কিন্তু আপদকাল বলে কথা। বড়োপিসি ঘরে বসেই ডাকল, মনা, মনারে!
উঠোনের সামনে রাস্তার ধারে মনার ঘর। মনা তো আর ঘরে নেই। সে ডালিমতলায় বসে। ঝুপড়ি আছে। শরীর আলগা করে বসেছিল। দিদির ডাকে, সে তাড়াতাড়ি নুয়ে গুড়ি মেরে নিজের ঘরে ঢুকে গেল।
আবার ডাকছে, মনা বাড়ি আছিস।
সাঁজ বেলা। ঘরে লম্প জ্বেলে দিয়েছে তারকের মা। সে দেখল, তিনটে মুখেই প্রত্যাশা-বাবা রাতে কিছু আনবে। সারাদিন এ-বাগানে সে-বাগানে ঘুরে বেড়িয়েছে। এঁচড় চুরি করেছিল—জঙ্গলে রেখে এসেছে। কাল সকালে বাজারে যাবে না শহরে যাবে ঠিক করতে পারছিল না। যদি ধরা পড়ে যায়। এসব সাত পাঁচ ভাবনা মাথায়—দিদি ডাকছে, ডাকুক। মজা। কারণ সে জানে দিদি এল বলে। উঠোনে আমার মুততেও আসবে না। বোঝো এখন।
মনা আছিস!
লুঙ্গিটা উপরে তুলে বাঁধল মনতোষ। গায়ে হাড় ছাড়া কিছু নেই। পেট তালপাতার পাখার মতো ঠান্ডা মেরে পড়ে আছে। লুঙ্গি খুলে যায় বার বার।
কী হল! ডাকছি। সাড়া দিচ্ছিস না।
সে উঠোনে বের হয়ে বলল, বল।
বাড়িতে নাকি টোকা পোঁতা আছে!
নাদুঠাকুর তো তাই বলল।
কে পুঁতেছে।
কে জানে!
শরিকি ঝগড়া যেমন হয়ে থাকে। টোকা যদি মনা নিজেই পুঁতে রাখে। অভাবে বুদ্ধিনাশ। পুঁতে রাখতেই পারে। ঝুমিরও হয়েছে, বাড়ি বাগান বাঁশঝাড়ে কেউ ঢুকলেই তাড়া। ঠাকুমার কাছে নালিশ। ঠাকুমার চোপার চোটে ভূত ভাগে। টোকা নিয়েও চেষ্টা করেছে দিনমান আমার আবাগী নাতিনের উপর তোদের কেন এত নজর রে ড্যাকরার বাচ্চা। ওলাওঠা হয়ে মরবি। কিন্তু পরে বুঝেছে বিধান মেনে না চললে ঝুমির উদ্ধার হবে না। বিকালেই খবর পাঠিয়েছে, বড়োমেয়েকে। শিবতোষ শুনে বলেছে, রাখ তোমার টোকা! টোকায় কী আছে!
মনা যে বলল, কালো ছাগলের নাদি আছে, ধনেশ পাখির পালক আছে। কুমারী মেয়ের রজস্বলার তেলকানি আছে। টোকা তুলতে না পারলে ঝুমির গতি করা যাবে না।
শিবতোষও তুকতাক বিশ্বাস করে। ওই তো গ্রীষের বৌটা জলে ভার হয়ে গেল। নাদু ঠাকুরের টোটকায় আরোগ্য লাভ করেছে। কী ভেবে বলেছিল, যা ভালো বোঝো করো।
তার নিজেরও কাচ্চাবাচ্চা আছে। কে কোথা থেকে তুক তাক করবে, গুণ করবে—যা দিনকাল, চালের কেজি পাঁচ টাকা। রেশনের চাল খাওয়া যারে না। সকালে উঠে গোরু সেবা, দুধ দোহানো—বাজারে দুধ বিক্রি, রোজের দুধ দিয়ে আসা, তারপর বগলে গামছা ফেলে ডোবার তলানি জলে ডুব—শেষে পড়িমরি করে আহার এবং সাইকেলে সরকারি অফিস। ফেরে পাঁচটায়। চারপাশে বনজঙ্গল, সাপখোপ, ইঁদুর বাদুর কত কিছুর উপদ্রব-বাড়তি উপদ্রবের ভয়েই সে বলেছিল, টোকা যখন পোঁতা আছে কিছু আর করার নেই। টোকা পুঁতে রাখলে তো সমন্দ ভেঙে যাবেই।
টোকাখান তুলতেই হয়।
তা মনা টোকা কোনখানে পোঁতা আছে জানস!
কী করে কই। বলল ত নৈঋত কোণে বড়ো চাঁপা গাছের নীচের দিক থেকে মাটি কোপাতে শুরু করতে হবে। না পেলে মরণ। কার কিছু করার নেই! পেলেও মরণ। আর একখান টোকা মন্ত্র তন্ত্র তালপত্র ভূর্জপত্র আরও কী সব মোক্ষম চালান দেবে, বাঙ্গ-বাক্স করে টোকা পোঁতা বের হয়ে যাবে। গলগল করে রক্ত ওগলাবে। তা ম্যাও লাগে। ম্যাও নিয়ে কথা।
কত ম্যাও লাগব।
মনা মাথা ঝাঁকায়। আর বলে মায়রে কও, আমার পুত্ররা গাছতলায় গেলে আগুন জ্বলে তেনার নাতিন এখন বয়স পার করে দিয়ে কুড়িতে বুড়ি। আর তুই দেড় কুড়ি বয়স-বিয়ার আর দরকারটা কী।
মনা ভালো হবে না। তুই আবার ঝুমিকে নিয়ে পড়লি। ঘর শত্রু বিভীষণ।
সবাই দিচ্ছি। তুমি নও! নাও আমি জানি না কত লাগব। নাদু ঠাকুরের কাছে যাও। তার মর্জি।
নাদু ঠাকুরের কাছে গিয়ে বড়ো পিসি শুনল, কোনো এক আমবাগানের বাবু ধরে নিয়ে গেছে। খুবই গুপ্ত কথা। বাবু নাকি কোনো পরস্ত্রীর জন্য পাগল। হিল্লে করতে গেছে। সারা সকাল এই করে গেল, নাদু ঠাকুর, ফিরল না। বড়ো পিসির মুখ ভার। এক কথা তার এই কী ফ্যাসাদে ফেলালিরে মা। তর নিজের ভাইঝি— তুই কইতে পারস না!
কইতে পারি।
তবে ক।
একশো এক টাকা টোকা তুলতে একশো এক টাকা পালটি টোকা পুঁততে। টোকা তুলে দিলেই হবেখন! পালটি মারতে হবে না। নাহলে, আবার টোকা যদি পোঁতে ফের একশো এক টাকা। পুঁতলেই একশো এক টাকা!
ঝুমি দেখল ছোটো কাকার উঠোনে পিসি কপালে হাত দিয়ে বসে পড়েছে।
টাকা দিব কে?
ক্যান দাদা। মায় লিখলেই হয়ে যাবে। টোকা পুঁততে তুলতে পুঁততে।
মনা!
মনতোষ এবার ঠাণ্ডা মাথায় বলল, দশটা টাকা দে দিদি। পুত্ররা কিছু খায় নাই। দাদা টাকা পাঠায় নাই। দে। দাদার টাকা এলে দিয়ে দেব। দে দিদি। কাল সকালে উঠে টোকা তুলে দিলে বাকি টাকা দিতে বলবি মাকে।
বড়োপিসি আর কী করে। অতিকষ্টে দশটাকার নোট বের করে বলে, টোকা খুঁজে না পেলে, ফেরত দিবি।
তা দেব না! আমি মাগনা কারো কাছে কিছু চাই না।
সেই টাকার চাল ডাল নুন— খিচুড়ি মহোৎসব। সকালে মনতোষ, একজন যোগলদার সঙ্গে নিয়ে কোপাতে থাকল। সারা উঠোন কুপিয়ে ফালা ফালা করে দিল। কোথায় টোকা পোঁতা আছে! সে গড় গড় করছিল। নাদু ঠাকুর তুমি তো জায়গাসোন দেখিয়ে গেলে পারতা। তা টৌকা-তো মেলে না। সারা উঠোনে মনা হম্বিতম্বি করে বেড়ায়। অদৃশ্য হবে। এত বড়ো বেশি ওজনদার গুণিন-পাশের বাড়ির দিকে চোখ মট মট করে তাকায়। নারানের দিদির বাড়ি ওটা। একা বিধবা মানুষ, তিন পুতের মাথা খেয়ে দিব্যি যাত্রা দেখতে যায় মিলের গেটে। তারই কাজ। অন্তত নাদু ঠাকুর এমনই বলেছে।
