যেন তিনি ভিতরে ভিতরে খুবই ভেঙে পড়ছেন। বৌমা পাশের ডাইনিং স্পেসে মোটামুটি যুদ্ধ করছে পুত্রটিকে নিয়ে। কিছুই খাবে না। বৌমাও না খাইয়ে ছাড়বে না।
পাঁচ বছরের শিশু পুত্রের জেদ দেখে সুর মাঝে মাঝে ভাবে—গোল্লায় কেন যায় এই শিশুর জীবন প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বুঝতে শিখে গেছে তার জেদের কাছে সবাই কাৎ। সকাল থেকেই একচোট শুরু হয় খাওয়া নিয়ে। স্কুলের বাস না আসা পর্যন্ত তা চলে।
খাও বলছি। খাচ্ছ না কেন! না খেলে বাঁচবে কী করে? দু-পিস পাউরুটি, ডিমের পোঁচ, সন্দেশ। খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে।
মহীতোষ রোজই দৃশ্যটা দেখেন। কিছু বলেন না। মুখ তাঁর গম্ভীর। তিনি বেসিনে মুখ ধোয়ার সময় চোখে জলের ঝাপটা দেন কেন এত সুর বোঝে না।
কাল সকালে চিঠিটা পড়ার সময় কেমন থমথম করছিল মুখ।
শিশুটির মা, পেট ভরবে কী করে, বাঁচবে কী করে বলে উঠে যান। ফ্রিজ থেকে কলা, আম, লিচু, আঙুর সাজিয়ে দেন শিশুটিকে। তাও কেমন আধখ্যাঁচড়া করে খায়। ভাত, মাছ ভাজা, মাখন দিয়ে আর এক প্রস্থ চেষ্টা। কিছু খায় কিছু ফেলে।
মহীতোষ একদিন ক্ষোভে দুঃখে বলেছিলেন, বৌমা খিদে পেলে ঠিকই খাবে। জোর করতে যেও না।
খিদে পেলে ঠিকই খাবে কেন বলছেন মহীতোষ— বৌমাই বোঝে। অর্থাৎ এটা বাড়াবাড়ি। মহীতোষ যেন আভাসে তা জানিয়ে দেন।
সুর চিঠিটা খুঁজল। বৌদি ছেলেকে বাসে তুলে দিতে গেছে। বড়ো দাদাবাবু অফিসে বের হয়ে গেছেন। মহীতোষ কোথায় কেউ জানে না। কারও দায় নেই জানার। লোকটা মরল কী বাঁচল—এক মাসিমা ফিরে এলে ত্রাসের মধ্যে পড়ে যাবে। যদি তিনি সত্যি নিখোঁজ হয়ে যান!
সুর দেখল, চিঠিটা দেরাজের মধ্যেই আছে। বাবুর ছোটো ভাইয়ের চিঠি। সে চেনে মনতোষদা লিখেছে, দাদা আগুনের হলকা বইছে। সব জতুগৃহ। কাজ কৰ্ম্ম নাই। তুমি যে টাকা পাঠাও ওতে চালের দাম হয় না। পাঁচটি মুখ, আগুনে পুড়ে মরছি। সারাদিন খাটলে বারোটা টাকা। যদি এ-মাসে কিছু বেশি টাকা দাও ভালো মাঠঘাট আংড়া, কাজ নাই। কোনোদিন হয়, কোনদিন হয় না।
হঠাৎ মনে হল সিঁড়িতে পায়ের শব্দ।
তাড়াতাড়ি চিঠিটা রেখে দিয়ে দরজায় উঁকি দিতেই দেখল মহীতোষ নেমে আসছেন। সারা শরীরে ঘাম। মুখ পুড়ে গেছে। ছাই রঙের হয়ে গেছে।
আপনার চা, ঠান্ডা হয়ে গেছে। খোঁজলাম। কোথায় ছিলেন।
ছাদে।
ছাদে। সুর অবাক হয়ে গেল। বৈশাখের দাবদাহে সব পুড়ছে। বৃষ্টি নেই। গাঁয়েগঞ্জে আকাল। তেষ্টার জল নেই-নদী খুঁড়ে বালি তুলে দুক্রোশ দূর থেকে জল নিয়ে যাচ্ছে মাটির ঘড়ায়—সে কাগজে এমন ছবি দেখেছে। খাওয়া দাওয়ার পাট চুকলে সুর টানা দু-তিন ঘণ্টা হাতে সময় পায়। তার আলাদা ঘর আছে সেখানে সে তখন কাগজ পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ে। তার কোনও অসুবিধা না হয়, সবার এটা যেন দায়িত্ব। সে জানে বাড়ির চাকাটা সচল রাখার দায় তার। সে বেগড়বাই করলেই সব যাবে। তাকে তুষ্ট করার চেষ্টা সবার।
যেন সুখের মধ্যে ফেলে দিয়ে আটকে রাখা। তার দেশে ঝুপড়ি মতো ঘরে মা আছেন। দুই লায়েক ব্যাটা আছে। সেখানেও জলের আকাল, ভাতের আকাল-চাষ আবাদ না থাকলে গাছের মরা ডাল। মট করে যে কোনও সময় ভেঙে পড়তে পারে।
এই রোদে ছাদে! অসুখে পড়ে যাবেন।
মহীতোষ জানে, কাজের মেয়েটি একটু বেশি বাচাল। সে নিজেকে বাড়ির একজন ভাবে। তার দাপট আছে। যে গোরু দুধ দেয় তার লাথি খেতে কষ্ট হয় না। মহীতোষকে এত প্রশ্ন করার স্বভাব সেই সাহসেই।
ছাদে কী করছিলেন?
দাঁড়িয়েছিলাম।
দাঁড়িয়ে থাকলেন! রোদে কেউ এমনি এমনি দাঁড়িয়ে থাকে? তাও খালি পায়ে। ছাদে কী তাপ। পা রাখা যায় না।
মহীতোষ কোনও কথারই জবাব দিচ্ছে না। চুপচাপ নিজের ঘরে ঢুকে একটা চিঠি লিখল মনতোষকে। মনি অর্ডার ফর্ম তার দেরাজে থাকে— সে এ-মাসে টাকা বেশি করে পাঠাল। মাকেও টাকা পাঠায়—এই দায় তার এখনও আছে। ঝুমির বিয়ে পাকা, শুধু সে ঘাড় পাতলেই হয়ে যায়। পাত্রপক্ষ পনেরো হাজার টাকা নগদ চেয়েছে। মুদি দোকান আছে। চায় ভাই। বিধবা মা, শহরের কাছে টালির বাড়ি।
মহীতোষ ইদানীং কিছু কিছু ব্যাপারে ফেঁসে গেছে। তার আয়কর বাবদ বড়ো অঙ্কের টাকা সরকারের ঘরে জমা দিতে হযে। পাঁচ সাত বছর তার চাকরি আছে। কোম্পানির অবস্থা খারাপ—গো স্লো, ইউনিয়নের হুমকি ধর্মঘটের। কোটি টাকার উপর বাকি প্রভিডেন্ট ফান্ড-এল আই সি, ই এস আই বাবদ। ধারদেনা, কোম্পানির লোন ব্যাঙ্কের কাছে তার ঋণ শোধ দিতে মালিক পক্ষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। তার বাইরে সে কিছু টাকা আয় করে থাকে—বই বিক্রি হয় তার বেশ ভালো। স্কুলের বই। এখন বাজারে টেক্কা দেবার মতো তার বই-এর সমকক্ষ আরও বই বের হয়ে গেছে। স্কুলগুলি নানাভাবে উৎকোচপ্রিয় হয়ে গেছে। বই ধরাবার জন্য সবাই হন্যে হয়ে ঘুরছে। সঙ্গে টাকার থলে, হয় টিভি নয় গোদরেজের লকার—কিছু একটা উপহার হিসাবে দিলে, দু-পাঁচটা বই প্রকাশকের লেগে যায়। মহীতোষ আর আগের মতো টাকা উপার্জন করতে পারে না। সে এইসব নানা ঝামেলায় ত্রস্ত হয়ে পড়ছে।
মহীতোষ আজ সকালে ছাদে দাঁড়িয়ে দেখেছিল, রোদের তাপ কত প্রখর হতে পারে। একজন মানুষ এই কড়া রোদে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
এটা তার এখন এক ধরনের মজা।
যেমন একদিন সবাই দুপুরে ঘুমিয়ে আছে। সে ছাদে খালি পায়ে দাঁড়িয়েছিল। সে ফ্রিজের ঠান্ডা জল খায় না। সে শুধু ডাল দিয়ে ভাত মেখে খায়। সকালে মুড়ি চিবোয়। আগে তার সকালের খাবার ছিল চার পিস টোস্ট, ডিমের পোচ, দুটো মিষ্টি এবং একটি মর্তমান কলা।
