মনতোষ আসল রহস্য ভাঙছে না। টোকা তোলার নামে সে এক এলাহি ব্যাপার শুরু করে দিতেই ঝুমির মাথা খারাপ। তার মাথা কুটতে ইচ্ছে হচ্ছে। ছোটোকাকার বুজরুকি—এবং সত্যি যখন টোকাখানা দিনের শেষে তুলে আনল, তখন পাড়াপড়শির ছোটাছুটি—পাওয়া গেছে। ডালিম গাছের নীচে কে পুঁতে রেখেছিল। পাওয়া গেছে।
পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে, টোকা পুঁতে রেখেছিল কে? ডালিম তলায় চুপিসারে কে কাজ সেরে গেছে—কবে কখন, ওই মাল আসে—তা বলতে পারছে না। সবাই হামলে পড়ছে টোকাখান উপুড় হয়ে দেখার জন্য—মানা মানে মনতোষের এক রা না—টোকা তার মতো থাকুক—সে কলাপাতায় মুড়ে টোকাখান দিব্যি মাথায় নিয়ে নাচানাচি করছিল। ঠাকমা বারান্দার ছোটো পুত্রের নাচ দেখছে, টাকা, বাকি টাকা গস্ত করতে পারলেই সে টোকাখান গঙ্গার জলে বিসর্জন দিয়ে আসবে। বাকির কারবার সে করে না।
সবাই বলল, কী আছে।
মনা বলল, কী নেই। কী না লাগে বশীকরণ করতে যারা মন্ত্রতন্ত্রে বিশ্বাস করেন তাদের কাছে বলি, টোকার ভেতরে আছে মধু, প্যাঁচার কান, প্যাঁচার চোখ, প্যাঁচার মাংস। চটক পাখির চোখ, সাপের খোলস।
আছে কাকজংঘা।
আমার টাকা কই। লাফ মনার।
লোকের ভিড়। ঝুমি চোরের মতো ঘরের কোণায় বসে। পাত্রপক্ষ এবারেও উধাও। ঝুমির কান ঝা ঝা করছে। হঠাৎ সে বের হয়ে চিল্কার করতে থাকল, ঠাম্মা টাকা দিলে আমার মরা মুখ দেখবে। ঝুমির বিশ্বাস কাকার ছলচাতুরি সব, ঠাকুমার কাছ থেকে টাকা হাতাবার ধান্দা।
মনা বলছে, রাক্ষসী তন্ত্রের বিধান। না মানলে চোখ অন্ধকার। সে টোকা মাথায় নিয়ে নাচছে। নেচে বেড়াচ্ছে। টাকা, বাকি টাকা চাই।
মাঝে মাঝে শুধু হাঁকছে, টাকা কই।
তার লুঙ্গি খসে যাবার উপক্রম। সে কোনোরকমে এক হাতে লুঙ্গি সামলাচ্ছে আর জয় রাক্ষসীতন্ত্র। তর তন্ত্রে তরে যামু।
আসারনাম মনা ঠাকুর। নাদু ঠাকুর গুরুকাকা।
তারপরই হাঁকছে—বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে বশীভূত করার জন্য চাই কিংবা চিরদাসত্বে বন্দি করার জন্যও বিধান আছে। আমার ভাইঝিরে পছন্দ না। দ্যাখ
ব্যাটারা কী হয়!
তারপরই হাঁক, টাকা কই! বড়োপিসি আর না পেরে বলল, মা টাকা দাও শিগগির। তোমার পোলা এখন নাদু ঠাকুর।
কী বিধান ঠাকুর?
বিধান আছে, বামনহাটি, বচ, পিপুল পায়রার বিষ্ঠা সৈন্ধব লবণ, প্রিয় তণ্ডুল, খঞ্জন পাখির মাংস শোল মাছের চোখ মধুর সঙ্গে মিশিয়ে যৌনাঙ্গে লেপন। বাস। কাম ফতো! পাত্র বল, স্বামী বল পরস্ত্রী বল সব শ্রীচরণের দাস। টোকাখান এবারে কী করমু কন!
তাড়াতাড়ি ঠাকুমা অর্থাৎ মোক্ষদা বুড়ি গুনে গুনে টাকা দিয়ে বলল, তুই আমার শ্রাদ্ধের অধিকারী বাপ। পেটের বাড়িতে আর টান নাই, শুকাইয়া গ্যাছে। গঙ্গায় যা, আমার শেষ আদ্যাশ্রাদ্ধের কাম সাইরা আয়।
লাফাতে লাফাতে মনা চলে গেল। সঙ্গে এক পাল কাচ্চা বাচ্চ গঙ্গাযাত্রা শুরু। কপালে রক্ত চন্দন লেপে, মনা রওনা হয়ে গেল।
তারপর ফিরে এল মনা বড়ো সাত্ত্বিক হয়ে। এসে ঘরে কাচা ধুতি পরল। এতদিনের ক্ষোভ জ্বালা ঝুমির উপর যেন নেওয়া গেল। প্রতিশোধ যারে কয়। গাছের ফল-পাকুড় খা এবার। লাগানি ভাঙ্গানিতে কী হয় দ্যাখ! এর বিয়া হইব। দাদার টাকার দাম নাই। পুত্রগণ আমার উপবাসে থাকে, হাত ওঠে না। ঘরে ঢুকলে দূর দূর ছাই ছাই। এই ধীরু আবার এয়েছিস! আবার! ঠাকুমা খাবে না!
আর এক গরাস দিদি।
হাঁ-মুখ করে মোক্ষদা বুড়ির পাশে বসলে না দিয়ে পারা যায়! তুই ঝুমি নাতনি, পিণ্ডদানের কোনো অধিকার আছে তোর। কেবল পালন করে বুকের মধ্যে দুঃখ জমা হয়ে আছে। আমি ছোটোপুত্র—সারাদিন মায় আমারে শাপ-শাপান্ত করে—কয়, মর। নির্বংশ হয়ে যাবি। আমার কাঁঠাল কে নেয়! আমার গাছে আম থাকে না। তুই জোর করে দু-খানা গাছ বিক্রি কইরা দিলি! বাপের দোহাই মানলি না। দাদার চিঠি পড়ে উলঙ্গ হয়ে নাচলি—এই করবে। আসুক মহী না বলেছি তো আমার নামে কুত্তা পুষিস।
মনা এবার মোক্ষদা বুড়ির বারান্দায় এসে বসল। ঝুমির ইচ্ছা হচ্ছে এক কোপে গলাখান কেটে দেয়। ইতর। তার জীবন নিয়ে মজা করছে সবাই। কে বলেছে, পাত্র খুঁজে বেড়াতে। কেউ নেই। বাপ থেকেও নেই। মাও না। অপমান লজ্জায় ঘৃণায় ঝুমি কী করবে বুঝতে পারছে না। তখনই সে দেখল, ঠাকুমা দরজা ধরে বারান্দার দিকে এগোচ্ছে। চোখে কম দ্যাখে। হাতে লাঠি না থাকলে চলাফেরা করতে পারে না-কে যেন ডাকল।
আমি মা। তোমার ছোটো পুত্র। মনা। চোখে দেখতে পাওনা, তবু বাঁইচা থাকতে চাও। নাতনির ঠাই না করতে পারলে মরতে পারবা না কও। মাঝে মাঝে বাবায় রাতে আইসা শিয়রে বইসা ডাকে—তোমার এক কথা, স্বগগ সুখ! স্বগগ সুখ ভোগ কর একলা একলা, ঝুমিরে বিয়া না দিয়া যাইতে পারমু না।
তুই আমারে ডাকলি মনা।
হ মা। বস।
শোন আর একবার চেষ্টা কর। বলে মনতোষ একটা বিড়ি ধরাল।
আমি রোহিণী নক্ষত্রে বটগাছের পরগাছা নিয়ে আসব। বুঝলে। কী বললাম! সে বিড়িটা ফুক ফুক করে টানছে।
বটগাছ বললি!
বটগাছ না, বটগাছের পরগাছা।
কী হবে!
হবে। সব হবে। রোহিণী নক্ষত্রে বটগাছের পরগাছা নিয়ে হাতে রাখলে রাজা থেকে শুরু করে, দুষ্টা স্ত্রী, লম্পট স্বামী, প্রভু, পতি, পশুপাখি পর্যন্ত বশীভূত থাকে। এই একটা উপায় মাথায় খেলছে। আর ভূর্জপত্রে ষড়যন্ত্র এঁকে একটি করোটির মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে। ওটি এবার পুঁতে দেব। তুমি খোঁজ কর পাত্রের।
