এক দুপুরে সে স্ত্রীর কাছেও ধরা পড়ে গেল!
ওমা কী সর্বনাশ! তুমি রোদে দাঁড়িয়ে আছ! কী হয়েছে! কেন দাঁড়িয়ে আছ! তোমার মাথা ঠিক নেই। আমাকে আর কত জ্বালাবে। নামো বলছি।
মহীতোষ নেমে এসে বলল, আমি বাড়ি যায়।
যাও যেখানে খুশি যাও। এই গরমে তুমি বাড়ি যাবে! আলো নেই, পাখা নেই। মাটির ঘর, জানালা নেই। অসুখ বিসুখ হলে কে দেখবে?
কাউকে দেখতে হবে না। এবং পরদিন সকালে সে সত্যি এক জামা কাপড়ে বের হয়ে গেল–কাউকে কিছু না বলে!
সুর দেখল, ঘরে তিনি নেই। তবে ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। রোদে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে কী যে মজা পান—না মাথায় গোলমাল, কে জানে—সে ছাদে গিয়ে দেখল, নেই।
নেই। নেই।
ঝুমি সকালে উঠে দেখল গাছতলায় কে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এত সকালে ঝুমি ঘুম থেকে ওঠে না। এবারের সমন্দ ভেঙে যাওয়ায় ঠাকুমা খুবই ভেঙে পড়েছে। চোপা করেছে, শাপ-শাপান্ত করেছে বৌদের। ঝুমি বিরক্ত হয়ে বলেছে, ঠাম্মা চুপ করবে কি না বল!
কাকাকে চিঠি লিখতে বলেছিল, মহীতোষকে বাড়ি আসতে বল। সে নিজে গিয়ে যদি একবার চেষ্টা করে।
ঝুমির এক কথা, আমি পারব না। কাকাকে দেখছি তোমরা সবাই মিলে মেরে ফেলবে। কাকা এসে কী করবে! আমি তোমার গলার কাঁটা। যাব যেদিকে চোখ যায় বের হয়ে।
ঝুমির বয়েস হয়ে গেছে। দেখতে খারাপ না। কাকা তো বলবেন ঝুমি আমাদের প্রতিমার মতো দেখতে। রংটা শুধু চাপা। কাকা নিজে চেষ্টা করতে পারতেন, কাকিমার ভয়ে চুপ। কী নিয়ে অশান্তি শুরু হবে সে জানে। কাকিমার এক কথা, মানুষটাকে সবাই মিলে মেরে ফেলবে। ঝুমি বোঝে কাকিমার অভিযোগ খুব মিছে নয়। বাড়ির আর সবাই বাবা এবং অন্য কাকারা তার কথা খুব ভাবে বলে মনে হয় না। বাবা তো বলেই দিয়েছে, আমি রিটায়ার করেছি। পেনশনের টাকায় চলে না। ঝুমির নীচে আরও পাঁচ বোন। তারা সবাই বাবার কাছেই থাকে। কেবল সে থাকে ঠাকুমার কাছে।
আগে সংসারটা এমন ছিল না। দাদু বেঁচে থাকতে বাড়ির চারপাশে যেন আশ্চর্য সমারোহ ছিল। কাকা টাকা পাঠাতেন, দাদু আড়তে কাজ করতেন জমিজমা চাষ-আবাদ মিলে বারো মাসে তেরো পার্বণ। গৃহ-দেবতার পূজার আয়োজন তাকেই করতে হত। ফুল তোলা থেকে, ঠাকুরের বাসন-কোসন মাজা সব। বড়ো পিসির টিউসিনি করে টাকা উপার্জন। ছোটো কাকার পাটের দালালি, তাতেও দু-পয়সা-এই করে সংসারে কোনো টান ছিল না। দাদু মরে যেতেই সংসারটা কেমন আলগা হয়ে গেল। সেজ কাকা, ছোটো কাকা ভিন্ন হয়ে গেল। ঠাকুমার খবর নেয়, তবে টাকাপয়সা দিয়ে কেউ সাহায্য করে না। কাকা দাদুর কাজ হয়ে যাবার পর ভাইদের ডেকে বলেছিলেন, মার জীবিতাবস্থায় বাবার সামান্য জমি-জমা, গাছপালা বাগান যা আছে তিনিই ভোগ করবেন। তোমরা হাত দেবে না।
ছোটো কাকাকে দু-দুবার দোকান করে দিল—ফেল। এখন তো দোকান বন্ধ। ছোটো কাকার জন্যও তার কষ্ট হয়। তবে কাকিমাটি যা একখানা, এত মুখ করে আর এমন সব লাগানি ভাঙ্গানি চলে যে কষ্টটা কেন যেন মাঝে মাঝে বুক খালি করে উবে যায়। তখন তারও রাগ, বোঝে এবার ঠাকুমাকে তড়পে এসেছিলে, গাছ বিক্রি করতে দেবে না বলেছিলে, বোঝো এবার।
গাছ বিক্রি করলেই মনতোষ মা-র উপর ক্ষেপে যেত। তার এক অভিযোগ, দাদা ফল খেতে বলেছে, গাছ বিক্রি করতে বলেনি। তুমি গাছ বিক্রি করে কী কর বুঝি না। ঝুমির নামে ব্যাঙ্কে টাকা রাখছ। দাদাকে মিছে কথা বলে বেশি টাকা আনাচ্ছ। দাদাকে দাঁড়াও সব লিখব।
ঝুমি তখন আর সহ্য করতে পারে না। মাটির ঘর। টিনের চাল। চারপাশে টালির বারান্দা। বাঁশের খুঁটি। নড়বড়ে হয়ে যায়! কী দিনকাল! কাকা দুজনের ভরণপোষণের বাবদ যা দেয় তাতে চলে না। ঠাকুমা গাছ বিক্রি করে, বাঁশ বিক্রি করে বাড়তি কাজগুলি সেরে নেয়। তুই পেটের ছেলে! সহ্য হয় না!
সামনের দিকে মনতোষ তার ঘর তুলে আছে। একখানাই মাটির ঘর। সামনে সঙ্গের বারান্দা, পেছনে বাঁশের খুঁটি দিয়ে গোয়াল। গোরুটা অভাবে পড়ে বিক্রি করে দিয়েছে। মনি অর্ডার এলে মনতোষের দৌড়ে যাওয়ার স্বভাব। দাদা তার নামে যদি মাসোহারা পাঠায়।
এই একটা আশায় সে বসে থাকে। মাঝে মাঝে আসে। আবার কোনো মাসে আসে না। চিঠি আসে। আগামী মাসে পাঠাবার প্রতিশ্রুতি থাকে। মনতোষ বোঝে, দাদার কাছে আবার না গেলে চলবে না। পাঁচ-পাঁচটা মুখ। পুত্র সন্তান দুটি তার স্কুলে পড়ে। ঠিক পড়ে না, বলতে গেলে টিফিনে পাউরুটি পাওয়া যায়। দু-ভাই মিলে পাউরুটি নিয়ে এলেও কিছুটা যেন পেটের দায় মেটে।
তার এক কথা, ও নলিনী, দাদা মাকে কত পাঠাল?
যা পাঠায়।
তুমি মনে রাখতে পার।
তা পারব না। এ-মাসে বেশি দেয়নি।
বেশি দিলেই মনতোষ গড় গড় করবে।–মা নাতিনকে আর দুটো হিন্দি সিনেমা বেশি দেখাতে পারবে। নিজের থান না কিনে ঠিক নাতনিকে শাড়ি কিনে দেবে। আমরা তো সব কলাগাছ ফুড়ে হয়েছি। একবার দ্যাখে, তারপরই লাঠি নিয়ে তাড়া, এই তারক আবার যদি ওদিকে যাস ঠ্যাং ভেঙে দেব। ধীরু তোর ছাল চামড়া তুলে নেব। বুড়ি তোদের কেউ হয় না। আমার কেউ হয় না। তারপরই লাফিয়ে গাছে উঠে যায়। ডাল কাটতে থাকে।
মনতোষের কেমন মাথা ঠিক থাকে না। অভাব অনটনে মনতোষ মাঝে মাঝে আগুন জ্বালিয়ে দিতে চায়।
সেই মনতোষ মাকে বলে গতকাল সারা উঠোন কুপিয়েছে। হাতে কাজ নেই। ইটের ভাটায় কাজ নেই। আর সে পারবে কেন! কোমরে ব্যথা। এদিকে ঘরে এক মুষ্টি আটা পর্যন্ত নেই। সে যে কী করে! তখনই বুঝি ফন্দিটা কাজ করেছিল মাথায়।
