ছোটোবাবু কালই গেছে। যাবার সময় বাবাকে বার বার বলে গেছে, তুমি আর এসব নিয়ে ভেব না। ওদের ভালোমন্দ ওরা বুঝবে। নির্বিকার থাক। তোমার তো অনেক কাজ। নিজের কাজে ডুবে যাও।
সিঁড়ি ধরে নামছেন। সুর জানে কে নামছেন। বছর খানেক হয়ে গেল, সে এ বাড়িতে আছে। কার পায়ের শব্দ কী রকম সে জানে। বৌমা নামছেন—তার নামার শব্দ একরকমের, বড়ো দাদাবাবুর পায়ের শব্দ একরকমের। ওপরে মাসিমা থাকেন। সকালে স্কুল, পাঁচটায় বের হয়ে যান।
এখন এবাড়িতে বৌমা সিঁড়ি ধরে নামছেন। বাসি সায়া-শাড়ি-চাদর, ভিজালে এক বালতি। ঠিকা কাজের মেয়েটা চুপি চুপি বাবুর কাজ থেকে মাইনে গোপনে দ্বিগুণ করে নিয়েছে। মাসিমা জানলে অশান্তি করবে ভেবেই চুপি চুপি তাঁকে গোপন অনেক কাজ করতে হয়—যেন যুদ্ধক্ষেত্র। অথচ সুর ভেবে পায় না, এত বেলা করে কেউ ঘুম থেকে উঠতে পারে! তার খারাপ লাগে। শত হলেও বাড়ির বউ!
বৌমা বাবু নেই!
নেই তো আমি কী করব?
না, কোথায় গেল! তিনি সকালে চায়ের জন্য নিজের ঘরে বসে থাকেন।
দেখ ওপরে আছে কী না?
না ওপরে নেই।
সুর কিছুটা ফাঁপরে পড়ে গেল। মানুষটা কোথায় গেল? সে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে গেল। তিনি তো সকালের চা না খেয়ে ঘর থেকে কোথাও যান না। ছোটোবাবুর ঘর দেখল, ফাঁকা। বারান্দার ইজিচেয়ারে যদি বসে থাকেন না নেই। মাসিমা স্কুলে, কোথাও যাবার কথা থাকলে রাতেই সুরকে বলে দেন, উনি সকাল সকাল বের হবেন। তাও বলে যাননি। এত সকালে তো কোথাও যাবার কথা না। বুধ-শনি বাজারে যান। আজ তো বুধও নয় শনিও নয়।
সুর একতলা-দোতলা সব জায়গায় খুঁজল। চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। নীচে নেমে চায়ের কাপ, প্লেট দিয়ে ঢেকে দিল। বছর খানেক থেকেই বুঝেছে, এ বাড়িতে একটা চাপা অশান্তি আছে। মহীতোষ যেন পুত্রবধূর সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। মাসিমাও কথা কম বলেন। সারা সংসারে দাপাদাপি শুধু বৌমার। এই সে বাড়ি, তার ঘর, তার আসবাবপত্র সব কিছুই যেন বড়ো বেশি খোলামেলা। বৌমার আত্মীয়স্বজনরা এলে সমারোহ বেড়ে যায়। সুর দেখেছে, বাবুর আত্মীয় স্বজন এলে বৌমা পছন্দ করেন না। কিন্তু বৌমাটি বুদ্ধিমতী, বুদ্ধিমতী না ধূর্ত সে ঠিক বোঝে না। যতক্ষণ বাবুর আত্মীয়স্বজন থাকে খায়, তাদের নিয়ে সাধ আহ্লাদের শেষ নেই। চলে গেলেই মেজাজ গরম।
বাবুর আত্মীয় স্বজনরা যে খুবই গরিব তারা এলে সে তা টের পায়। বাবুকে দেখেছে, একে ওকে লুকিয়ে টাকা দিতে। যেন কেউ না জানে। মাসিমাও পছন্দ যে খুব করেন বাবুর আত্মীয়স্বজনকে মনে হয় না। মাসিমার এক কথা কত টাকা দিলে?ণ্ঠ বাবুর সোজা এক কথা, দিইনি।
সব চেয়ে বোধহয় বাবু কষ্ট পান ছোটো ভাই মনতোষের জন্য। বাবুর সঙ্গে চেহারার কোনও মিল নেই। এলে কেমন চোরের মতো চলাফেরা। যেন বাড়িটায় ঢোকা তার মতো মানুষের পক্ষে শোভা পায় না। বাবু বাড়ি এলে, হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। সারাক্ষণ বড়দার পাশে বসে থাকবেন। মুখ কাঁচুমাচু করে কথা বলেন— কী বলেন, কান পেতে শোনার কারও আগ্রহ না থাকলেও বৌমাটির আগ্রহ খুব। সে দেখেছে, দরজার আড়ালে দাদা ভাই কী বলাবলি করছে দাঁড়িয়ে শোনার আগ্রহ খুব। তারপরই মুখ কালো করে দুপদাপ সিঁড়ি ভাঙা। এবং নিজের পাঁচ বছরের পুত্রটিকে অকারণ পেটানো—কী হচ্ছে! একদম পড়ায় মন নেই। কে খাওয়াবে? তিনি তো দানছত্র খুলে বসে আছেন।
মাসিমারও একই অভিযোগ–দানছত্র।
বাবু শুধু শোনেন। ক্ষোভে মুখ লাল হয়ে যায়। সংসারে অপচয় দেখলে মাথা ঠিক রাখতে পারেন না। তখন নিজের উপরই কেমন এক তাঁর প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে ওঠে।
কী খাবে না?
না। শরীর ভালো নেই।
কাল একটা চিঠি নিয়ে বসেছিলেন। বোধহয় বাবুর অফিসের ঠিকানায় চিঠিটা এসেছে। বাবুর মা লিখতে পারেন, ছোটোভাই লিখতে পারে—যেই লিখুক বাবু চিঠিটা বার বার পড়ছিলেন।
কী লেখা আছে কে জানে!
সুর সামান্য লেখাপড়া জানে, ইচ্ছে করলে সে গোপনে চিঠিটা পড়তে পারত। কিন্তু বাবু কেন যে বাড়ির চিঠি এলে সতর্ক হয়ে যান সে বোঝে না। হয়তো জানাজানি হয়ে গেলে মাসিমার অশান্তি বাড়বে, পুত্রবধূরও নির্যাতন শুরু হয়ে যাবে পুত্রের উপর। বাবুর বড়ো পুত্রটি তো গোবেচারা—সেও কেমন অকলে পড়ে যায় মাঝে মাঝে যখন লাভা উৎক্ষেপণ শুরু হয়, সুর বোঝে, কী নিয়ে অশান্তি। বড়ো দাদাবাবুর এক কথা বাবার টাকা যা খুশি করবেন। তাঁর তো দায় শেষ। তিনি যদি টাকা দেন আমরা বলার কে? তারপর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলবেন, তুমি কি কিছুর অভাব বোধ করছ? এত টাকা কী করো!
সর-এর এটাই প্রশ্ন। বড়ো দাদাবাবুর সরকারি চাকরি। মাস গেলে গুচ্ছের টাকা, মাসিমার মাস গেলে মাইনে, বাবু দু-হাতে রোজগার করেন এখনও। ছোটো দাদাবাবুও কম যায় না। অথচ সংসারে বাবুকে দেখলে তার কষ্ট হয়।
সুর কাল দেখেছিল, চিঠিটা পড়তে পড়তে কেমন অনামনস্ক হয়ে গেছেন। ফোন বাজছে, সেটা যে উঠে গিয়ে ধরা দরকার, তাও যেন খেয়াল নেই। বড়ো দাদাবাবু নীচে নেমে ফোন ধরলেন। বাবা, তোমার ফোন।
কে ফোন করছে?
কী জানি! নাম পার্থ বলছে। কাগজ থেকে।
বাবু উঠে গিয়ে ফোন ধরে বললেন, পার্থ? শোনো ভাই–আজ থাক। না, আজ না। বলেই দরজা বন্ধ করে বসে থাকলেন।
