ে কোথায় চলে যাচ্ছে। নিমেষে দেবদারু গাছটার চারপাশ কেমন ফাঁকা হয়ে গেল। কিছু ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল, পোড়া হঁট, দুর্গন্ধময় কিছু ছেড়া কানি, আর সব পচা জীবজন্তুর উচ্ছিষ্ট হাড় মাংস ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। সত্যনারায়ণ জমাদার ডেকে জায়গাটা সাফ করে ফেলল, গঙ্গাজলে ধুয়ে দিল। শরীরে এবং চারপাশে যা-কিছু আছে তার ওপর ওডিকোলন ছড়িয়ে এবং রাম রাম বলতে বলতে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে গেল। তারপর দরজা-জানালা খুলে দিল সব। রানুকে নিয়ে জানালায় একবার দাঁড় করিয়ে বলল, পাচ্ছিস?
রানু নাক টেনে বলল, না বাবা। এখানে?
না বাবা।
এদিকে আয়। দ্যাখ তো…?
না বাবা।
তারপর সত্যনারায়ণ ভালো করে ঘর বারান্দা ধুয়ে দিতে বলল, রান্নার মেয়েটিকে। যেখানে যা-কিছু আছে সব তাতেই গন্ধটা লেগে আছে ভেবে জল দিয়ে একেবারে ঝকঝকে তকতকে করে ফেলল। মাছ-মাংস রান্না হল না। নিরামিশ আহার করল সত্যনারায়ণ। সত্যনারায়ণ এবং রানু আজ কত দিন পর যেন পেট ভরে ভাত খেল।
