মাথায় চড়াৎ করে দেবী ঠাকুর এ-ভাবে হেগে দিয়ে যাবে কল্পনাও করতে পারেনি। বামুনের বেটা তুই, আমার কন্যের এত বড়ো সর্বনাশ করলি! তা পঞ্চায়েতে গেলে হয়।
কে বলল পাশ থেকে, তুই পাগল মাখন!
আপনি কে গুরুঠাকুর?
আমি কে দেখতে পাও না!
অ আপনি আমার মাথার ঘিলু। তা বলেন, কী করব। খুঁ
জে দেখ পাও কি না।
মাখন খুঁজে দেখতে বের হয়ে গেল। সেই যে বের হয়ে গেল আর ফিরল না।
তারপর দিন যায়।
ছানি এক রাতে দেখে দেবী ঠাকুর হাজির।
ছানি বলল, আমি জানতাম তুমি আসবে!
দেবী ঠাকুর বলল, এখান থেকে চলে যেতে হবে।
কেন?
সবই গোপনে! রাতের গভীরে ঢোকা। ধানি ভেবেছিল, বাবা ফিরে এসেছে, দরজা খুলে দেখে বাবা না, দেবীদা।
ধানি প্রায় চাপা আর্তনাদ করে উঠেছিল, দিদি, দেবীদা!
ছানির পৃষ্ট শরীর দুর্ভাবনা দুশ্চিন্তায় কিছুটা রোগা হয়ে গেছে। তবু স্তন বেশ পুষ্টই আছে। এবং দেখামাত্র লোভ এবং সংক্রামক ব্যাধির মতো শরীর অবশ হতে থাকলে দেবী ঠাকুর শিয়রে বসে পড়ল।
ধানি বলল, বাবা তোমায় খুঁজতে গেছে। মাস হয়ে গেল ফিরে আসছে না। বলে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল।
ছানি পাশ ফিরে শুয়ে আছে। ঘরে লণ্ঠন জ্বালা। কথা বলছে না।
ধানি বলল, এই দেবীদা দিদি না কেমন হয়ে গেছে।
কারো সঙ্গে রা করে না।
দেবীর চারপাশে সতর্ক নজর। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, তোরা যা। আমি দেখছি কথা কয় কি না।
ধানি মানি ঘর থেকে বের হয়ে গেল। বেশি রাতে পাশের বাড়ির পিসি এসে শোয়। আজ বারণ করে দিতে হয়। দাদা এসেছে। তোমার শুতে হবে না পিসি।
ঘর থেকে দু-বোন বের হয়ে গেলেই ছানি বলেছিল, তুমি আসবে জানতাম।
সেই জানাজানি দুজনে রাতে ফের এক প্রস্থ ভালো করে হয়ে গেল। শরীরে গরম ধরলে আর সব অচল পয়সা। গরম মরে গেলে ছানি বাপের জন্য সে রাতে চোখের জল ফেলল। বাবা আর ফিরবে না আমার এমন বলে ভ্যাক করে ধানির মতো কিছুক্ষণ কেঁদেও নিল। দেবী ঠাকুর বুঝল প্রবোধ দিল। রাত থাকতে বের হয়ে পড়তে হবে। কাকপক্ষী টের যেন না পায়।
পরদিন সকালে দুই বোন উঠে দেখল, ঘর ফাঁকা। দরজায় শেকল তোলা।
বাপ গেল, দিদিও গেল।
শকুন উড়ছে।
শকুনের চোখ বড়ো তীক্ষ্ণ। সে শুধু উপরে উড়ে—গন্ধ শুঁকে বেড়ায়।
দুই বোন গলা জড়াজড়ি করে কাঁদল। প্রতিবেশীরা বলল, তোর দাদাকে খবর দে।
দাদা আর আসবে না।
তা না আসতেই পারে। ছোঁড়ারই বা কী দোষ। বোনের এত বড়ো কলঙ্ক মাথায় বয়ে বেড়াচ্ছে। বাপ নিখোঁজ। বোনটাও।
কোথায় গেল।
দু-বোন বলল, জানি না।
তবে জানে না বললে মিছে কথা বলা হবে।
নলহাটির ডাকবাংলোয় দেবী ঠাকুর কাজ পেয়েছে। চাপরাশির কাজ। দিদিকে নিয়ে সেখানেই তবে তুলেছে। কেবল রাতে বলেছিল, আমি যে নলহাটিতে আছি বলিস না।
দেবী ঠাকুরের বাবার মুদি দোকান বাজারে। পুত্রের প্রতি কোনোদিনই আবেগ বোধ করেনি। নষ্ট মেয়েছেলে তিনটের পেছনে দু-হাতে টাকা উড়িয়েছে। দোকান ফেল মারতে বসেছিল-সময়মতো রশি টেনে ধরেছে বলে রক্ষা। সেই থেকে দেবী ঠাকুর পলাতক।
বাড়ি জমিজমা চাষ আবাদ হাঁস কবুতর দুই বোন সামলায়। দুটো পেট। ধানি শাড়ি পরে। মানি ফ্রক। গাছপালার মতো শরীরে ডালপালা মেলছে। মুখে লাবণ্য, শাড়ি পরলে সুন্দরী ধানি, আলতা পরে মেলায় যায়। মানি ঘর ঝাঁট দেয়—দুধ দুইয়ে দিয়ে যায় নরহরি, আবাদ দেখে সুখো মিঞা-পুরুষ মানুষ এ-কামে সে কামে বাড়িতে আসেই। নরহরি দুধ দুইয়ে নড়তে চায় না।—এক কাপ চা হবে নি ধানি?
হবে না! বস না। কী কাজকর্ম ফেলে এয়েছ?
আর বলিস না, বসার কী সময় আছে, টেনে এক কোরোশ রাস্তা যেতে হবে।
নরহরি একা মানুষ বিধবা পিসি নিয়ে সংসার। আচার্য বামুন। কাকচরিত্র জানে। গলায় তুলসির মালা। দুধ দুয়ে ফের বসে, এক গেলাস দুধ পায়। বাকি দুধ রোজ। দু-বোনের কপালে দুধ বড়ো জোটে না।
নরহরিই বলেছিল, মাখনদা গেছে নৈঋত কোণে। বুঝলে অগস্ত্য যাত্রা। ওই যাত্রায় বের হলে ফেরা যায় না।
মানি ফ্রক গুটিয়ে বসলে মাখনের মতো সাদা উরু দেখা যায়। বসেও। এই একটা লোভ আছে—তা বয়স একটু বেশি তার। ধানি শাড়ি পরে আলতা পায়ে দিলে দেবী জগদ্ধাত্রী। সে শুধু তাকিয়ে থাকে তখন। বলে তোমার বাবা বুঝলে ধানি একজন পুণ্যবান মানুষ। তা তিনি এখন সাধু সন্নেসী হয়ে গেছেন।
তুমি দেখতে পাও। ধানি ভাবল, কাকচরিত জানে, বলতেই পারে।
চোখ বুঝলে, কে কোথায় আছে টের পাই।
আমার দিদি কী করছে।
ও একখান বারান্দা বুঝলে লম্বা। সামনে মাঠ। চারপাশে গাছপালা। ফুলের গাছ। সূর্যমুখী, গেঁদা, দোপাটি, বেলফুল। নানা গাছ। তোমার দিদির বাচ্চাটা বসে আছে। দিদি তোমার বোতলে দুধ খাওয়াচ্ছে।
কোথায় আছে বলতে পার? কোনদিকে?
এই তোমার উত্তর-পশ্চিম কোণে। কী ঠিক না?
কী ঠিক না কথায় সায় দিতে পারে না মানি। দেবীদা নলহাটির কোথায় কোন ডাকবাংলোর চাপরাশি এটুকু শুধু জানে। নলহাটি কতদূর জানে না। কোনদিকে জানে না।
কী করে যেতে হয় জানে না। খবর নেবে কাকে দিয়ে—এমনও মনে হয়। সংসারে দিদিটার কথা উঠলে নিজেরাও ছোটো হয়ে যায়। শুধু গুম মেরে থাকা। বাবার জন্য ধানি মানি আর অপেক্ষায় থাকে না। সুখো মিঞার এককথা, বড়া ভাইর মাথায় আল্লার গজব নেমে এয়েছে। পথের টানে বের হয়ে গেল।
তারা এই পথের টানটা কী জানে না। থানা পুলিশে খবর দেবার লোক নেই। শুধু কেউ পথে ঘাটে দেখা হলে এক প্রশ্ন, কী রে দিদি ফিরল? তোর বাবা।
