অহিভূষণ মজা পেত। হোক। দাম বাড়ক। তার বাড়িটা হয়ে গেলে যা খুশি দাম বাড়ক। বছর বছর দাম লাফিয়ে বাড়ছে। এই তো দোতলা করার সময় ইটের দাম একশো ত্রিশ নিল হাজারে। গোবিন্দ বিল্ডার্স বলত আপনি পুরানো খদ্দের। ছাড়ি কী করে। বাজারে চল্লিশ উঠে গেছে।
যাহোক বাড়িটা তার মন্দ না। নীচে দুখানা শোবার ঘর। উপরেও তাই। সামনে ব্যালকনি। কাচ দিয়ে ঘেরা। সে রাতে বাড়ি ফিরলে ব্যালকনিতে বসলে, দূর প্রান্তে গাছপালার ভিতর হাস্যকর আলো দেখতে পেত। তার ঘরে তখনো হারিকেন জ্বলে। গাছপালার ভিতর অন্ধকারে সেই হ্যাজাকের রহস্যময় আলোই একদিন কেন যে তার বাড়িটাকে আরও মহার্ঘ করে তুলল বুঝতে পারল না। অতদূরে কারা থাকে। সে দিনের বেলাতেও দেখেছে ওখানে একটা লাল রঙের ইটের বাড়ি। অনেকটা জায়গা নিয়ে মনে হয় বাড়িটা। সদর রাস্তা ভি আই পি থেকে নেমে কতদূর গেছে তার তখনো জানা হয়নি। তার বাড়িটা সদর রাস্তায় নয়। কিছুটা মাঠের ভিতর বলে, রাতে বড়োই নির্জন। কত রকমের সব পাখিরা উড়ে বেড়ায়। ঝোপে জঙ্গলে ডাহুক পাখির ছড়াছড়ি। রাতে ডাহুক পাখিরা কলরব তুললে আশ্চর্য এক ধবনি মাধুর্য সৃষ্টি হয়। শহরের বিষাক্ত বাতাস থেকে দূরে থাকার আনন্দও তার তখন কম না। শুধু খোলামেলাই নয়—একেবারে পরিত্যক্ত এলাকায় সে তার সুন্দর বাড়িটি তৈরি করে সুখেই ছিল। কুসুম, সে, বুড়ো জ্যেঠিমা, দুই কন্যা। ভি আই পি বেশি দূরও না। কুসুমের সঙ্গেই ইস্কুলে যায়। বাসে জায়গা পাওয়া যায়। বসেই যেতে পারে। এত সুখ তার। কুসুম তার বুদ্ধিবিবেচনার তারিফ করত তখন খুব।
ছুটির দিনেই হাতে সময়। সে বের হয়ে পড়ত। মাঠে আবার ইট পড়ছে। কার বাড়ি হচ্ছে! নাম ধাম, আলাদা সবই হয়ে যেত এক সময়। বাগজোলা ক্যাম্পের গরিব মানুষজন—সস্তাই মিলে যেত। ঠিকা কাজে লোক মিলত মেলা। সে হেঁটে যেত খাল বরাবর। ওপাশে সল্টলেকের ধূধূ প্রান্তর। শুধু বেনা ঘাস আর ভরাট জমি। দুটো একটা বাড়ি। বনেজঙ্গলে পাখির বাসায় সাদা ডিমের মতো পড়ে থাকত। একদিন সে আবিষ্কার করে ফেলল, লাল রঙের ইটের বাড়িটাও। হাঁটতে হাঁটতে সে তার বাড়ি ফেলে বেশ অনেকটা দূরেই চলে এসেছিল। সেই গাছপালার ভিতর লাল রঙের বাড়িটা চোখে পড়তেই দ্রুত কেন যে হাঁটতে থাকল বুঝল না। আসলে রাতের সেই হ্যাজাকের আলোর নেশা। বাড়িটা রহস্যময়। কারা থাকে। কারা রাত হলে হ্যাজাকের আলো জ্বালায়! প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ বিঘে জমি নিয়ে বাড়িঘর বানিয়ে কারা থাকে এই সবই ছিল রহস্য। দূর থেকেই বুঝেছিল বাড়িটায় নারকেল গাছের ছড়াছড়ি। আম জামও আছে। নিম গাছের ছায়াও পায় বাড়িটা। খালের বাঁধে বাড়িটা যে নীচু জমিতে তাও বোঝা গেল। গাছের ফাঁকে বিশাল সব খড়ের গাদাও চোখে পড়ত। লোকজন সাইকেল, বড়ো বড়ো টিনের ক্যান ঝুলিয়ে কাঁচা রাস্তায় নেমে সদর রাস্তায় চলে গেল।
কাছে যেতেই বুঝল, বাড়িটা জমির এক প্রান্তে। বড়ো বড়ো টানা প্ল্যাটফরমের মতো দু-চালা টিনের সেড। বিশ-বাইশটা জার্সি গোরু একদিকে। আর একদিকে বিশ-বাইশটা মোষ বাঁধা। চুনি ভূসির বস্তা থেকে টিনে বড়ো বড়ো করে নামাচ্ছে গো খাদ্য। একটা ছেলে, এদেরই কেউ হবে বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে সুর তোলার চেষ্টা করছে। কাক শালিক টিয়া পাখির ঝাঁকও দেখতে পেল। মৌটুসি পাখিরা কিচির মিচির করছে। দেয়ালে ঝুমকো লতার নীল ফুলের ছড়াছড়ি। তার মনে হয়েছিল, আসলে বিষয়ী মানুষের কারসাজি—দুধের কারবারি—তা হোক, লোকটার রুচি আছে বলতে হবে। বাড়িটা ভারি সুন্দর দেখতে। গাছপালা নিয়ে তপোবনের মতো হয়ে আছে। বাঁধ ধরে হেঁটে গেলে বাড়িটার সবই চোখে পড়ে। যদিও হঁটের পাঁচিল ঘেরা বাড়ি। খুব উঁচু পাঁচিল নয়—কোমর সমান। ইচ্ছে করলেই যে কোনো লোক দেয়াল টপকে বাড়িতে ঢুকে যেতে পারে। আর কিছুটা হেঁটে গেলেই লাল ইটের বাড়িটা সামনাসামনি। দুটো জামরুল গাছের ফাঁকে জানালাও স্পষ্ট। ভিতরে সুন্দর একটি পালঙ্ক। এমনকী রাস্তা থেকে বড়ো দেয়াল জোড়া আয়নাও দেখতে পেল।
কারা থাকে?
কৌতূহল স্বাভাবিক।
পালঙ্কটি ময়ূরপঙ্ক্ষী নৌকার মতো যে নানা সাজে সজ্জিত রাস্তা থেকে বুঝতে তার আদৌ কষ্ট হল না!
বাড়িটা পার হয়ে যেতেই দেখেছিল সুন্দর একটি সরোবর। ঘাটটা বাঁধানো। চুল খুলে এক যুবতী সেখানে বসে আছে। শীতের বিকেলে রোদের উষ্ণতা মেখে নিচ্ছে গায়ে। কিংবা চুল শুকোচ্ছে।
কেন যে সহসা মনে হয়েছিল তার মতো রাজপুত্র রাজকন্যার গল্পে এমন নারীর দেখা পাওয়া যায়। সে এখানে কেন? সঙ্গে সঙ্গে তার বুকটা ছাঁত করে উঠেছিল। মেয়েটি বোধ হয় তাকে দেখতে পেয়েছে। ত্বরিতে সে ঘাট থেকে উঠে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। এত চঞ্চল তার গতি যে পায়ে নূপুর থাকলে ঝম ঝম করে বেজেও উঠতে পারত। দেবী প্রতিমার মতো মুখ। বিশ বাইশ ত্রিশ যে বয়সেরই হোক—নারী নারীই।
তারপর অহিভূষণ আর দাঁড়ায়নি। বাড়ি ফিরে এলে কুসুম লক্ষ্য করেছিল, মানুষটি কেমন অন্যমনস্ক। সে অভিযোগ তুলেছিল, ছুটির দিনেও ঘুরে বেড়াও। রাত হয়ে গেল ফিরতে! মেয়েদের নিয়ে বসলেও তো পারো! একটারও পড়ায় মন নেই।
তা পাঁচ-সাত বছরের দুই মেয়ে তো সামান্য তরলমতি হবেই। পড়তে ভালো লাগবে কেন? শহরের এঁদো গলি থেকে এখানে উঠে আসায় মন ব্যাজার অবশ্য বছর না ঘুরতেই জায়গাটার মায়ায় তারাও জড়িয়ে গেল। পথ পাথালি, ঝোপ জঙ্গল, প্রজাপতি মানুষকে যে সহজেই জড়িয়ে ফেলে ছেলেদের দেখলে অহিভূষণ টের পেত। অফিস থেকে ফিরে তার তখন রোজ এক বাতিক। সে ব্যালকনির ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে দিত। হাত-মুখ ধুয়ে জামা-প্যান্ট ছেড়ে সেই যে বসত আর নড়ত না। চা জলখাবার কাজের মেয়েটা দিয়ে যেত। হারিকেন জ্বলত—এবং সামনে-উদাস মাঠে কখনো জ্যোৎস্না খেলা করে বেড়াত। আকাশে নীল হলুদ রঙের নক্ষত্ররা নাচানাচি করত—দূরে খাল পার হয়ে সবুজ এক যেন অরণ্য জেগে থাকত।
