দুই উলঙ্গ শিশু।
বাড়িতে গেছে। ধীরুর তখন বছর তিনেক বয়স।
সে বাড়ি গেলেই ধীরু তারক সামনে। কত কথা।
যেমন বলত, জান জেঠু আমি রসগোল্লা খাই।
সে বলত, আর কী খাও!
পাউরুটি খাই। ইস্কুলে জান পাউরুটি দেয়। তারপর আবার বলেছিল, আমি রসগোল্লা খাই।
আর কী খাও?
আমি ভাত খাই ডাল খাই পাউরুট খাই। রসগোল্লা খাই।
আসলে যেন বড়োলোক জেঠুকে খবর দেওয়া সে রসগোল্লা খায় না এমন কেউ বললে মিছে কথা হবে।
মহীতোষ এক হাঁড়ি রসগোল্লা আনিয়ে ভেবেছিল, ভাইপো ভাইঝিদের পেট ভরে রসগোল্লা খাওয়াবে।
ধীরুকে বলেছিল সে।
ধীরু সব সময় দু-হাত পেছনে রেখে দাঁড়ায়। পেট শ্রীঘটের মতো। অপুষ্টিজনিত এই শরীর। সে বোঝে। কিন্তু যা কিছু করে গোপনে–এমনকী একবার খবর পেয়ে তার চাবি সিজ করে ফেলল। সে অশান্তিকে বড়ো ডরায়।
ধীরু এক হাতে রসগোল্লা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
মহীতোষ ভেবেছিল, একটা করে খাবে, একটা করে দেবে। আশ্চর্য ধীরু কিছুতেই হাতের রসগোল্লা খেল না।
মহীতোষের মধ্যেও ছেলেমানুষি প্রবল হয়ে উঠেছিল। বলেছিল, খা আবার দেব।
ধীরু ডান হাত পেতে বলেছিল, দাও।
আরে ওটা খা, খেলে তো দেব।
ধীরু কিছুতেই জেঠুকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সবাইকে দিল, টপাটপ খাচ্ছে। কিন্তু ধীরুকে আর একটা না দিলে হাতেরটা খাবে না। সত্যি খেল না। রসগোল্লার হাঁড়ি শেষ। পাঁচ-সাতজন ভাইপো ভাইঝি—কতক্ষণ লাগে। ধীরু ওই রসগোল্লাটি নিয়ে, গাছের ছায়ায় ঘুরে বেড়ালো। চিমটি কেটে মুখে দিচ্ছে। ফুরিয়ে গেলে তো আর পাবে না। ঘণ্টাখানেক পরেও মহীতোষ দেখেছিল, সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে চিমটি কেটে রসগোল্লার স্বাদ নিচ্ছে ধীরু। মহীতোষ কত বড়ো অমানুষ সেদিনই টের পেয়েছিল। সে তার স্ত্রী এবং পুত্রদের স্বার্থে—নিজের পৃথিবী থেকে কখন যে অজ্ঞাতবাসে চলে গেছে সেদিনই টের পেয়েছিল।
মহীতোষ বুঝতে পারছে জীবনে বেঁচে থাকার সব রহস্যই তার মুছে যাচ্ছে। বুঝতে পারছে বয়সের তাড়না শুরু হয়ে গেছে জীবনে। সবাই যে যার মতো আত্মসর্বস্ব, স্বার্থপর।
কিছুই আর তার ভালো লাগে না।
কোনও ঋতুই আর তার জন্য নতুন খবর বয়ে আনে না।
সে নদীর পাড়ের মানুষ। একা একা হেঁটে যাচ্ছে।
আকাশে মেঘ, কখনও বজ্রপাত অথবা নীল আকাশ এবং নক্ষত্রমালা—কিছুই চমক সৃষ্টি করে না আর। যেন এভাবেই মানুষের জন্ম হয়, মৃত্যু হয়, শেষ হয়। সব। তবু শৈশব এক রকমের, যৌবন এক রকমের। প্রৌঢ় বয়সে সে বোঝে ভারি একা। নদীর পাড়ের মানুষ হয়ে যায়। ঘরে মন টেকে না, কেবল বের হয়ে পড়তে ইচ্ছে হয়। কেমন ঘোরের মধ্যেই সে ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে।
তবে কোথায় সে যাবে জানে না।
সবকিছু অর্থহীন, জীবন এবং বেঁচে থাকা। মৃত্যুর অধিক বেঁচে থাকা আহাম্মকের প্রলাপ।
এই সব তাড়নায় যখন সে পাগল, তখনই চকিতে মনে হয় কে তাকে খণ্ড খণ্ডভাবে রেখে এসেছে নদীর চরায়, কাশফুলের মাঠে, গয়না নৌকার পাটাতনে। কিংবা দূরে মামার বাড়ি যাবার পথে কোনো বুড়ো নিমের ছায়ায়।
তার চোখ জলে ভেসে যায়।
আর তখনই মনে হল দূরে হল্লা।
সে শানের উপর উঠে বসল। এদিকটায় তবে কোনো গ্রাম আছে। সে হেঁটে যেতে থাকল। ঘাস বনজঙ্গল মাড়িয়ে সে যাচ্ছে। সে যে মহীতোষ, সে যে কৃতী মানুষ, সে যে কলকাতায় তার ভোগের সর্বস্ব ফেলে চলে এসেছে দেখলে মনেই হবে না। সামনে পুকুর, পরে রেল লাইন, দূরে কোনো স্কুলবাড়ি। আরও দূরে স্টেশনে সিগনাল। সে হেঁটে গিয়ে দেখল পুকুর পাড়ে তারই মতো একটা লোক শুয়ে আছে। খবর পেয়ে মানুষজন ছুটে আসছে। স্টেশনের কাছাকাছি এলাকা, দূরে ধুধু মাঠ ছাড়া সামনে আর কিছু চোখে পড়ে না। সে লোকটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। গাঁয়ের কিছু মানুষ লোকটাকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যেতে চাইছে। কেন বুঝছে না। আর তখনই দেখল, হাতে একটা বিশাল কাঁকড়া থাবা বসিয়ে দিয়েছে। আঙুলের দু-পাশে সাঁড়াশির মতো চেপে বসেছে কাঁকড়ার বিশাল ঠ্যাং। গোরু চরাতে এসে পুকুরের তলানিতে শামুক গুগলি খুঁজতে গিয়ে এই মরণ।
আঙুল থেকে চুইয়ে রক্ত পড়ছে।
এই মাধা, কী বলছে ব্যাটা। কাঁকড়াটা মার।
মাধা বলছে, না লাগবে।
মাধা বলছে, ওয় থাক, আমমো থাকি।
কাঁকড়ার কামড় হজম করছে মাধা। ভিড়ের মধ্যে মহীতোষকে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। স্টেশনে নানা কিসিমের বেওয়ারিশ লোক ঘুরে বেড়ায়। মহীতোষ তাদের একজন হয়ে গেছে।
ইস কী কষ্ট।
হাত ছাড়িয়ে নিচ্ছে। কাউকে কাছে আসতে দিচ্ছে না। কাঁকড়ার কামড়!
মাধা কেবল বলছে, ওয় থাক, আমমো থাকি। মেঘ না ডাকলে কামড় ছাড়বে না। মহীতোষ ভাবল, ওয় থাক, আমিও থাকি, ভারী সার কথা বলছে তো লোকটা!
কাঁকড়াটা মেরে ফেললেই হয়!
বা বাবু। বড়ো কামড়। মরে গেলে শেষ কামড় বসাবে। হাড় ফুটো করে দেবে। মহীতোষ এ-দৃশ্য দেখেনি। জানে না, তাহলে কাঁকড়ার কামড় মেঘ গুড়গুড় না করলে খোলে না। সে কেমন আহাম্মকের মতো দেখল শুধু।
কে একজন বলল। শালো ব্যাটা কাঁকড়ার গহ্বরে হাত! বোঝ। ধরতে জানিস না!
মাধার এক কথা, না ধরবে না। কাছে আসবে না। আর যেই না পাঁজাকোলে করে তাকে নিয়ে যাবার চেষ্টা—তখনই দৌড়। মাঠের উপর দিয়ে দৌড়োচ্ছে। আগুনের হলকা রোদে। খরায় জ্বলছে সব। মাঠ ঊষর হয়ে আছে। ফাটল বড়ো বড়ো মাটির পিঠে। কুমিরের চামড়ার মতো উঁচুনীচু জমির উপর দিয়ে ছুটছে। মেঘ না ডাকলে আঙুল থেকে কাঁকড়া খুলে পড়বে না। মরে গেলে কাঁকড়ার ঠ্যাং এর সাঁড়াশি-দাঁত হাড় ফুটো করে বসে যাবে। সেই ত্রাসে মাধা ছুটছে।
