ধানির আজকাল মনে হয়, এ-সব বলে শুধু লোক তামাসা দেখছে। নরহরিদাকে ধানি না পেরে একদিন বলল, মুখে পোকা পড়বে।
কার মুখে। কী হল?
আবার কার। আমরা নষ্ট মেয়ে বলে।
তা বলবে। গার্জিয়ান না থাকলে বলে। এত করে বললাম, পিসিরে নিয়ে এসে তুলি, আমি থাকি, সুখো মিঞা বরগা করে, চাষ আবাদ করলে দেখবি কত ফলে। আমি একাই একশো। গার্জিয়ান না থাকলে শকুন ওড়ে।
কথাটা মন্দ মনে হয়নি ধানির।
শকুন উড়ছে। টাউনে ভালোবাসা ছবি চলছে। ধানি গেছিল শোভাদির সঙ্গে। শোভাদির বর ভালো মানুষ বুঝেই গেছিল। শোভাদিকে রিকশায় তুলে দিয়ে তার সঙ্গে হেঁটে ফিরেছিল। এক রিকশায় চারজন ধরবে না, শোভাদি তার জা। দুটো রিকশা একসঙ্গে—কত টাকা, ধানির কট কট করছিল—সে বলেছিল হেঁটেই মেরে দেব। তা সাঁজ লেগে যাবে, লাগুক। শোভাদির বর বলেছিল সে না হয় আমি যাচ্ছি সঙ্গে। রিকশায় ওরা চলে গেলে বর মানুষটি বলল, টাউনে এলে, চা খাবে না?
দেরী হয়ে যাবে। মানিটা একা।
আরে আবার কবে আসব।
লোভ তারও শরীরে আছে। কেমন যেন ঝিম ধরা জীবনে, একটু নেশা, রাত হয়ে গেছিল ফিরতে। রেলগুমটি পার হয়ে পঞ্চানন তলার রাস্তায় বলল, চল কারবালা দিয়ে সোজা মেরে দি তা রাস্তা সংক্ষেপ হয়, ঝোপজঙ্গল আছে, সেই ঝোপজঙ্গলে ঢুকতেই হাত ধরে টানাটানি। গার্জিয়ান নেই বলেই এত সাহস।
মাথার উপরে শকুন উড়ছে।
ধানি বলল, সেই ভালো। পিসিকে, এনে তোল। পাশের ঘরটায় থাকলে শকুন সব ভেগে যাবে।
ভেগে গেল ঠিক—তবে নরহরি ছেড়ে দেবার পাত্র না। জমিজমার লোভে এক রাতে ধানির হাত ধরে বলল, দেখলি তো। কী ফসল তোদের ঘরে তুলে দিয়েছি। নরহরিকে ঘাঁটাতে কে সাহস করে।
ধানি জানে, লোকটার কাগচরিত্র জানা। সে কী বুঝে ফেলেছে বছরখানেক যেতে না যেতেই টান ধরে গেছে। গলায় তুলসীর মালা শুধু বদল করে ক-জন বোষ্টম বোষ্টমীকে খাওয়ালেই কাজ সারা।
ধানির গলায় তুলসীয় মালা উঠে গেল।
মানি এখন একা শোয়। কী ছিল, কী হয়ে গেল। জমিজমা নতুন সেটেলমেন্টে নরহরি নিজের নামে করিয়ে নিল। যে মালিক সে নেই, ক্যাম্প অফিসে গিয়ে এদিক ওদিক পয়সা দিয়ে অধিকটা দিদির নামে, বাকিটা তার নামে লিখিয়ে বলল, আমি কারো বাড়াতে নজর দিই না। কারো পয়সা ছুঁই না। মাখন কুণ্ডুর নাতি ভোগ করবে জমি। বংশ রক্ষা না হোক, কন্যের পক্ষে বংশধর জমি ভোগ করবে। মাখন কাকার কত কষ্টের উপার্জন। একটা পয়সা হাত থেকে খসত না। দিন নেই রাত নেই খেটে খেটে মানুষটা কম রেখে যায়নি। তা শকুনে খাবে, হয় নরহরির যে কাগচরিত্র জানা, মানি সেটা বুঝেছিল, দিদি একটা পুত্রসন্তান প্রসব করতেই। লোকটার তেলের কাছে মানি কাৎ। সে যেন ইচ্ছে করলে সত্যি বলতে পারে, তার বাপ আছে না মরে গেছে বলতে পারে। কুণ্ডু মশাইর নাতি হবে নরহরি আগেই গাওনা গেয়েছে।
মানি এক সকালে উঠে মুখ গোমড়া করে বসে আছে। বাজারে যাবে নরহরি। ছেলেটা তার কাঁধ থেকে নামছে না। সকাল বেলা, বেশ রোদ উঠেছে, শীতও জাঁকিয়ে পড়েছে। আর এ-সময় মানি গোমড়া মুখে বসে আছে দেখতেই বলল, আরে আমিতো আছি শকুন উড়ে দেখুক না।
মানি বলল, একটা কথা রাখবে নরহরিদা!
এই সক্কালে তোর আবার কী কথা।
না বলছিলাম, তোমার তো কাগচরিত্র জানা, বল না, বাবা এখন কোথায় আছে?
নরহরি ট্যারচা চোখে দেখল মানিকে। ডুরে শাড়ি পরে উঠোনের কোনায় রোদে পিঠ দিয়ে বসে আছে। সে যে বড়ো রসিকজন। এমন একটা গানের কলি গলায় ভেসে উঠল। বলল, বলব। তবে বসতে হবে। হুট করে সব বলা যায় না। রাতে জায়গা পবিত্র করে রাখবি–বসব।
এই পবিত্র করে রাখবি কথাটাতে মানির মনে শিহরণ খেলে গেল। সে পবিত্র করেই রেখেছিল।
সকালে ধানি বলল, রাতে টের পেলে?
মানি বলল, কী জানি? জানি না।
ধানি বলল, একা ঘরে উনি কাগচরিত্র নিয়ে বসেছিলেন। ছেলেটাকে বুকের দুধ খাওয়াতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম—আমার আর জাগা হল না। সকালে উঠে দেখি তুই নিজেই কখন উঠে ঘরদোর লেপতে শুরু করেছিস। কী বলল?
মানির এককথা, কী জানি! তোমার সোয়ামি বোষ্টম মানুষ, তারে আমি ঠিক বুঝি না! জিগাও না কী কয় দ্যাখ।
লোকটা সকালেই গোরু বাছুর নিয়ে মাঠে বের হয়ে গেছে। ফিরলে বলল, বাবার খবর পেলে। কালতো বসলে।
বাবার খবরে আর কাজ কী? মানি আর বাবার খবর জানতে চায় না। ধানি বলল, তাহলে বাবা আমার নেই? কাল পবিত্র জায়গায় বসে কী টের পেলে বল!
বললাম মানিকে, তোর বাবা পথের টানে পড়ে গেছে। ফিরছে না।
আর কী বললে?
বললাম, তোর বাবা সবার ঠিকানায় গেছে।
এখানে এসেছিল?
ঘুরে গেছে।
গাঁয়ে এসে বাড়ি না ঢুকে চলে গেল।
নরহরি হাসল। বসে আছে বারান্দায়। আসন পেতে। কোলে মাখন কুণ্ডর নাতি। বংশধর। কন্যের পক্ষের। বলল, নাতির মুখ দেখে গেছে।
বুবলার মুখ দেখে গেল?
হাঁ, হাঁ। দেখল। রাস্তায় নিয়ে গেছিল মানি কোলে করে। লোকটা বলল নলহাটির রাস্তা চেন।
নলহাটি?
আরে হ্যাঁ। ওই রাস্তার খোঁজে গিয়ে দেখল, সবাই যে যার মতো বেঁচে আছে। সে কে? এই ভাবটা উদয় হতেই বিবাগী। সবারেই এককথা কয়।
কী কথা!
রাস্তাটা কোনদিকে। নলহাটির রাস্তার খোঁজ আর পায়নি।
তবে যে বললে, সব দেখে গেল?
এখন মাথায় অন্য পোকা। কারা এরা?
বষ্টুম মানুষের কথায় রহস্য—ধানি পাশে বসে শুনছে।
