শশী বলল, সোনার ধান্য আমার। সোনামণি বলল, সোনার ধান্য আমার। তু আমার সোনার ধান্য চুরি করে লিচ্ছিস। বলেই হক করে শশীর গলাটা কামড়ে ধরল। ভালোমানুষের ছা শশী মুরগির মতো, জবাই করা মুরগির মতো উঠে দাঁড়াল। দু-তিনটে বড়ো লাফ দিল কাদার ভূঁইয়ে, পাগলের মতো দু-হাত উপরে তুলে ঘুরে ঘুরে শেষে এক আলিসান ভুজঙ্গের মতো লুটিয়েপড়ল। সোনামণি, সামান্য এক প্রাণ-পাখি শশীর মতো দানবের, যে আকালের ঘণ্টা বাজাত, প্রাণ হরণ করে চলে গেল। তখন থেকে থেকে পাখির ডাকটাও কমে গেছে, থেকে থেকে শশীর হ্যারিকেনটা খামারে দপদপ করে জ্বলছিল, শুধু জ্বলছিল। তেপান্তরের পাখিটা শূন্যে তখন উড়ছিল, ঘুরছিল আর বুঝি বলছিল—আকালের ঘণ্টা কে বাজায় দেখ।
কুসুম শুয়ে আছে তার অন্ধকার ঘরে
বছর পঁচিশেক আগে গায়গাটা ছিল জলাজমি ধানের খেত অথবা ভেরির জঙ্গল। যেদিকে চোখ যায় শুধু শূন্য প্রান্তরে ইতস্তত গাছপালা। মাঠ এবং গরিব মানুষের জন্য বসবাসের কিছু ঘরবাড়ি। কাঁচা রাস্তা। গোরুর গাড়ির কোঁ কোঁ আওয়াজ। সারাদিনে দু-চারটে গোরুর গাড়ি বহুদূর বিস্তৃত প্রান্তরে হারিয়ে যাবার জন্য হেলেদুলে যাত্রা করত। সকাল বেলাতেই কিছু সাইকেল আরোহীর আনাগোনা। ঝাঁকা মুটেওয়ালা আর মাছের ব্যাপারী কিংবা আড়তদারদের লোকজনের যাওয়া আসা চোখে পড়ত।
অথচ জায়গাটা বড়ো শহর থেকে দূরেও নয়। পাকা রাস্তা চলে গেছে এয়ারপোর্ট বারাসাত পার হয়ে। এয়ারপোর্ট যাবার ভি আই পি রাস্তাটাই আসলে যত গণ্ডগোল সৃষ্টি করে ফেলল। লোকজন শহরের কাছাকাছি জায়গায় নির্জন এলাকায় চলে আসতে থাকল। শহরের এঁদো গলি থেকে মুক্তি কে না চায়।
বিষয়ী লোকেরা নানা ধান্দায় ঘোরে। তিন-চারশো টাকায় বিঘা মিললে টাকা খাটাবারও সুরাহা হয়। জমি শুধু দেয়, নেয় না কিছুই। তারা ভালোই বোঝে।
তবে অহিভূষণ একটু অন্য ধরনের মানুষ। শহরে সামান্য চাকরি এবং বাড়ি ভাড়া তাকে তাড়া করত। মাথা গোঁজবার ঠাঁই নিয়ে দুশ্চিন্তা। কারখানার অবস্থাও ভালো না। শেষে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে না হয়! সুযোগ মতো তিন চার কাঠা জমি পেলে সে-ও কেনে। বন্ধু নগেনই বলেছিল, কাঠা চারেক জমি রেখে দে। আখেরে কাজে লাগবে।
বন্ধুর পরামর্শেই বলতে গেলে জমি কেনা, আর জমি যে মা লক্ষ্মী বছর দুই না ঘুরতেই সে তা টের পেয়ে গেল। ঘরবাড়ির নেশা কার না থাকে। কুসুম একটা স্কুলে চাকরি পেয়ে যাওয়ায় হাতে দু-পয়সা জমতেও থাকল। অহিভূষণকে বলতে গেলে বাড়ি করার নেশায় পেয়ে বসল। অফিস ছুটির পর বাড়তি কাজের সুবাদেও পয়সা আয় হতে থাকল। এবং দেখতে দেখতে সে তিন কামরার একখানা বসত বাটির মালিক হয়ে গেল। এমন পাণ্ডব বর্জিত এলাকায় তার বাড়িঘর, কারণ যতদূরেই চোখ যায় পাকা বাড়ির হদিশ মেলে না। বাগচিবাবু, সাহাবাবু ছাড়া কেউ ঘরবাড়ি বানাতে তখনো রাজি ছিল না। জমি কেনা-বেচা চলছে ঠিক, তবে তারা সবাই ফাটকাবাজ। জমির দর উঠলে বেচে দেবে। একমাত্র তারাই তাকে উৎসাহ দিত। মানুষজন হল সেই মশামাছির মতো। বুঝলেন, আপনাদের দেখলেই লোকে বাড়ি ঘর বানাতে সাহস পায়। বাড়িটা দোতলা হয়ে যাওয়ার পর অহিভূষণ লক্ষ্য করল, রাস্তার ধারে দু-চারটে সত্যি নতুন বাড়ি উঠছে। ওর ভালোই লাগত। মানুষজন মৌমাছির মতো। ঝাঁকে ঝাঁকে ওড়ে, ভালো পেলে বসে যায়। আরও উত্তরে। জায়গাটা যে আর পাণ্ডব বর্জিত এলাকা থাকবে না সে ভালোই জানে। নিজেকে যথেষ্ট বিচক্ষণ ভাবতে ভালো লাগে। কথায় কথায় কুসুমকে খোঁটা দিতেও ছাড়ে না!
কী বুঝছ?
কী বুঝব আবার!
জমি দেখে তো ভিরমি খেয়েছিলে। অ মা তোমার কি মাথা খারাপ। কোমর জল। জমি কোথায়। এখন বুঝছ জমি কোথায়?
কুসুম অবশ্য জমিটা দেখে ভেঙেই গেছিল! ভি আই পি রোডে উঠে গুম মেরে ছিল। সত্যি টাকাটা বুঝি জলে গেল। জমিতে কুসুমেরও শেষ কপর্দক খরচ। তা বলে কোমর জলে তুমি জমি খুঁজতে গেলে!
তারও মনে হয়েছিল, জমি নিয়ে সে তো ফাটকা খেলতে বসেনি। জমি ফেলে রাখার জন্যও কেনেনি। মাথার উপর একটুখানি ছাদের আশায়ই তো জমি কেনা। সেই জমি জলের তলায় থাকবে। কুসুম রাগ করতেই পারে। সে কুসুমকে সেদিন কোনো বোঝ প্রবোধ দিতেও সাহস পায়নি। দুদিন বাদে বলেছিল, নগেন তো বলল, খাল কেটে মাটি তোলার সময় সস্তায় মাটি পাওয়া যায়। কত পুকুর ডোবা বুজিয়ে যাদবপুর এলাকায় দেখনি মানুষ ঘরবাড়ি বানিয়েছে। আমরাও না হয়…..না মানে নগেন বলছিল, সস্তায় সে মাটির ব্যবস্থা করে দেবে। শ-দুই টাকা বাড়তি খরচা, ঠিক করে ফেলব। জল আর থাকবে না। জমি ভরাট হয়ে যাবে।
ঠিক করেও ফেলল। তিন-চার বছরে, সে দোতলায় উঠে আসতে পেরেছে। একশো পাঁচ টাকা ইটের হাজার, তেরো টাকা সিমেন্টের বস্তা, সেগুন কাঠের কিউবিক ফুট পয়তাল্লিশ টাকা। বাড়ির জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে গেল। বাগচিবাবু দেখা হলে বলত কত দর নিচ্ছে।
অহিভূষণ বলত, আর বলবেন না একশো পাঁচ টাকা হাজার এক নম্বর ইট। তাও যদি এক নম্বর হত। কী করি বলুন! পাই কোথা। বাড়ি করতে গিয়ে জেরবার।
বাগচিবাবু চোখ বড়ো করে বলতেন, একশো পাঁচ টাকা। শোনা কথা। আমার সাহসে কুলোত না। আশি টাকা হাজার গছিয়ে দিয়ে গেল বলে বাড়ির কাজে হাত দিয়েছিলাম। কী যে হচ্ছে। আকাশ ছোঁয়া হয়ে গেল মশাই। বাড়ি আর কারও করতে হচ্ছে না।
