মহীতোষ দেখল, গামছা, জ্যালজ্যালে গামছা পরনে একজন মানুষ হাতে কাঁকড়া ঝুলিয়ে চড়া রোদের ভেতর দিয়ে ছুটছে। দিগন্তের দিকে ছুটে যাচ্ছে। কোনোও গাছতলায় শুয়ে থাকবে আবার। মেঘবৃষ্টির জন্য এই নিরন্তর অপেক্ষা বুঝি সব মানুষের।
মহীতোষ বুঝল লোকটা আসলে সে নিজে।
তারও এখন দরকার কোনো গাছের ছায়ায় চুপচাপ বসে থাকা। কিংবা শুয়ে থাকা। গাছের ছায়ার জন্য সে হেঁটে যেতে থাকল। সঙ্গে একটা বেহালা থাকলে বড়ো ভালো হত। সুমার মাঠে কেন যে তার ইচ্ছে হল বেহালা বাজাতে বাজতে চলে যায়।
তার এই ইচ্ছের কথা ভেবে সে আর মুহূর্ত মাত্র দেরি করল না। লোকটা যেদিকে গেছে সেদিকটায় ধাওয়া করল। পারল না। হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। আর উঠল না।
মাঠচরার দল ঝড়বৃষ্টি ভেঙে বাড়ি ফেরার পথে দেখল, একজন মানুষ সুমার মাঠে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে।
বাজ পড়ে মারা যেতে পারে।
গাঁয়ে তারা খবরটা পৌঁছে দিল শুধু।
কাল-ভুজঙ্গ
নিশি ফিসফিস করে ডাকল, সোনামণি, অ সোনামণি।
সোনামণি কোনো উত্তর করল না। মানুষটা বারান্দায় বসে সোনামণিকে ডাকছে। সোনামণি উঠনে কচু সেদ্ধ করছে। দু’মেয়ে সোনামণির। অঙ্গি বঙ্গি দুই ছানাপোনা উনুনের ধারে কচু সেদ্ধ হবার আশায় বসে রয়েছে। উদোম গায়ে বসে। আছে। আর অভাব সোনামণির নিত্যদিনের। সারা অঞ্চল জুড়ে খরা আর খরা। বর্ষা নেই। বৃষ্টি হচ্ছে না। বৃষ্টির আশায় মানুষটা বারান্দায় বসে আকাশ দেখছিল। বর্ষা এলেই ফসল ফলবে। ঝোপে-জঙ্গলে শাকপাতা গজাবে। অন্ন নেই পেটে, মানুষের অন্ন না থাকলে মাথা ঠিক থাকে না। সুতরাং নিশির ডাকে সোনামণি বিরক্ত হচ্ছিল।
‘কিছু বুলছিলম রে সোনামণি’, খর গলায় ফের ডেকে উঠল নিশি।
তবু সোনামণি জবাব দিল না। মানুষটা খাবার লোভে অমন করছে।
আমি কি তুর কেউ না রে সোনামণি? এবার সোনামণি খেপে গেল। তু আমার ভাতার নিশি। রাগলে সোনামণির কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। মরদকে ভাতার, আসলে ভাতার অথবা গালাগাল-মরে না কেন, যম কি নেই, হা ঈশ্বর, তুর মুখে আগুন—এ সব বলে সোনামণি কেমন সুখ পায়। সুখ পায়। সুখ পেলে তখন কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে কটুবাক্য বর্ষণ। বারান্দা থেকে অল্প জ্যোৎস্নায় নিশি টের পেল—সোনামণি এবার হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে কটুবাক্য বর্ষণ করবে। ভয়ে নিশির গলা প্রায় কাঠ হয়ে গেল। সে ভয়ে ভয়ে বলল, রাগ করিস না সোনামণি। তুকে একটা কথা বুললে রাগ করে লিবি না তো!
‘মরণ’—সোনামণি মুখের ওপর ঝামটা মারল একটা। মাঠে এখন আগুন জ্বলছে, পেটে আগুন—মানুষটার চোখে আগুন। সোনামণি এই প্রখর খরার দিনে নিশির চোখে আসঙ্গলিপ্সা দেখে ভয় পেয়ে গেল।
মরণ বুলছিস সোনামণি। মরণ বুলতে লাই রে। মরণ বুললে স্বামীর ঘরে আগুন লাগে। ঢোল বাজায় যে মানুষ, যে মানুষ বাড়ি বাড়ি পূজা-পার্বণে ঢোল বাজায়, কাঁসি বাজায় তারে মরণ বুলতে নাই। তারপর বারান্দা থেকে সন্তর্পণে নেমে খোলা মাঠের দিকে মুখ করে বলল, তুই সোনামণি নিশির সঙ্গে মাঠে যাবি। বড়ো মাঠ। মাঠের দক্ষিণ সামুতে সরকারি খামার। খামারে বাবুরা বীজের ধান্য বুনেছে। সোনামণি রে সোনামণি, কী ধান্য, কী ধান্য! বলে নিশি একটা ঢোঁক গিলল। নিশি, যে ঢোল বাজায় পূজা-পার্বণে, যে কাঁসি বাজায় পূজা-পার্বণে, মুচিরাম হিদে যার বাপ ছিল, পাঁচ কাঠার জমির ওপরে যার ঘর ছিল, যার এখন কিছুই নেই—সব বন্ধক নিয়েছে ভালোমানুষের ছা শশী। শশী এখন বাবু, বাবু শশী খামারে এখন দারোয়ানের কাজ করছে।
সোনামণি বলত–নাগর আমার!
সেই নাগরের বিয়েতে, কন্যার অন্নপ্রাশনে ঢোল বাজিয়েছে নিশি। পাপ মুছে পুণ্য তুলে দিয়ে এসেছে, আর ধান্যদূর্বা ঢোলের উপরে-নিশি কত মঙ্গলকামনা করেছে শশীর। সেই শশীবাবু দু-গণ্ডা টাকায় জমি বন্ধক রেখে সোনামণি সহ নিশিকে বিবাগী করে দিল।
নিশির দুই মেয়ে, অঙ্গি বঙ্গি। ওরাও পূজা-পার্বণে নিশি ঢোল বাজাতে গেলে ছোটো গামছা পরে সঙ্গে সঙ্গে যায়। বাপের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি কাঁসি বাজায়। কিন্তু, খরা প্রবল খরা। এখন আর কে কার পাপ মুছে পুণ্য নেয়। তাই অঙ্গি বঙ্গি, দুই মেরে কচু সেদ্ধ পাতে তুলে খুব তারিয়ে খাচ্ছে।
বোধহয় দুই মেয়ের তারিয়ে তারিয়ে খাওয়া দেখেই নিশি আগুন হয়ে উঠেছিল। পেটে আগুন, পিঠে আগুন, সারা মাঠময় শুধু আগুন ছড়িয়ে আছে— ক্ষুধার আগুন। নিশি ক্রমশ ধৈর্য হারিয়ে ফেলছিল—’অ সোনামণি, শুনতে পেছিস।
দুই মেয়ের খাওয়া দেখে সহ্য হচ্ছে না মানুষটার। সোনামণিও আগুন হয়ে আছে ভিতরে ভিতরে। সে দাঁত শক্ত করে বলল, শুনতে পেছিস নাগর।
সব শুনতে পেয়েছে, তবে সে এবার গলে গলে পড়ল। অরে সোনামণি, অ সুমি, তবে দে, দুটা খেয়ে লিলে শান্তি পাই।
‘হা আমার মানুষ রে! বলে সোনামণি কপালে করাঘাত করল। প্রায় বিলাপের মতো সুর ধরে বলতে থাকল, হায় ছানাপোনা পাখ-পাখালির হয়, গাছের পাতা মাছের মাথা হেথা-হোথা যা মিলে লিয়ে আসে, ছানা-পোনার কষ্টে পাখ-পাখালির ঘুম থাকে না চোখে—আর তু এক মনুষ্যের ছানা, মেরে দু’টা খেয়ে লিচ্ছে তর সহ্য হচ্ছে না!
অরে সোনামণি, অরে সুমি, তুই এমন করে রেতের বেলা বিলাপ করিস না। বিলাপ করলে মাঠে-ময়দানে মড়ক লেখেছে ভেবে সকলে ছুটে আসবে। আমি এক মানুষ, ঢুলি মানুষ, আমার দুই মেয়ে অঙ্গি বঙ্গি, ঢুলি মানুষের অমঙ্গল বইতে নাই। নিশির ইচ্ছা হল, ঘরে ঢুকে ক্ষিধের জ্বালায় ঢোলটা কাঁধে নিয়ে মাঠে নেমে যায়। মেয়ে দুটো কচু সেদ্ধ খাচ্ছে। সোনামণি কাঠের হাতা নিয়ে বসে রয়েছে, ওরা পাতেরটুকু শেষ করে ফেললেই বাকিটুকু ঢেলে দেবে। নিশির ঢোল নিয়ে ছুটতে ইচ্ছা হল মাঠে, তারপর ঢোলের উপর বোল তুলে, ছররা ছুটিয়ে, মাঠে ময়দানে আগুন ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছা হল। ক্ষুধার আতঙ্কে সোনামণির গলা টিপে ধরতে ইচ্ছা হল।
