সে নিজে উঠে যায়। ফুলে ঢোল হয়ে নামল, তখন আর সংশয় থাকার কথা। দিল কেটে। কাঠপিঁপড়ের ঘাঁটিটি অন্তত তছনছ করে দেওয়া গেল।
এখন গাছের কাঠপিঁপড়ে পাঁচিলের ওপর দিয়ে হাঁটে। সারা বাড়িটায় বোধহয় ছড়িয়ে পড়ার তালে আছে।
ছোটোছেলে জানাল, ছোটোবৌমা মাস দুই পরেই চলে আসছে নবজাতককে নিয়ে। তার একমাত্র বংশধর। নীচের তলায় থাকুক আর উপরের তলাতেই থাকুক কাঁথা কাপড়ের সঙ্গে অগোচরে দুটো-একটা কাঠপিঁপড়ে বিছানায় উঠে আসবে না বলা যায় না। কামড়ালে কি যে হবে! আর যদি কানের ভিতর ঢুকে যায়, শিশু সে বুঝবে কি করে দাদুর আমগাছের পিঁপড়ে তার কানে ঢুকে গেছে, আর যদি কানের পর্দায় হুল ফুটিয়ে দেয়, তবেই হয়েছে। যেন বিষধর সর্প তার সামনে ফণা তুলে আছে। আতঙ্ক।
সুতরাং গাছটি কেটে ফেলা ছাড়া তার উপায়ও থাকল না। গাছ না থাকলে তারাও থাকবে না। অন্য কোথাও ডেরা বানিয়ে নেবে।
গাছ কাটল ঠিক, ফল হল বিপরীত। সারা বাড়ির দেয়ালে পাঁচিলে, দরজায় পিলপিল করে ধেয়ে আসছে। কাঠপিঁপড়ে কি শেষ পর্যন্ত তাদের বাড়িছাড়া করে ছাড়বে!
প্রথমে গ্যামাকসিন।
যে যাই বলে। বেগন স্প্রে করুন। কেরোসিন তেল ঢেলে দিন চলার রাস্তায়। গ্যামাকসিন ছড়িয়ে দিন। বেগন স্প্রে করল। গ্যামাকসিন দিল। কেরোসিন তেল ছড়িয়ে দিল, কিছুটা উৎপাত কমল বটে, তবে রেহাই পাওয়া গেল না। বৃষ্টিতে ধুয়ে-মুছে গেল ফের উৎপাত। তারপর দেখা গেল, কোনো কিছুতেই আর কাজ হচ্ছে না।
অল প্রুফ কাঠপিঁপড়ে।
অনায়াসে তারা গ্যামাকসিনের ওপর দিয়ে হেঁটে যায়। ঘরে ঢোকে। মেঝেতেও দু-একটা চোখে পড়ে। বারান্দার দেয়ালে। যে যা বলছে, সবই করে দেখেছে। কিছুই ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
অগত্যা নিধনযজ্ঞও।
রোজ অবসর পেলেই, একটা চটি হাতে উঠে আসে। প্রথম বারান্দা দিয়ে শুরু। বারান্দার দেওয়ালে তিনটে কাঠপিঁপড়ে হাঁটছে। চটি দিয়ে চটাস। একটা পড়ে গেল। হাত-পা গুড়িয়ে গেল। পেট চেপ্টে গেল। আরও একটা চটাস। পড়ল ঠিক তবে মরল না। মরবে মরবে ভাব। রান্নাঘরে নেই। পাঁচিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পিলপিল করে আসছে। সে মারছে আর আসছে। মারছে। আবার আসছে। এক সময়ে মনে হল পাঁচিল ফাঁকা হয়ে গেছে। কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে বারান্দায় ঢুকে সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে, অবাক হয়ে দেখছে, আবার ঠিক তিনটে কাঠপিঁপড়ে। মরা কাঠপিঁপড়েগুলো পিঠে নিয়ে উঠে যাচ্ছে।
ঠিক মরা বলা যায় না। হাত-পা নড়ছে। সে চেপ্টে দিয়েছিল, বেলুনের মতো বাতাসে আবার ফলে উঠছে যেন। কাঠপিঁপড়ের জান এক কঠিন। কচ্ছপের। চেয়েও বেশি। পাঁচিলের দিকটায় গিয়ে দেখতে হয়। আবার কোথা থেকে আধমরাগুলো পিঠে তুলে কাঠপিঁপড়েরা হেঁটে যাচ্ছে। তবে সে হেঁটে যাবার সুযোগ দিচ্ছে না। জোড়ায় জোড়ায় নিধন হচ্ছে এবারে।
মাসখানেক ধরে এই করে যাচ্ছে। কিন্তু একটা পিঁপড়েরও খোঁটা ওলটাতে পেরেছে বলে মনে হয় না। মরে যায় আবার দুদিন গেলেই বেঁচে ওঠে।
সে কাঠপিঁপড়ের গতিবিধিও লক্ষ রাখছে। আসলে সে এক সকালে একই জায়গায় বসে কাঠপিঁপড়ে নিধনে মত্ত হল। মারছে। মরছে। আবার কোথা থেকে মৃত কাঠপিঁপড়েদের খোঁজে পিলপিল করে তারা চলে আসছে। কি করে খবর পেয়ে যায়—সে বোঝে না। সাঙ্কেতিক বার্তা পাঠাতে পারে বোধহয়। সারা বাড়ি ঘোরারও দরকার নেই, তবে এক জায়গায় বসে ক্রমাগত মেরে গেলেই হয়।
চটাস শব্দ শুনলেই বাড়ির সবাই বুঝে ফেলে বাবা এখন পিঁপড়ে নিধনযজ্ঞে মেতে গেছেন। পূর্ণ বলবে, কর্তার শুরু হয়ে গেল। মাথায় তার কেমন একটা জেদ চেপে গেল।
একসময় দেখল, সে নাওয়া-খাওয়ার কথাও ভুলে গেছে। ফকির আমজাদ মাঝে মাঝে ভিক্ষে করতে আসে। বাবুর সঙ্গে তার সুখ-দুঃখের গল্পও হয়। আগে এলে দেখতে পেত, বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে তিনি কি পাঠ করছেন, এখন এলে দেখে পাঁচিলের পাশে গোঁজ হয়ে বসে আছেন। কিছু বললেই, হাত তুলে ইশারা, ভিক্ষে দিয়ে চলে যাও। কথা না। এত মনোযোগ দিয়ে কি করেন।
সে না পেরে একদিন পাঁচিলে উঁকি দিয়ে দেখেছিল, বাবুর একহাতে চটি, এক পায়ে চটি। একটা চটি হাতে, একটা চটি পায়ে কেন! সে ভড়কে গিয়ে বলেছিল, বাবুর কি মাথা ঠিক আছে।
বিশ্বরূপ তাকাল। করিম ভিক্ষে, ধর্মের নামে বড়ো বড়ো কথা, আমার মাথা ঠিক নেই, তোমার আছে! সে জবাব দিল না।
বাবু রেগে গেছেন কথাটাতে। হেন অযৌক্তিক কথা বলা ঠিক হয়নি। সে খুব বিব্রত বোধ করে বলল, বাবু কী খুঁজছেন?
বিষধর সাপ।
কোথায়!
এই যে বলে কাগজে কুড়নো ডাইকরা মৃত পিঁপড়ে দেখাল। বলল, শালাদের পুড়িয়ে মারছি। আমার সঙ্গে চালাকি।
ফকির আমজাদ বলল, বাবু ভাবলে বিষধর সর্প—না ভাবলে জীব। সে যার মধ্যে বিচরণ করে। আপনি আমি তার কি ক্ষতি করতে পারি!
কামড়
না নেই।
কোথাও নেই।
মহীতোষ এ সময় নিজের ঘরে বসে থাকে। তার নিজস্ব কাজকর্মে ডুবে থাকে। চা দিতে এসে সুর দেখল ঘর খালি। বাথরুমে যদি যান। সকালে ঘুম থেকে উঠে চা না খেয়ে তিনি প্রায় নড়েন না। বাথরুমে যাবেন কেন! কিংবা ছোটোবাবুর ঘরে। ছোটোবাবুর ঘরটা খালি থাকলে তিনি সকালে কখনও কখনও সে ঘরে যান। দোতলার একপাশে ঘরটা। পাশে বারান্দা। কদিনের জন্য ছোটোবাবু এসেছিলেন, সকালে উঠেই ছোটোবাবুর ঘরে গিয়ে ডাকতেন, ওঠ। কত বেলা হল। আসলে যেন ছোটোবাবুর জন্যই মহীতোষ উপরে উঠে যান। কথা বলার মতো ওই একজনই আছেন—দেরি করে উঠলে তিনি কেমন ফাঁপরে পড়ে যেতেন।
