মানুষটা সব বুঝেও চুপচাপ ছিল। ছানি মানি ধানি তিনজনাই সোমত্ত, গায়ে গরম ধরে গেছে। পুরুষ মানুষ বড়ো সংক্রামক ব্যাধি, এলেই গায়ে তাপ বাড়ে। তা বাড়ছিল, বেশ কথা। বাড়তে বাড়তে আগুন লেগে যাবে, মুখপুড়ী রাক্ষুসী তোর এ কথাটা মনে এল না। পেটের মধ্যে, আগুন গিলে বসে আছিস, কে নেভায়।
সহসা তার আর্তনাদ, কার কাম ক দিকি, মুণ্ডু ছিঁড়ে আনি!
ছানি মুখ থুবড়ে বসে পড়েছিল সেদিন। বমি, গা গোলায়, তা তুই কুমারী মেয়ে, আমিতো বসে নেই-বয়স হলে গোরু বাছুরের মতো পাল খাওয়াতে হয়, মনুষ্য সমাজে বাস, শাঁখা, সিঁদুর লাগে, আর লাগে হলুদ বাটা, আম্র পল্লব—সামিয়ানা টানাতে হয়, তার নীচে আগুনের কুণ্ডু, হোম দু-হাতের মিলন, তারপর যদৃচ্ছ আচরণ, যেমন খুশি পা তুলে নামিয়ে, উপুড় করে কিংবা উটের মতো মুখটি তুলে হাঁটো, কিছু বলার নেই—মাথা উঁচু করে হাঁটতে কষ্ট হয় না। পেটে আগুন থাকলেও জ্বলে না।
কার কাম? বল! বল পোড়াকপালী সর্বনাশী, দা খানা কোথায়, না বলিস তো দা দিয়ে গলাখানা কেটে ফেলব।
ছানি কী বলবে। ডাগর চোখে তাকিয়ে আছে। ধানি মানি বাবাকে জড়িয়ে ধরেছে।–ও বাবা কী কচ্ছ, ও বাবা তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? বাবা বাবা!
মাখন কুণ্ডু তেড়ে যাচ্ছে আর বলছে, তার আগে আমি কেন গলায় দড়ি দিলাম না। তোদের মা থাকলে সে সব সামলাত! আমি কার কাছে যাই, কী করি! আবার হুংকার, বলবি না, কে করল। কোন পাষণ্ডের কাজ। আমার এমন সুন্দর কন্যেটাকে নষ্ট করে দিল।
ছানি ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছিল। কিছু বলে না! খাচ্ছে না! দুপুরে দরজা বন্ধ করতেই গোলমাল, ও বাবা শিগগির, এস। ক্ষোভে দুঃখে মাখন নিজের জমির আলে মুখ গামছায় ঢেকে শুয়েছিল। খায়নি স্নান করেনি, কোনোদিকে বের হয়ে যাবে ভাবছিল—তুই হলিগে ধরিত্রী। আবাদের সময় পার হয়ে যাচ্ছে বুঝি। তা পাত্রপক্ষের এত জুলুম আমি অভাবী মানুষ সামলাই কী করে!
কী হল!
শিগগির এস। দিদি দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে।
আতঙ্ক। সে মাথার গামছাখান হাতে নিয়ে ছুটেছিল। সুখো মিঞা রাস্তায়। গোরুর গাড়ি নিয়ে শহরে যাচ্ছে-তার সামনে পড়ে গিয়ে মানি ধানি জমির মধ্যে নেবে গেল।-বড়োভাই ছুইট্টে গ্যাল! কী ব্যাপার!
ধানি শাড়ির আঁচলে গা ঢাকছিল। বাবা দৌড়াচ্ছে। কথা কবার সময় নাই। ছুটতে ছুটতেই বলল, শকুন উড়তাছে সুখা ভাই।
কোনখানে?
বাড়ির মাথায়।
আসলে এই শকুনের ওড়াউড়ি তারা বড়ো হতে না হতেই টের পায়। চোখ দেখলে টের পায়। দিদি এখন পেটে আগুনের আঙরা নিয়ে বসে আছে, পেটে আগুনের আঙরা এবং এসব মনে হলেই ধানি মানির মনে হয়, সব শকুন। সব ক-টা শকুন। দেবীদা, অমর, গোপাল ছান সব। ওরা কী টের পেয়ে গেল। দাদাটাও মাসখানেক বাড়ি আসছে না। কী যে করে। শাড়ির আঁচল সামলে তালগাছটার নীচে আসতেই কেমন আতঙ্ক-পা অসাড়। তবু টেনে টেনে যখন উঠোনে হাজির, দেখল দিদি আবার অক অক করে বমি করছে।
ধানির মনে হল, বমি পেয়েছে বলে রক্ষা, দরজা খুলে বমি করতে বের হয়েছে। না হলে সর্বনাশ।
মানি ফুঁপিয়ে কাঁদল দিদিকে জড়িয়ে। আর ঠেলাঠেলি, তুই কেন দিদি দরজা বন্ধ করে দিচ্ছিলি,—এই দিদিরে, তুই কেন, কেন! দরজা বন্ধ করলে মাথাকুটে মরব বলে দিচ্ছি। বাবাতো একরামের নানির কাছে যাবে। সব সাফ হয়ে যাবে দেখবি! ভালো হয়ে যাবি। আসলে এতটা কথা মানি বলতে জানে না। টের পেয়ে সেও গুম মেরে গেছিল। ধানির ফিসফিস কথাবার্তা—দেবীদা ছাড়া কেউ না। আসুক ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব।
তা হতেই পারে। মিলে যাত্রা দেখতে গেলে, দিদি একা বাড়ি ছিল। পূজার দিনে শহরে ঠাকুর দেখতে গেলে দিদি একা বাড়ি ছিল। ফাঁক ফোঁকরে ইঁদুর বাদুড় ঘরে ঢুকে গেছে। দিদি কিছু বলছে না, বাবা গুম মেরে গেছে—মাঝেমাঝে একখানই কথা, বিষম বিপাকে পড়েছি হে।
তা সংসারে কন্যের বাপ হওয়াটা বড়ো দায় হে। এই একখান কথাও ত্রিভুবনে লংকা কাণ্ড-কন্যের জমিতে বীজ ফেলে তুই উধাও হলি। হারামির বাচ্চা। দেখি নাগাল পাই কী না।
গোপনে গোপনে সাফ করার চেষ্টা, এক সকালে মাখন দুটো শেকড় এনে দিল ধানিকে। বলল, পাঁচ ক্রোশ হেঁটে গেছি হেঁটে এসেছি। নির্ঘাৎ পাতের কথা বলে দিয়েছে।
ধানি বলল, শুধু বেটে খাওয়ালেই হবে।
সঙ্গে নিরসিন্দার পাতার রস।
আর কী।
আর ত কিছু বলেনি।
সব গোপনে গোপনে, বাড়িগুলি ফাঁকা ফাঁকা বলে রক্ষা, প্রথম থেকেই গোপন রাখা গেছিল, কিন্তু শেষে আর পারা যায়নি।
এই দিদি রসটা খেয়ে নে।
ছানি পাশ ফিরে দেখছিল ধানিকে। হাতে কাচের গেলাস নীল রঙের রস। ছানির চোখ সাদা ধূসর, মুখ শুকনো, গলা টিপে আত্মহত্যার চেষ্টা করার সময় মনে হয়েছে, পেটে তার আবাদ, সে মরে গেলে আবাদ নষ্ট। পারেনি।
এই দিদি ওঠ না।
ছানি শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে রেখেছে।
দিদি।
বাইরে বসে আছে মাখন কুণ্ডু।–নচ্ছার, কুলটা মেয়ে, বংশের মুখে কালি দিলি! তুই মরে যা। মরে যা। সবই মনে মনে—ত্রিসংসারে তার আর কে আছে? এই তিনটে কন্যে, কিছু হাঁস কবুতর, গোয়াল গোরু বাছুর, জমিজমা–চাষা মানুষের যা হয় লেপ্টে থাকার স্বভাব, এই তিন কন্যে নিয়ে সে লেপ্টে ছিল।—ছানিরে তুই একী সর্বনাশ করলি রে!
দিদি ওঠ। খা। বাবা চিল্লোচ্ছে।
সহসা ছানি উঠে বসল, গ্লাসটা কেড়ে নিল ধানির হাত থেকে। তরপর উঠোনে ছুঁড়ে মারল। শেষে আবার গিয়ে শুয়ে পড়ল। মাখন কুণ্ডু ভাবল, উঠে গিয়ে মেয়ের চুল ধরে টেনে আনে। আছড়ে-পিছড়ে পেট থেকে পিছলে বের করে আনে এক কুলাঙ্গার ইতরটাকে। হাতের কাছে না পেয়ে দাঁত নিশপিশ করছে। যেন বেটা ভূত হয়ে উবে গেল। তারপরই মনে মনে এক কথা, বিষম বিপাকে পড়েছি হে!
