বড়ো দুঃসময়। না আছে পূজা, না আছে পার্বণ। দেশের লোক আকালে আকালে গেল। কী করবে, কাকে দোষ দেবে, সে ভেবে পেল না। তা ছাড়া মনে হল, রেগে গিয়ে লাভ নেই। বরং ঠান্ডা মাথায় পেটে হাত রেখে বসা যাক। উঠনের ওপর চুপচাপ বসে থাকলে সোনামণির দয়া হতে পারে। সে সোনামণিকে সেজন্য আর বিরক্ত করল না। উঠনের উপর সে হাঁটু গেড়ে বসে থাকল। মনে হল শশীর কথা। শশীর জমির কথা। সরকারি খামারে বীজের জন্য ধান ছড়িয়ে রেখেছে শশী। ধানের কথা মনে পড়তেই নিশির সবটুকু জ্বালা মুহূর্তে উবে গেল। সে এবার গিয়ে হাত পেতে দাঁড়াল সোনামণির কাছে। দে, একটু দে। পেটের জ্বালা নিবারণ করি। দে, দোহাই তুর বাপের সোনামণি, দে একটু দে, পেটের জ্বালা নিবারণ করি। দিলে তুর আয়ু বাড়বে সোনামণি। পুণ্য হবে তুর। সতীলক্ষ্মী হয়ে মরবি। তারপর খুব কাছে গিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, যাবি তু, যদি যাস তবে সোনার ধান্য তুলে লিব। শশী কাদামাটিতে বীজের ধান্য ছড়িয়েছে। যাবি তু! তু আর আমি দু-পাখিতে সারা রাত ঠুকরে ঠুকরে ধান্য তুলে লেব। সোনামণিকে বড় তাজা মনে হচ্ছে এখন। স্বপ্নে দেখছে যেন। নিশি এবার সুযোগ বুঝে বলে ফেলল, দে সোনামণি, দে একটু খাই। খেয়ে পেটের জ্বালা নিবারণ করি। সঙ্গে সঙ্গে সোনামণি কেমন রেগে গেল। শক্ত হয়ে বসে থাকল। সারা দিনমানে এই কচু সেদ্ধ সম্বল। সে নিশিকে আড়াল দেবার জন্য হাঁড়িটা পেছনের দিকে টেনে নিল।
বড়ো দুঃসময়। বড়ো বেহায়া নিশি। সে ঘুরে গিয়ে সামনে বসল। তারপর সেই আগের মতো হাত বিছিয়ে বলল, আমি ঢুলি মানুষ সোনামণি, আমারে তু ছোটো করে লিচ্ছিস। তু আর আমাতে এত ভালোবাসা, তু আমারে ছোটো করলে ধম্মে সইবে না।
তখন অঙ্গি ডাকল, বাপ। বঙ্গি ডাকল, বাপ।
তখন সোনামণি টিনের ভাঙা থালায় অবশিষ্ট কচু সেদ্ধ দু-ভাগ করে নিশির পাশে খেতে বসে গলে। ‘লে খা। ইবারে কী বুলবি বুল।
সোনার ধান্য আছে গ মাঠে। নিশি কচু সেদ্ধ মুখে আলগা করে দেবার সময় কথাটা বলল। এমন করে বলল, যেন স্বপ্নে দেখা গুপ্তধনের খবর দিচ্ছে।
কোথায়?
‘শশীর খামারে। নিশি দুলে দুলে এত বড়ো খবরটা ভালো করে এবার শোনাল সোনামণিকে।
অঙ্গি বলল, আমি যাব বাপ!
বঙ্গি বলল, আমি যাব বাপ।
দেখলি ত!
সোনামণি ঢকঢক করে জল খেল। তারপর এনামেলের তোবড়ানো ঘটিটা পাশে রেখে বলল, গেলে কী অধম্মটা হবে শুনি।
ধরা পড়ে যাব।
চুপি চুপি যাব। কেউ টেরটি পাবে না। ওরা খুঁটে খুঁটে ধান তুলে লিবে।
অঙ্গি বঙ্গি দুই মেয়ে। সুদিনে দুর্দিনে এই দুই মেয়ে। সুদিনে ফসল কাটা হলে মেয়ে দুটো মাঠময় ঘুরে বেড়ায়। কোন মাঠের কোন সামুতে ইঁদুরে গর্ত করে ধান চুরি করে নিয়েছে তার খবর বয়ে আনে ঘরে। তখন নিশি আর ঢোল কাঁধে লয় না। মাথায় ফেটি কাঁধে কোদাল। নিশুতি রাতে দুই মেয়ে সঙ্গ দেয়। সরু হাতে অঙ্গি বঙ্গি দুই মেয়ে গর্তের ভেতর থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ ধান তুলে আনে অথবা ওরা পাহারা দেয়। মাঠময় চোখ সজাগ করে রাখে-বাপ কে যেন আসে! সাপ, ওটা কী? বাপ কোদালে যেন কী লেগে আছে—অক্ত লেগে আছে। অক্ত বাপ, কীসের অক্ত হঁদুরের! তখন হেই হেই করে নিশির চিৎকার, না রে না, ইঁদুর-বাদুড় কিছু নয়, মা বসুন্ধরার কন্যা মামনসার বাহন ভুজঙ্গ। কালো রঙের ভূজঙ্গ চিকচিক করছে, আর মাথাটা দোলাচ্ছে। কিন্তু সেবারে কী হল বাপ। কোদাল মেরে মেরে হয়রান নিশি, মাটির তলায় কোন সুদূরে ইঁদুরে ধান টেনে নামিয়েছে টেরটি পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও ধানের গুচ্ছ নেই একটা। হায় হায়, পরিশ্রম বৃথাই গেল। রাগে দুঃখে গান ভেসে এল নিশির গলায়, সময়ে ওটা সুখের গান ছিল—হায় মা, কে কার তবে চুরি করে হে মা ঈশ্বরী। কিন্তু নেই, ধান গর্তের ভিতর কোথাও নেই—প্রায় মাঠ চষে ফেলেছে নিশি, নিশুতি রাতে অঙ্গি বঙ্গির ভয় ধরে গিয়েছিল, তখন নিশির নজর হক করে থেমে গেল। গর্তের মুখে আলিসান ভুজঙ্গ। কালো রঙের ভুজঙ্গ। কোদাল মারলে সামান্য লেজটুকু কাটা যাবে। গোটা শরীর গর্তের ভিতরে। হায় তবে সব যাবে। ভিতরে সোনার ধান্য আছে গ মা জননী। তবে ইবারে কী করি। বলে এক হ্যাঁচকা টান লেজ ধরে। হাত বিশেক দূরে আলিসান ভুজঙ্গটা উঁইয়ে পড়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর যায় কোথায়। নিশি দেখল, ভুজঙ্গটা ওকে তেড়ে আসছে। ঠিক মনে হল সোনামণির মতো তেড়ে আসছে। নাকে নথ ছিল সোনামণির, বালির চরে সোনামণি হক করে কাকে কামড়ে দিয়েছিল—বুঝি শশীকে, বুঝি নিশিকে এখন কামড়ায়, নিশি ছুটতে থাকল, ঘুরতে থাকল। নিশি এঁকেবেঁকে চলতে থাকল। আর হাঁকতে থাকল—অঙ্গি বঙ্গি ধান তুলে লে। আমি ভুজঙ্গরে ডাঙায় তুলে আড়াল করে লিচ্ছি। নিশি আলের ওপর দিয়ে ঘুরে ঘুরে ছুটতে থাকল।
অঙ্গি বঙ্গি নাছোড়বান্দা। ওরা যাবেই। মৃগয়াতে বাপ বাবে, সঙ্গে মা সোনামণি যাবে—ওরা যাবে না কেমন করে হয়।
সুতরাং অঙ্গি গেলে, বঙ্গি গেল। সঙ্গে মা সোনামণি এক কাপড়ে মাঠে নেমে গেল। কিছু আর সম্বল নেই সোনামণির। এক কাপড়ে, এক আঁচলে ওকে সব সংগ্রহ করে আনতে হয়। নিশি কাঁধে গামছা ফেলে, কোমরে নেংটি এঁটে সকলের আগে আগে চলল। আর গান ধরল, সুখের গান। কে কার তরে চুরি করে হে মা ঈশ্বরী।
