সে ডালিম গাছটার কাছে নীচু হয়ে বসে কী দেখল।
আজকাল সে কিছু তুকতাক শিখেছে, তার গুরু নাদুঠাকুর। নাদুঠাকুরকে–ও মানে। এই যে এবারেও সমন্দ ভেঙে গেল, কোন গুণের প্রভাবে। কিন্তু সেটা কীভাবে চাল দেবে সারারাত ভেবেছে। জল পড়া, চাল পড়া কত রকমের তুকতাক আছে। মা-র বোকনা হাফিজ। কে নিল।
ঝুমি তখন কলকাতায় কাকার কাছে। পাশের কুমোরদের মেয়ে পাতিকে শুতে বলে গেছে রাতে। তা পাতি আরও কয়েকবার থেকেছে। ঝুমির জন্য পাত্রপক্ষের খবর এলেই দিনক্ষণ মাসখানেক বাড়িয়ে দেওয়া হয়। মাস দেড়মাস ঝুমি কাকার কলকাতার বাড়িতে থেকে এলেই শহুরে মেয়ে। লাবণ্য জমে যায় শরীরে। রং খুলে যায়। বাধা জায়গায় থাকলে যা হয়। কলকাতায় জলের গুণটা টের পেতেই মা বছরে এক দু-বার ঝুমিকে মহীতোষের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। সাওয়ারের জল, গন্ধ সাবান, স্যাম্পু কত কিছুর ব্যবস্থা স্নানের ঘরে। পাত্রপক্ষ দেখে পছন্দ করে ঠিক। তারপরই পাকা কথা দেবার সময় হলে আর কোনো খবর দেয় না। কে যে কানে তুলে দেয়, যা খোলতাই দ্যাখলেন দু-দিনের। তবে কি পাত্রপক্ষ টের পায় কলকাতার জল হজম না হলে বোঝা যাবে না। হজম হতে বেশি সময়ও বোধ হয় লাগে না। পাঁচ দশদিন যেতে না যেতেই কেমন শরীর চিমসে মেরে যায়। গাল বসে যায়। চামড়া পুড়ে যায়।—গাঁইয়া চেহারা, কে নেবে। স্কুল ফাইনালটা পাস করলেও হত। কিছুতেই মই বেয়ে উপরে উঠতে পারল না ঝুমি। বার বার হড়কে পড়ে গেল।
সেই ঝুমির বিবাহ এবারে পাকা।
বয়স নিয়ে পাত্রপক্ষের সঙ্গে মিছে কথা বলতে হয়। এবারের পাত্রটির খবর নিয়ে এসেছিল বড়োপিসি। বড়োপিসি ভাইঝিকে ছোটোবেলা মানুষ করেছে। পায়ে পায়ে ঘুরেছে। এখন পিসিরও সংসার হয়েছে। ছেলেরা বড়ো হয়ে গেছে। বড়োটা এবার ইস্কুল ফাইনাল দেবে।
আসলে ঝুমি বোঝে সে এখন তিনজনের গলায় কাঁটা হয়ে ফুটে আছে। একনম্বর ঠাকুমা, দু-নম্বর বড়োপিসি, তিন কলকাতার কাকা। লোকজন বাড়ি এলে মহীতোষের নাম আর করে না। বলে কলকাতার ছেলে চিঠিপত্র দেয় তো! ঝুমিকে বলে তোর কলকাতার কাকা পূজায় কী দিল!
সবই গোপনে করতে হয়। লাগানি-ভাঙানি হচ্ছে দেখে ঝুমিকে এবার পিসির শহরের বাড়িতে দেখানো হয়েছে। সবে দু-দিন হল কলকাতা থেকে এসে ঝুমি শুধু পড়ে পড়ে ঘুমিয়েছে। পিসির এক কথা, তোকে কে বলেছে, কলকাতায় যেতে। ঝুমি কাজ ছাড়া থাকতে পারেনা। আর স্বভাব টিভি দেখা। পিসির বাড়িতে আছে, কলকাতার কাকার বাড়িতেও আছে। টিভির বিজ্ঞাপনের মতো জীবন যে নয়, সে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে।
ঠাকুমার এক কথা, কম সমন্দ এল! ঝুমির বয়সি পাড়ার সব মেয়ে কবেই সাফ হয়ে গেছে। কপাল মন্দ না হলে হয়!
এত গোপন, এবং পাত্রপক্ষের সব দাবি মেনে নিয়েছে কলকাতার পুত্র তাঁকে ঠিক আপৎকালে রক্ষা করবে।
কলকাতায় এই বুড়ো বয়সে ছোটাছুটি।
মহীতোষও ভেবেছিল, এবারে তবে হয়ে গেল। বলেছে—যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। তারপর কী না চিঠি না পাত্রপক্ষ পাকা কথা দিতে আসেনি। হাত থেকে এবারেও ডিম ফসকে চড়াৎ করে ভেঙে গেল।
মনতোষ মনে মনে খুশিখুশির কারণ এই বাড়ি, বাগান, গাছপালা সব সাফ করে দিচ্ছে মা। দাদাকে ইনিয়ে বিনিয়ে লিখছে—আর দাদাটিও মাতৃআজ্ঞা শিরোধার্য—বোঝে না, ঝুমি ছাড়া তার আর কারও প্রতি কোনো টান নেই। অন্য নাতি নাতিনরা কী সব জলে ভেসে এসেছে! একটা ফল পাকুড় পর্যন্ত ধরতে দেয় না। বলে কি না, ঠাকুমা দেখ ধীরু আবার গাছতলায় ঘুর ঘুর করছে। ঠাকুমা দেখ ছোটোকাকা আম পাড়ছে। আর তখন চোপা ঠাকুমার—নির্বংশ হবি, ধনেজনে যাবি। মরবি। গোলাম তুই আমার গাছে না বলে কয়ে উঠলি, ডাক শিবতোষকে। শিবতোষ, আলাদা বাড়ি করেছে—তার অভিযোগ, মনতোষ মানুষ নেই। অমানুষ হয়ে গেছে। বৌটা দজ্জাল। সে মাকে এক ধমকে তাড়িয়ে দেবে। বলবে, আমি কিছু জানি না, যাও।
শিবতোষ তেড়ে যাবে!
কেন, এখন কেন! কার জন্য বাড়ি ছাড়লাম। তোমার ছোটোপুত্র—আহা বোঝো ছোটোপুত্র, সে তেড়ে এসেছিল কেন। গলা টিপে ধরেছিল কেন—বল! আমাকে উৎখাত করে ছাড়লে। তোমরা সবাই। মেজদার মুখের দিকে তাকিয়ে মেনে নিয়েছি। আমাকে এখন লাগে কেন। ছেলেদের বলে দিয়েছি, আম খেতে হয় সাবর্ণদের বাগানে ঘুরবি-মরতেও বাড়ির আমবাগানে ঢুকবি না।
সুতরাং বুড়ো বয়সে মরণ!
মনতোষ জানে, এবারে একটা মোক্ষম সুযোগ এসে গেল তবে। সে ডালিম তলায় বসে ঘরে কী কথা হয় শুনছিল।
কী বলে!
ঝুমির গলা।
–ঠাকমা টোকা তুলতে গেছ তো আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে যাব। ঠাকমার কেমন চোখ বিবর্ণ হয়ে যায়। দুটো কচুর লতি তুলে এনেছিল সকালে। মেজাজ খারাপ বলে দুপুরে সেদ্ধভাত খেয়েছে। কচুর লতির উপর জল ছিটিয়ে চালে রেখে দেবে। ঘরবাড়ি গরমে জতুগৃহ–ঘরে টেকাই যায় না। মনে হয় আগুন, হলকা বইছে। আর তখনই কিনা বড়ো পিসি বলল, টোকা পোতা আছে কে বলল।
–ঝুমি ঠোঁট উলটে চোখ ট্যারচা করে দিল।
বড়োপিসি বুঝল মনা মানে মনতোষের পরামর্শ। কিন্তু নাদুঠাকুরের তুকতাকে তারও বিশ্বাস আছে। মনার সঙ্গে কথা বলতেও ঘৃণা হয় তার। তবে আপদকাল বলে কথা। মনা বাড়ির সবটা গ্রাস করবার তালে আছে। মাঝে মাঝে সে বলতেও ছাড়ে না, বাড়িতে কি আর লক্ষ্মী আছে। গাছের ডালে সব শকুন বসে আছে—বুড়ি মরলে উড়ে এসে জুড়ে বসবে। দাদাকে সব না লিখে জানাচ্ছি তো, মুনিষ খাটছিস, দ্যাখ তোর আরও কত অধঃপতন হয়। ঠাকুর বাড়ির নাম ডোবালি। চুরি চামারি পর্যন্ত করতে শুরু করেছিস। মা-র নালিশ থেকেই দু-তিন সাল হল বুঝেছে কে নেবে—নেয় তোমার গুণধর ছোটোপুত্র। আচার্য বলেছিল না, ঠাউরকর্তা আপনেরে ছোটো পোলায় খাওয়াইব। খাওয়াচ্ছে না! গাছে নারকেল থাকে না— লিচু সাফ, আম, কাঁঠাল কিছু রাখতে পারছ!
