এই ধর না, বড়ো পুত্র কাঁচরাপাড়ায় বাড়ি করে বৌ নিয়ে সুখেই আছে। ছানি বছর না ঘুরতেই পেটে আর একখান। বাপের কথা কে মনে রেখেছে বল। মানি এতদিন অবুঝ ছিল। বলে হাই তুলল একটা। জমিজমা পেলে, ফনী ধরের বেটা রাজি। সেটাই শুধালাম মানিকে। মানি রাজি।
কিন্তু বাবা গেল কোথায়? কী দেখলে পবিত্র জায়গায় বসে?
কেমন গম্ভীর গলা নরহরির। চুল কোঁকড়ানো চোখ জবাফুলের মতো লাল— রাত্রি জাগরণ গেছে হতেই পারে-কালো ধুমসো চেহারার মধ্যবয়সী মানুষ। কাগচরিত্র আর ঝোলা ছিল সম্বল। মানুষ ঠকিয়ে, করকোষ্ঠি বিচার করে পয়সা সেই পয়সা থেকে বৌ, জমি, বংশধর ওই পর্যন্ত সে বোঝে। শরীর তার এমন খেলাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তার জন্য জমিজমা, গাই বাছুর, হাঁস কবুতর ছানি ধানি মানি লাগে—আর রহস্য এক ঘরে উদয়, অন্যঘর ফাঁকা।—তোদের বাপের শেষে অন্য রহস্য। দেখল, সবাই ত ভালোই আছে। সে না থাকলে সংসার অচল এই বিশ্বাসটা গেল মরে। সে বাড়তি মানুষ। নলহাটির খোঁজে যেতে যেতে পথের টানে ঘাটে-অঘাটে কুখাদ্য খেয়ে মরে পড়ে থাকল বালির চরায়। শকুনে চোখ উপড়ে খেল। শেষে থানা পুলিশ, মর্গ—এই আর কী? মানুষের জীবন। জীবনের আর একখানা কাগচরিত্র। সব গরমে হয় বুঝলি না। গরম মরে গেলে কিছু থাকে না। তখন বালির চরায় মরা লাশ।
তারপর একেবারে চুপ নরহরি। চোখ বুজে আছে। আসন পিড়ি। সোজা, লম্বমান দেহ, যেন ইচ্ছে করলেই শরীর থেকে জ্যোতি বের করতে পারে। বহু দূর থেকে কথা বলার মতো সতর্ক বাণী–শকুন উড়ছে।
আবার সতর্ক বাণী, বুঝলি ধানি মানি, নলহাটি যাবার রাস্তা কেউ কেউ খুঁজে পায় কেউ পায় না। খুঁজতে গেলেই আউল বাউল হয়ে যেতে হয়। মরে যেতে হয়। শকুনে তার চোখ উপড়ে খায়।
কাঠপিঁপড়ে
বিশ্বরূপ আজ মোট উনিশটি কাঠপিঁপড়ে নিধন করে …ধরের দরজার দিকে এগোল। খুব খুশি। ওদিক থেকে আবার একটা তেড়ে আসছে। পাঁচিল থেকে নেমে সেফটি ট্যাঙ্কের দিকে এগোচ্ছে। আর এগোতে দেওয়া যায় না। পালাবার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। পালাচ্ছে না। সারবন্দি যারা যাচ্ছিল—তারা নেই। জানবে কি করে বিশ্বরূপের মেজাজ গরম। এত উৎপাত কাঠপিঁপড়ের! শেষ করে দাও।
চটাস। চটি দিয়ে পিঁপড়ের দফা রফা। চেপ্টে গেছে। সারা বাড়িটার এখানে সেখানে সে সুযোগ পেলেই বের হয়ে পড়ে। এত মারছে, তবু শেষ হচ্ছে না। এদের চলার রাস্তা পাঁচিল ধরে, তারপর সেফটি ট্যাঙ্ক, তারপর সিঁড়ির দরজা। সামনের বারান্দায়ও ঢুকে যাবার ফন্দি। বাসা বানাবার তালে আছে। দরজা জানালার ফাঁকফোকড় খুঁজছে। কি করা যায় ভেবে পাচ্ছিল না বিশ্বরূপ। এত বিষ হুলে, যে একবার তার বড়ো নাতনির পাছায় হুল ফুটিয়ে দিয়েছিল। যন্ত্রণায় কাতর —চুন লাগিয়ে দেওয়ার পর পাছাখানা কিছুদিন টিবি হয়েছিল। বিষ বেদনায়ও কষ্ট পেয়েছে।
আসলে পাঁচিলের পাশের আমগাছটা ছিল এদের আস্তানা। গাছের খোঁদলে বাসা। গাছ থেকে খাবারের খোঁজে হয়তো বাড়ির দেওয়ালে, পাঁচিলে, বারান্দায় এমনকী দোতলার জানালার কাঠে ঘোরাঘুরির মজা পেয়ে গেল। হয়তো তার এ নিয়ে মাথা ব্যথাও থাকত না।
মুশকিল বাঁধাল, প্রথম বড়ো নাতনির পাছায় হুল ফুটিয়ে। তারপর একদিন বিশ্বরূপ নিজেও আক্রান্ত হল।
চেয়ারে বসে কাগজ পড়ছিল, হঠাৎ দংশন ঊরুর নীচে। প্রচণ্ড জ্বালা। সঙ্গে সঙ্গে সে ওটির নিধন পর্ব সেরে চুন হলুদের ব্যবস্থা। এবং পর পর বাড়ির সবাই যখন কোনো-না-কোনোভাবে আক্রান্ত হতে থাকল, বড়ো পুত্রবধূর অভিযোগ গাছটা থাকলে, কাঠপিঁপড়ে কামড়াবেই। যত রাজ্যের পোকা-মাকড়ের উপদ্রব গাছটায়। শত হলেও গাছটা বিশ্বরূপ নিজে লাগিয়েছে। তার মায়া হবার যথার্থ কারণ আছে।
ছোটো ছেলেরও ইচ্ছে গাছটা কেটে ফেলা হোক। কাঠপিঁপড়ের উপদ্রব থেকে তবে বাঁচা যাবে। বিশ্বরূপ একদিন কি ভেবে নিজেই গাছটায় উঠে গেল। … তারপর নেমে এল ফুলে ঢোল হয়ে। জ্বালা যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে চিৎকার করে ডাকল, পূর্ণ আছিস। কর্তার ডাকে, আজ্ঞে বলে হাজির। গাছে পূর্ণকেও উঠতে বলতে পারত। তবে বাড়ির সবাই যখন গাছটা কেটে ফেলার ব্যাপারে সমর্থন জানাচ্ছে, তখন পূর্ণ গাছে উঠেই—ওরে বাবা গেলুমরে মলুমরে বলে চেঁচামেচি শুরু করে দিতে পারে। সবার সমর্থনের বিরুদ্ধে সে যেতে রাজি হবে বলে মনে হয় না। কাঠপিঁপড়েতে গাছটা ছেয়ে আছে কর্তা, সে বলতেই পারে। সত্য মিথ্যা যাচাই করতে গেলে তার না উঠে উপায় কি! গাছটা যেন সবাইকে কামড়াচ্ছে।
একটা গাছও রাখা গেল না। চার কাঠা জমি নিয়ে বাড়ি। ফল ফুলের গাছ না থাকলে বাসস্থান হয়, তবে নিজের ঘরবাড়ি মনে হয় না। গাছ না লাগালে বাড়ির জন্য মায়াও জন্মায় না। সেই ভেবে একটা আম গাছ, একটা শেফালি গাছ, পেয়ারা গাছ দুটি এবং একটি কামিনী ফুলের গাছ সে লাগিয়েছিল। গিন্নিরও মেজাজ প্রসন্ন। গাছগুলো বড়ো হতে থাকলে গিন্নি একদিন অত্যন্ত আদরের গলায় বলেছিল, এখন তোমার বাড়িটাকে বাড়ি মনে হচ্ছে। বাড়িতে শুধু পুত্র-কন্যারাই বড়ো হযে, গাছ বড়ো হবে না হয়!
গিন্নি নেই। তিনি গত হয়েছেন চার পাঁচ সাল আগে। পেয়ারা গাছদুটো সে নিজেই কেটে ফেলেছে। পাশের প্রাথমিক স্কুলের হনুমানগুলির জ্বালায় দুপুরের ঘুম মাটি। সারা দুপুর গাছে উৎপাত, দাও কেটে, বাঁচি। বছর খানেক আগে শিউলি গাছটাও কেটে ফেলতে হল। বর্ষাকালে এত শুয়োপোকার উপদ্রব যে, ঘরের মেঝেতে, দেয়ালে তারা উঠে আসতে থাকল। জামা-প্যান্টের ভিতরও খুঁজে পাওয়া যেতে থাকল। জ্বালা যন্ত্রণা, চাকা চাকা দাগ। কী আর করা! দাও কেটে। ছিল আমগাছটা।
