রানু আবার চুপ করে থাকে। কথা বলে না। এমন সুন্দর মেয়েটা, কি ভারী চোখ তার, আর হাত-পা লম্বা হয়ে যাচ্ছিল, চুল বড় হয়ে যাচ্ছিল। শরীরে সব অমোঘ নিয়তিরা বাড়ে দিনে দিনে। তখন কি না একটা অসুখ। কিছুই খাওয়ানো যায় না। যতটা খায় তার চেয়ে বেশি বমি করে দেয়। উগরে দেয় যেন। ভেতরে কোনো দৈত্য বাসা বেঁধেছে। সুখী মেয়েটাকে এমন দুঃখী করে রেখেছে এবং একদিন চোখের ওপর বুঝতে পারে মেয়েটা মরে যাবে।
সত্যনারায়ণ সেদিন দেবদারু গাছটার নীচে এসে থমকে দাঁড়াল। একটা মরা পায়রার ছাল ছাড়ানো হচ্ছে। পায়রা না ডাহুক না কাক, সে আর এখন সঠিক কিছু বুঝতে পারছে না। বাতাসে সব পালক উড়িয়ে নিয়েছে। কেন একটা পচা দুর্গন্ধ এসে নাকে লাগতেই ওপরে জানালায় দেখল রানু দাঁড়িয়ে দেখছে। আর তখনই কেন জানি ওর ইচ্ছে হচ্ছিল, লাথি মেরে এই বৌটির হাঁড়ি পাতিল, ছেড়া কাঁথা কাপড়, পলিথিনের বাক্স সব ফেলে দেয়। দুর্গন্ধে টেকা যাচ্ছে না। কতদিন পর ওর চোখের ওপর এই সব বেআইনি ইতর মনুষ্যকুলের নোংরা তৈজসপত্র তাকে গিলে খাচ্ছিল। রানু কোনো দিন বলেনি, বাবা, ওখানে গন্ধটা আছে। তুমি ওদের দূর করে দাও।
আর সত্যনারায়ণের মাথায় কেমন রক্তপাত আরম্ভ হয়ে যায়। সে চিৎকার করে উঠল, রানু তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে কী দেখছ যাও ভিতরে যাও! অথচ সে দেখছে, পাঁচ-সাতটা অপোগণ্ড শিশু সেই ছেড়া পায়রার মাংস ভারি যত্নের সঙ্গে ভাঙা এনামেলের প্লেটে কেটে কেটে রাখছে। সাদা ফ্যাকাশে মাংসের টুকরো। পচা গন্ধটা অবিরাম সুখ দিচ্ছিল যেন। সামান্য লঙ্কাবাটা মাখিয়ে একটু আগুনের দরকার, কোথা থেকে প্লাইউডের একটা ভাঙা বাক্স টানতে টানতে নিয়ে আসছে। বুড়ো মানুষটা দা দিয়ে কোপাচ্ছে কাঠ, আর দু-তিনটে হঁটের ওপর হাইড্রেনের জল তুলে সেদ্ধ করছে বৌটা, ওরা নোংরা শালপাতা এনে বাসি রুটি ভাগ করে বসে আছে। মাংসটা পোড়া সেদ্ধ। পচা গন্ধটা ওদের পেটে। খিদের উদ্রেক করছিল। জুল জুল চোখে তাকিয়ে আছে সব কটা জীব। সামান্য হলেই হামলে পড়বে। পোড়া চিমসে মাংস পোড়া গন্ধ। মেয়েটা তখন জানালায় নেই। অবিরাম গন্ধবাহী বাতাস দিকে দিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রায় সে যেন কোনো শ্মশানে। মানুষের পোড়া মাংসের চামসে গন্ধের মতো উঠে এলে একদণ্ড সত্যনারায়ণ আর দাঁড়াতে পাড়ল না। সে সোজা সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে দরজা জানালা বন্ধ করে দেবার সময় দৌড়ে গেল বাথরুমে। তারপর অক করে বমি করে দিল সবটা।
মালতী দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে দেখছে। সহসা এই বমি সত্যনারায়ণের, সে কেমন স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। একটা কথা বলতে পারছে না। রানুর মতো একেবারে সোজা এমন একটা ঘটনা, ফের আর এক জনকে আক্রমণ করবে এ সংসারে সে কখনো ভাবেনি।
চোখে-মুখে জল দিয়ে সত্যনারায়ণ বের হয়ে এলে বলল, কী হয়েছে। তুমিও শেষ পর্যন্ত? সংসার কী যে হবে!
সত্যনারায়ণ বলল, গন্ধ!
কীসের গন্ধ?
বারে পাচ্ছ না!
না তো। ঠিক রাণু যে-ভাবে বমিটমি করে চোখে-মুখে জল দিয়ে দাঁড়াত, কথা বলত, এবং শূন্যতা ফুটে উঠত চোখে, সত্যনারায়ণ ঠিক ঠিক হুবহু একইভাবে কথা বলছে।
মালতী বলল, তোমরা আমাকে পাগল করে দেবে? কীসের গন্ধ—আমি তো পাচ্ছি না।
পাবে। বলে সে বসার ঘরে সোজা ঢুকে ডায়াল করল হ্যালো, সুকুমার আছে?
সুকুমার? আছে ধরুন।
সকুমার বলল, কি দাদা, আমি সুকুমার বলছি।
তোমার দাদাকে একটা খবর দিতে পার? যাতে একটা ব্যবস্থা হয়।
কেন কী হয়েছে?
আর বলো না, নীচে আমাদের দেবদারু গাছটার নীচে যা সব হচ্ছে না! দেশে কি মানুষ নেই! তোমার দাদা তো একজন কর্তাব্যক্তি।
কী হচ্ছে বলবেন তো।
পঙ্গপাল।
পঙ্গপাল কোথাকার।
জানি না। বাড়িতে টেকা যাচ্ছে না। আমরা সবাই এবার মরে যাব। হতাশ গলায় বলে যেতে থাকল সত্যনারায়ণ।
এইতো সেদিন কিনলেন। এত তাড়াতাড়ি হুজ্জতি আরম্ভ হয়ে গেল। বুঝিয়ে বলুন না ওদের। কোনো লাভ হবে না। তুমি একবার অবশ্যই আসবে। ব্যবস্থা একটা করতেই হবে।
কী হয়েছে বলবেন তো।
না এলে বলা যাবে না।
সুকুমার এল সন্ধের একটু আগে। সারাক্ষণ সুকুমার আসবে ভেবে সত্যনারায়ণ জানালায় মুখ রেখে দাঁড়িয়েছিল। দেবদারু গাছটার নীচে এখন সেই বৌটা তার পঙ্গপাল নিয়ে বসে রয়েছে। একটা খনি বাজিয়ে বুড়ো লোকটা গান ধরেছে। ছোটো দুটো ছেলে বুড়োটার চারপাশে টুইস্ট নাচছে। রাস্তায় গাড়ি রিকশা তেমনি, নির্বিকার মানুষজন, এমন একটা পোড়া চামসে গন্ধ কারো নাকে লাগছে না। ওর তো সেই গন্ধটা সেই যে নাকে লেগে রয়েছে আর যাচ্ছে না। শনিবার বলে সকাল সকাল ছুটি। বেশ বড়োরকমের দাঁও মেরে উল্লসিত, একদণ্ড অপিসে সে দেরি করেনি। সোজা বাড়ি ফিরে মালতীর হাতে গোছা গোছা টাকা দিয়ে কোন একাউন্ট কীভাবে জমা দিতে হবে, এবং মালতীর জন্য আর দুটো নতুন ডিজাইনের অলংকার এ-ভাবে ভেবেছিল, হাতে মুখে চুমো খেয়ে রাতে একটা থিয়েটার সেরে আসবে। রান্নার মেয়েটা বাড়ির পাহাড়ায়। রানু শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়বে। রানু আজকাল একটু একটু খেতে পারছিল। বেশ নিরাময়ের ছবি আবার যখন ফুটে উঠছিল চারপাশে, তখনই সে একটা পোড়া চামসে দুর্গন্ধে বমি করে দিল। সিঁড়ির গোড়ায় যারা থাকে, অর্থাৎ একতলার ফ্ল্যাটে ওরা গন্ধটা পাচ্ছে না। পেলেও বোধ হয় আসছে যাচ্ছে না খুব একটা। সে সবাইকে জিজ্ঞেস করছিল গন্ধটা আপনারা পাচ্ছেন না! ওরা কেমন নির্বিকার মুখে তাকিয়ে দেখছিল, সত্যনারায়ণকে। লোকটা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মেয়েটা তার কতদিন থেকে একটা গন্ধ পাচ্ছিল, এবার সে পেতে শুরু করেছে।
