বাড়িটা করার সময়, চারপাশে মাঠ। দূরে ওই লালরঙের বাড়িটা ছাড়া। আর তো কোনো লোকালয় ছিল না।
সে ব্যালকনিতে বসে দেখত সব।
বাড়ির ঠিক পাশে জলা জমি, ঝোপ জঙ্গল সবুজ মাঠ, গাছপালাও কম ছিল না। বাঁশের বন, এবং শীতের সময় উড়ে আসত অজস্র পাখি। জলা ভূমি, ডোবায়, ঝোপে জঙ্গলে তারা করব করত।
ডোবার জঙ্গলে এক জোড়া ডাহুক পাখিও সে আবিষ্কার করেছিল। সে বাড়ি তৈরি করে যখন আসে তখন তো তাদের ছানাপোনা, এঁটো-কাটা খেতে বাড়িতেও ঢুকে যেত। মধ্যরাতে ডাহুকের কলরব, জ্যোৎস্নায় মাঠঘাট ভেসে গেলে সে উঠে গিয়ে বসত ব্যালকনিতে। ডাহুকের কলরবের মধ্যে থাকত এক আশ্চর্য মিউজিক, যে মধ্যরাতে জ্যোৎস্নায় টের পায়নি ডাহুকের কলরব সে জানেই না জীবন কত আশ্চর্যের সব সমষ্টি।
সেই ডাহুকের কলরব নেই। কোথায় যে গেল তারা!
সেই শীতের পাখিও আর আসে না।
শুধু ইট কাঠ আর মানুষ জন, রাস্তায় হাঁটা যায় না। দোকান পাট, বড়ো বড়ো বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট, গাড়িতে সুন্দর সুন্দর বালিকারা স্কুলে যায়, দম্পতিরা গাড়ি করে ফ্ল্যাট বাড়িতে ঢুকে যায়, তারা জানেই না এই এলাকার একজন মানুষ পৃথিবীর তাবৎ সৌন্দর্য নিয়ে নির্জন নিরালার খোঁজে এখানে এসে উঠেছিল। আসলে সে যাচ্ছে সেই নির্জনতার খোঁজে।
মাঠ পার হয়ে খালধার ধরে অনেকটা হেঁটে গেলে সেই বাড়ি। সেখানে সে ঘাটলায় আবিষ্কার করেছিল, আর এক কুসুমকুমারীকে। কুসুমকুমারীর খোঁজে সে যাচ্ছে। কুসুমকে সে বলবে কী করে, গোপনে এই প্রকৃতির সৌন্দর্য আবিষ্কার করতে গিয়ে আর এক কুসুমকুমারীকে আবিষ্কার করে ফেলেছিল। বিশ-বাইশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া, বিশ-বাইশ বছর না তারও কম এখন ঠিক হিসাবে খুঁজে পায় না। আসলে কোনো অতীতে যেন সে তাকে আবিষ্কার করেছিল। কুসুমের গলায় ঝাঁজ।
কোথায় যাচ্ছ বলবে না?
আরে এখন মেলা সময় হাতে। কাজ কাম সব শেষ। ঘুরে দেখতে। এতদিন সময় পাইনি।
তাই বলে সক্কাল বেলায়।
আসলে সে বোঝায় কী করে, তার অখণ্ড অবসরই পাগল করে দিয়েছে তাকে। জীবনের ব্যস্ততা হারিয়ে গেলে সব যে শেষ। কুসুমকে বোঝায় কী করে। সে নতুন জীবনের খোঁজে আছে।
তাকে তো সময় কাটাতে হবে।
বন্ধুবান্ধবও নেই বিশেষ। আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক আলগা হয়ে গেছে। কুসুম আর তার মেয়েদের সামলাতে গিয়ে কখন সম্পর্কহীন হয়ে গেছে সে নিজেও জানে না।
যদি সেই বাড়িটার খোঁজে, বের হয়ে পড়তে পারে দেখা যাক না, এটাও তো আবিষ্কারের সামিল হয়ে যাবে। কার বাড়ি, কে করল, কোথায় আগে তারা থাকত, লোকজনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারলে বেঁচে যেতে পারে। সে বলল, খাল ধারে ঘুরে আসি।
এত বেলায়!
কুসুম যেন মানুষটাকে চিনতে পারছে না। কী করে সে!
তা হলে বলছ বিকেলে বের হতে।
কুসুম বলল, বিকেলে খালের ধারে বেড়াতে যাবার কী হল!
ভি আই পি ধরে ঘুরে এস না! ভালো লাগবে। সেই গাড়ি-ঘোড়া!
আরে গাড়ি-ঘোড়াই তো মানুষকে ছুটিয়ে নিচ্ছে বোঝো না!
তা ঠিক। জায়গাটা কী হয়ে গেল!
আপশোষ।
সকালে পারল না। তবে বিকেলে সে বাড়িটার খোঁজে বের হয়ে গেল। খালের ধার ধরে হেঁটে যেতে থাকল। এখানটায় ছিল একটা অশ্বথ গাছ, এখানটায় বাঁশের জঙ্গল, এখানটায় জলাজমি, এখানটায় সবুজ মাঠ। কিন্তু এত বড়ো বড়ো অ্যাপার্টমেন্ট, টেনিস র্যাকেট হাতে বালিকার লন পার হয়ে যাওয়া, সাদা ফ্রক, আর কি সুঠাম শরীর—কেউ না কেউ দেখছে, সে যেমন দেখত বিশ-পঁচিশ বছর আগের সেই কুসুমকুমারীকে। সামনে সব সরকারি ফ্ল্যাট, কো অপারেটিভ করে বাড়িঘর—যতদূর চোখ যায় মানুষের জঙ্গল। সে অনেক খুঁজল। কিন্তু সেই কুসুমকুমারীর বাড়িটা আবিষ্কার করতে পারল না। জার্সি গোরু, একটি ছেলের খড়ের গাদায় শুয়ে বাঁশি বাজানো, হাক ডাক, দুধের ক্যানেস্তারার ঠনঠন শব্দ কোথাও কান পেতে শুনতে পেল না। ঘাটলাও নেই। কিছুই সে খুঁজে পেল না। তবু কী যে হয় তার, বাড়ির এই রহস্য, কিংবা হারিয়ে যাওয়ার রহস্যের খোঁজেও যদি সে ব্যস্ত থাকে তবে তার আর অখণ্ড সবারই যে একটা রহস্যময় বাড়ি দরকার। খুঁজে দেখা যাক না ঠিক কোথায় সেই বাড়িটা ছিল।
গন্ধ
কলকাতায় আবার বৃষ্টিপাত আরম্ভ হয়েছে। রাস্তাঘাট এবং সব সবুজ মাঠ যদি কোথাও থাকে প্রায় খালবিলের মতো। উত্তর থেকে হাওয়া এলে জানালা দরজা খুলে দেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ থেকে হাওয়া এলে দরজা জানালা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বৃষ্টিপাতের সময় দক্ষিণের হাওয়া প্রবল। গাড়ি ঘোড়া বাস ট্রাম ভিজতে ভিজতে চলে যায়। কখনো সার সার থেমে থাকে। বিদ্যুৎ চমকায়। আকাশ চুরমার করে দিয়ে বজ্রপাতের শব্দ নেমে আসে। তখন কেউ হুইসকি গলায় ঢেলে বৃষ্টিপাতের শব্দ শুনতে ভালোবাসে। ক্যাবারেগুলোতে মধ্য যামিনীতে উদ্দাম। নৃত্যমালা। কলকাতায় যে বৃষ্টিপাত আরম্ভ হয়ে গেল, একেবারেই তখন তা বোঝা যায় না।
দেবদারু গাছটা ল্যাম্পপোস্টের মতো দাঁড়িয়ে ভিজছে। সকাল থেকে বৃষ্টি। সারারাত বৃষ্টি গেছে। রাস্তায় জল জমছে। বাড়ছে। লোকজন হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে, মেয়েরা শাড়ি তুলে, ছেলেরা প্যান্ট ভিজিয়ে জল ভেঙে যাচ্ছে। কলকাতার এ-সময়ের চেহারা কেমন পাল্টে যায়। নরকের মতো হয়ে যায়। এবং দেবদারু গাছটার নীচে যে সংসারটা ছিল সেটা থাকে না। কোথাও উধাও হয়ে যায়। এবং জল নামতে শুরু করলে, হাইড্রেন খুলে ফেললে দেখা যায় শহরের ওপর সব কাক উড়ছে। এ-সময়টাতে শহরে বোধ হয় কাকের উপদ্রব বাড়ে।
