একটু খোলামেলা জায়গায় বাড়ি করে বসবাস করার আনন্দই আলাদা। গাড়ি ঘোড়ার আওয়াজে কান ফুটো করে দিচ্ছে না। রাতের নিস্তব্ধতায় এক সবুজ অরণ্যভূমিতে শুধু হ্যাজাক জ্বলত। বড়ো দূর মনে হত। কেমন স্বপ্নের দেশ মনে হত তার। সেই ময়ূরমুখি পালঙ্কে, সাদা চাদরের বিছানা এবং বড়ো দেয়াল আয়নার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে।
চুল আঁচড়াচ্ছে।
চুল নীল। কোমর পর্যন্ত চুলের গোছা। কানে ইয়ারিং পরছে। মুখে প্রসাধন। তারপর কোনো গল্পের বই নিয়ে শুয়ে পড়েছে বিছানায়। পা তুলে দিচ্ছে। শাড়ি নেমে যাচ্ছে।
অথবা কখনো মনে হত অহিভূষণের জ্যোৎস্না রাতে ঘাটলায় বসে আছে। মেয়েটি। কী নাম, কী করে সারা দিন তার কাটে সব কিছুই যেন এক রহস্যে ভরা। পরখ অসহ্য ঠেকলে হয়ত রাতে সে সরোবরের ঠাণ্ডা জলে অবগাহন করতে নামে। চোখের উপর কেন যে অদ্ভুত দৃশ্য সব ভেসে উঠত, দেখতে পেত, খোঁপা বেঁধে, শক্ত করে ক্লিপ এঁটে দিচ্ছে। মেয়েরা রাতে চুল ভেজায় না। তবে সাঁতার কাটতেই পারে। দেখতে পেত সে তার শাড়ি সায়া ব্লাউজ ছেড়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে জলে নেমে গেছে। বাড়ির ওদিকটায় আর কেউ থাকে বলেও সে জানে না। গোরু মোষের জায়গাটা একেবারেই আলাদা। ভিতরের দিকে কারো ঢাকার হুকুম নাও থাকতে পারে।
নির্জন মাঠের বাড়িতে একা একা বসে এসব চিন্তার মধ্যে তার এক আশ্চর্য অনুভূতি খেলা করে বেড়াত।
আর মাঝে মাঝেই সেই অনুভূতির স্বপ্নভঙ্গ ঘটত। কখনো কুসুম ডাকত, কিগো খাবে না। ব্যালকনিতে চুপচাপ বসে আছ কখন থেকে? কখনো স্বপ্নভঙ্গ-বুকটা ধরাস করে উঠত। লরি ঢোকার শব্দ। তার হেডলাইট। ইট ফেলার শব্দ।
কাঠ পড়ছে। কাঠ কাটার শব্দ।
কোথাও ছাদের সেন্টারিং হচ্ছে, তার শব্দ।
কখনো লোহার বিম ফেলার শব্দ।
সে এখানে এসেই টের পেয়েছিল, এক এক ঋতুতে এক এক জাতের পাখি উড়ে আসে। লম্বা ঠোঁট নীলরঙের ডানা মেলে তার বাড়ির আম জাম গাছে এসে বসত কী সব পাখি, জল পায়রা না বুনো হাঁস! সে পাখি বড় একটা চেনে না। বইয়ে পড়ে পাখির খবর রাখে, ডাহুক, গাঙশালিক, কাকাতুয়া, পায়রা ছাড়া আর কিছু বা পাখি আছে সে চিনতে পারে। সে তো হিমেল শীতের দেশ থেকে পাখিদের আসতে কখনো দেখেনি। ময়ূর কিংবা চড়াই পাখিও সে চেনে। কিন্তু চেনে না বুনো হাঁসেরা কী রকম হয়।
মেয়েটা বুনো হাঁস না জলপিপি। জলপিপি হোক বুনো হাঁস হোক, তার কিছু আসে যায় না। সুযোগ পেলেই সে অপরাহ্ন বেলায় বাঁধ ধরে হেঁটে যেত।
সেই অপরাহ্ন বেলা তার জীবনেও চলে আসবে একদিন জানত না। মেয়েদের বড়ো করতে গিয়ে, সে যখন বুঝল তার চারপাশ সত্যি দমবন্ধ হয়ে আসছে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাবার পর বাড়িটাও খালি হয়ে গেল। এক সন্ধ্যায় সে দেখল দূরের সেই রহস্যময় বাড়িটাও চোখের উপর থেকে হারিয়ে গেছে। সে নিজেও টের পায়নি। মধ্যে আর ফাঁকা জায়গা নেই। সর্বত্র ইটের জঙ্গল।—কখন কবে কীভাবে চোখের সামনে এত ঘরবাড়ি উঠে গেল তার খেয়ালই নেই। কুসুম আর তার দুই মেয়েকে সুখে রাখতে গিয়ে সে নিজেই জানে না সে সব হারিয়েছে। তারপর একদিন কাজ থেকে অবসরের পালা। বাড়ি ফিরে এল সন্ধ্যায় পর। মনে হল তার বাড়িটাও অন্ধকার হয়ে আছে। বাড়িতে কেউ আজ আলো জ্বালেনি। কুসুম শুয়ে আছে তার অন্ধকার ঘরে। চারপাশের ঘরবাড়ির জঙ্গলের ভিতর দিয়ে বাড়ি ঢোকার সময় মনে হল, সেই এক অন্ধকার গলি। পচা ভ্যাবসা গন্ধ নর্দমার। রাস্তা নেই-জল নিকাশি নালা নেই। কিংবা ঝম ঝম করে কোথাও কেউ পায়ে মল বাজিয়ে অদৃশ্য হয়েও যাচ্ছে না।
বিশ-পঁচিশ বছরে জায়গাটা কত বদলে গেছে, আজই যেন টের পেল। কুসুম দরজা খুলে দিলে, তাকে আজ ভারি অবসন্ন দেখাল। কুসুম আলো জ্বেলে দিয়ে দেখল, মানুষটা তার যেন সর্বস্ব হারিয়েছে।
কুসুম খাবার টেবিলে বলল, কী হয়েছে বলত! সারাজীবন কেউ চাকরি করে? অবসর তো একসময় নিতেই হয়।
অহিভূষণ ভাত নাড়াচাড়া করার সময় বলল, সারাটা দিন কাটবে কী করে। কোথায় বসব। বাড়ির চারপাশে এক বিন্দু সাধ নেই। খোলা আকাশ নেই। পাখিরা কোথায় সব চলে গেছে। সেই অন্ধকার গলির বাসিন্দা।
কুসুম মানুষটার কষ্ট বুঝতে পেরে বলল, অভ্যাস হরে গেলে আর খারাপ লাগবে না।
আর সকাল বেলাতেই মনে হল, আরে সেই রহস্যময় বাড়িটার খোঁজে গেলেও তো হয়। সে তো তাকে আরও কতবার দেখেছে। বাস রাস্তায় দেখেছে। চোখ তুললেই দেখতে পেত মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে চোখ পড়ে গেলে নামিয়ে নিত। লজ্জায়, না, চুরি করে গাছের আড়াল থেকে মেয়েটিকে ঘাটলায় দেখার জন্য—সে বুঝতে পারত না। ভারি লক্ষ্মীশ্রী মুখ। বাড়িটা কখন যে দালান কোঠার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল, সে টেরও পায়নি। কত বছর আগের কথা।
সে বাড়িটার খোঁজে সকালে বের হবার মুখে কুসুম বলল, কোথায় যাচ্ছ? সে কী বলবে কুসুমকে বুঝতে পারছে না। সকালে তো বাজার যায়, এছাড়া সকালে কোথাও যায় না গেলেও কোথায় যাচ্ছে বলে যায়। অথচ আজ কুসুমকে বলতে পারল না, তাকে খুঁজতে যাচ্ছি!
তাকে? সে কে?
সে যে কে বলে কী করে! সে যে কে নয়, সে যে তার কাছ থেকে বিশ-বাইশ বছর হরণ করে নিয়েছে বোঝায় কী করে।
বিশ-বাইশ বছরে জায়গাটা কত বদলে গেছে কুসুম কী টের পায় না! বিশ বাইশ বছর মানুষের জীবনে কত বড়ো ফারাক সৃষ্টি করে কুসুম কী জানে না!
