দিদি, দিদি। মনতোষ জানে দিদি ঘরের ভিতরেই আছে।
ভিতরে ঝুমির বড়পিসি মুখ গোমড়া করে বসে আছে। আজই ভেবেছে, দাদাকে সব জানিয়ে চিঠি লিখবে! কী আরম্ভ করেছে মনা। তুই কিছু বলবি না দাদা! এভাবে ঝুমিকে নিয়ে কেলেঙ্কারি করলি। টাকা নিলি! মেয়েটার মুখের দিকে তাকানো যায় না!
দিদি হঠাৎ বের হয়ে চিৎকার করে বলল, তোর মুখ দেখলেও পাপ। তারপর হন হন করে হেঁটে গেল। বড়ো রাস্তায় রিকশা ধরে শহরে চলে যাবে, না হয় বাসে।
মনা বলল, যা বাব্বা। যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর। এত অধর্ম সইবে! কলিকাল।
আর তখনই দুজন পুলিশ আমগাছ তলায় দাঁড়িয়ে কাকে খুঁজছে। পুলিশের সঙ্গে পঞ্চায়েত মেম্বার প্রবোধ দাস। প্রবোধ দাসই ডাকল, মনা ঠাকুর আছ!
পুলিশ দেখলে মনতোষের আজকাল বুক গলা শুকিয়ে যায়। উঠে চম্পট দেবে ভাবল,
কিন্তু সঙ্গে প্রবোধ দাস–নিশ্চয়ই অন্য কোনও কার্যকারণ আছে। সে এগিয়ে গিয়ে বলল, দাদা আপনি!
থানা থেকে এসেছেন। তোমার কলকাতার দাদা দু-দিন হল নিখোঁজ। কাগজে দ্যাখনি!
না তো!
আর কাগজ! মনে হল চড়াৎ করে মাথায় কাগে হেগে দিল—দাদা নিখোঁজ! তার মানে দাদা কোথায়! দাদার সংসারে অশান্তি চোখের উপর দেখে এসেছে। দাদা নিজেই বাড়িতে তস্করের মতো হাঁটাহাঁটি করত। সন্ত্রাস। সন্ত্রাসে পড়ে দাদা চোখে মুখে বোধহয় আর পথ দেখতে পায়নি। বৌদিও সারা জীবন ঘোড়ার মতো ছুটিয়েছে। মনে হল এক নারী অশ্বপৃষ্ঠে বসে কেবল চাবুক মারছে।
সে সহসা চিৎকার করে উঠল! আরে তোরা কে কোথায়? মা মা। ওগো শুনছ সরলা। দাদা নিখোঁজ।
আর সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে বজ্রপাত যেন। মনতোষ তন্ত্রমন্ত্র ভুলে গেল। মাসোহারা বন্ধ। কী করবে! সে দেখল, মা লাঠি ঠুকতে ঠুকতে কোপানো উঠোনের উপর দিয়ে ছুটে আসতে গিয়ে পড়ে গেল। ঝুমি কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। শিবতোষ খবর পেয়ে ছুটে এসেছে।
পুলিশ বিশেষ কিছু বলতে পারল না। যদি এখানে চলে আসে–তারবার্তায় খবর।
পুলিশ আর কী খবর নেবে বুঝল না।
তখনই ঝুমি গাছতলায় ছুটে এসে বসে পড়ল। বলল, কাল সকালে, ফর্সা হয়নি, দেখি কে আমগাছটার নীচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এত সকালে কাকা কী করে আসবে! চোখের ভুল—পরে দেখি সত্যি নেই।
মোক্ষন্দা ছুটে এসে বিলাপ শুরু করে দিল, বাবারে—কার কাছে রেখে গেলিরে! আমার কী হবে। আমাকে কে দেখবে— ঝুমির বিয়ে কে দেবেরে বাবা!
শিবতোষ বলল, কবে থেকে নিখোঁজ?
ওরা কাগজ বের করে সব দেখল। বলল, দু-দিন হল। সকালে বাড়ির কাজের মেয়ে দেখে তিনি নেই। অফিসের কোনও কাজেও বাইরে যায়নি। কেউ কিছু জানে না।
শিবতোষ মাকে এক ধমক লাগাল।
থামবে! কী আরম্ভ করলে তোমরা!
সব চুপ।
বাড়িটার চারপাশে গাছপালা জঙ্গল, বাঁশঝাড়–দাদা এলে কী আর জঙ্গলে লুকিয়ে বেড়াবে। হয় কখনও! ঝুমি দেখেছে। তবে দাদা বেঁচে নেই। শেষবারের মতো তার প্রিয় ঘরবাড়ি দেখার জন্য বিদেহী আত্মা স্বরূপ ধারণ করে দাঁড়িয়েছিল। দাদার কোনো অর্থাভাব নেই, কিন্তু অশান্তির চোটে ইদানীং খুবই কম। কথা বলতেন। বছর তিনেক হল বাড়িমুখো হয়নি। বাড়িতে মাটির ঘরে কষ্ট। মা তালপাতার পাখায় হাওয়া করলে বলত, না, না আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না। বলত, বাড়িতে এলে আমার পরমায়ু বাড়ে। সেই দাদা নিখোঁজ।
দাদাকে বৌদি কিছুতেই বাড়ি আসতে দিত না। শিবতোষের চোখ ফেটে জল বের হয়ে এল। ভাই বোন-অন্ত প্রাণ। সেই দাদা বৌদিকে বাড়ি যাবে বললেই ক্ষেপে যেত। অশান্তি করত। ওটা বাড়ি না জঙ্গল। গরমে মরে যাবে না। শীতের দিনে বলত, ঠান্ডা লাগিয়ে অসুখ বিসুখ বাধালে আমি জানি না। কে করে? আসবে কেউ-কেউ এসে সেবা করবে? টাকা ছাড়াতো তারা কিছু বোঝে না। সব ঘাড়ে চাপিয়ে মুক্ত পুরুষ। দাদা বৌদির কথায় অতিষ্ট হয়ে উঠলে বলত বুঝছ না, আমি সেখানে ভাই বোনদের সঙ্গে বড়ো হয়েছি। আমাদের কী দিন গেছে! গাছপালা মাঠ আমার কত প্রিয় বোঝ না। আমার শেকড় উপড়ে ফেলছ কেন?
তখন মহীতোষ হাঁটছে। গালে বাসি দাড়ি। পাজামা পাঞ্জাবি ময়লা। সে দু-রাত কিছু খায়নি। নিজেকে এই কষ্ট দেওয়ার মধ্যে সে যেন কোনো আনন্দ পাচ্ছে। নিজের সঙ্গে কথা বলছে— কী মহী কোথায় যাবে বলে রওনা হয়েছিলে-জঙ্গলে রাত কাটাতে মন্দ লাগে না! সাপ, খোপের আতঙ্কে তোমার বৌ তো গাঁয়ের বাড়িতে আসতেই দিত না। কবজা করে ফেলল। বাড়িতে কী দেখলে! কার জন্য দৌড় শুরু করেছিলে।
এখানটায় চুপচাপ বসা যাক কী বল!
মহীতোষ দেখল সড়ক থেকে অনেক দূরে একটা কবরখানায় সে হেঁটে যাচ্ছে। ভাঙা পাঁচিল, মিনার মসজিদ, একটা লম্বা শান কবরের উপর। আহা কী আরাম, সে নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ল। ক্ষুধা তৃষ্ণা নেই। দাহ ভিতরে ছিল— এই গভীর বনের মধ্যে ঢুকে গিয়ে তার মনে হল, ভালোই আছে। তার ঘুম পাচ্ছিল।
সে শুয়ে আছে।
অদ্ভুত সব দৃশ্য ভেসে উঠছে।
সে বড়ো হবার মুখে বড়ো অভাবের সময়। মনতোষকে কোলে নিয়ে সে ঘুরছে। মাঠে নেমে গেছে-মনে মনে পরীক্ষার পড়া ঝালিয়ে নিচ্ছে। মনতোষ তার পুত্রবৎ বয়সে। সেই মনতোষ এখন মনা ঠাকুর হয়ে গেছে। বারান্দায় খেতে বসলে মনতোষ তার পাশে বসত। সে খাইয়ে না দিলে মনতোষ খেত না। ওর দুই পুত্রের কথাও মনে হল। নাতির কথা মনে হল, সন্দেশ কলা পাউরুটি ডিমের পোচ দিয়ে শুরু আঙুর দিয়ে শেষ। খেতে চায় না। খাবার নিয়ে পুত্রবধূর অশান্তির ছবিও ভেসে উঠল। কত রকমের বাহানা।
