তোমার মা থাকতে রাজি না। বাবার এক কথা।
তোমার বাবাও শহরে এসে সুখ পায় না। বাবার এক কথা।
আসলে গাঁয়ে থাকলে এক রকমের স্বভাব, শহরে থাকলে এক রকমের।
ওদিকের ঘরগুলি খোলাও থাকে। বন্ধও থাকে। লম্বা করিডোর—দু-পাশে দুটো ফ্ল্যাট–এখন সবটাই তার ভোগ দখলে।
কোনো ঘরে যদি ঘাপটি মেরে থাকে। আকাম কুকাম করলে বুঝতে পারে কপালি, দাদা এসে চোটপাট করবে। দাদাবাবু বকতে পারে। তখন পালিয়ে থাকার স্বভাব। অন্ধকারও পছন্দ। শ্যামলা রং ধরেছে ইদানীং। বিয়ের বয়স ফুটে উঠলে যা হয়। লাবণ্য যেন উপচে পড়ছে। কারো নজর পড়বে না হয়! আর কপালি যদি মাথা পাতে।
দরজা খুলে সব ঘরগুলিই দেখা গেল।
ঘুমালে অঘোরে ঘুমায় কপালি। দিশা থাকে না। সাঁজ লাগলেও সাড়া পাওয়া যায় না। মরার মতো ঘুম। মাদুর পেতে শুতে তর সয় না। পড়লো তো মরল।
না কোনো ঘরে নেই। ছাদেও নেই। বাথরুম খুলে দেখল। তারপর অগত্যা দেশেই খবর পাঠাতে হয়। থানা পুলিশ করতেও ভয়। কালীপদকে আগে খবর দেওয়া দরকার। সঙ্গে বাবাকেও। বাবা ঠিক কথাই বলেছেন, মন খারাপ হলে পালাতে পারে। যদি দেশেই চলে যায়।
সাত পাঁচ ভাবছিল তারা। আর তখনই রিনা বলল, দেখতো গেটের অন্ধকারে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে।
গেট বন্ধ করে দিয়ে এসেছিল সে। বেশি রাতে গেট খোলা রাখতেও সাহস পায় না।
কে? ওখানে কে?
সাড়া নেই।
সে ছুটে গিয়ে দেখল, অন্ধকারে কপালি দাঁড়িয়ে আছে।
আর মাথা ঠিক রাখা যায়?
কোথায় গেছিলে! ভিতরে আয়। আজ তোর একদিন কী আমার একদিন!
কপালি মাথা তুলছিল না। দাদাবাবু চোটপাট করলে সে এমনিতেই ঘাবড়ে যায়। আজ যে কপালে দুর্ভোগ আছে ফেরার মুখেই টের পেয়েছিল।
দাদাবাবু, বৌদিমণি কাউকে না বলে বের হয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। মিনসেটা এত পাজি জানবে কী করে।
কী বললি কপালি?
আমার গন্ধরাজ ফুলের কলম কী হল?
দেব!
তবে দিচ্ছ না কেন। ঘোরাচ্ছ। বা
ড়িতে কলম করেছি। হলে বলব।
কবে হবে?
সময় হলে বলব। তখন কিন্তু না করতে পারবি না।
বারে না করব কেন?
বাড়ি যেতে হবে। যা
ব। বাড়ি কতদূর!
এই হানাপাড়া পার হয়ে।
গেট বন্ধ করার সময় দাদাবাবু তার দিকে তাকিয়ে অবাক!
এঁকি ছিরি তোর। চোখ বসে গেছে কেন! এত আতঙ্ক কীসের। হাতে ওটা কী! শাড়ি সায়া ব্লাউজ সামলাতে পারেনি। দেখেই দাদাবাবু বোধহয় টের পেয়ে গেছে। সে ফুঁপিয়ে উঠল। কাঁদছে।
কী হল!
রিনাও ছুটে এসেছে। গেটে এই তামাসা তার পছন্দ না। বলা নেই কওয়া নেই হাওয়া। রাত করে ফিরে আসা! চোখে আবার জল গড়াচ্ছে! ঢং। হাতে ছোট্ট টব। কী ফুল, কী গাছের কলম কিছুই বুঝছে না রিনা। সব গেলেও কপালি টবটা আর গাছটা অক্ষত রাখতে পেরেছে–একেবারে ভেঙে পড়ছে না। এতে আরও ক্ষেপে গেল রিনা।
ভিতরে যা।
কপালি বাড়ি ঢুকে বারান্দায় টবটা আলতোভাবে নামিয়ে রাখল।
তারপর জেরা শুরু।
জেরার মুখে কপালি বলল, আমার কী দোষ, লোকটা তো বলল, বাড়িতে গেলে দেবে!
কোন লোকটা!
ওই যে গাছফাছ বিক্রি করে।
ধন’য়। ও বলল, আর তার বাড়ি গেলি!
আমার কী দোষ! ওতো ঘোরাচ্ছিল। বাড়ি যেতে বলল। লোকটার খারাপ মতলব বুঝব কী করে? টবটা দেখিয়ে বলল, ঘরে আয়। দামদর হবে! কত এনেছিস! বলেই হাত ধরে টানতে থাকল। আমিও ছাড়িনি। হাত কামড়ে টব নিয়ে পালিয়েছি।
টবটা ছুঁড়ে মারতে পারলি না মুখে! দেখাচ্ছি মজা!
টবটা ছুঁড়ে মারলে ভেঙে যেত না! গাছটা কী তবে বাঁচত!
বৌদিমণি কিংবা দাদাবাবু কেন যে আর একটা কথা বলতে পারল না। মাথা নীচু করে ভিতরের দিকে চলে গেল! নিজে ক্ষতবিক্ষত হলেও গাছটা অক্ষত আছে ভেবেই কপালি খুশি।
কপালি বেশ চেঁচিয়ে বলল, বৌদিমণি গাছটা কিন্তু গেটের সামনে লাগাব।
দেখবে ফুল ফুটলে বাড়িটা গন্ধে ম ম করবে। কী মজা হবে না বৌদিমণি।
কপালি সব ভুলে গেছে। টবটা কোথায় রাখবে ভেবে পাচ্ছে না।
ও বৌদিমণি, টবটা বারান্দায় রাখলাম।
অবশ্য ভিতর থেকে কোনো সাড়া নেই।
সে আবার চেঁচিয়ে বলল, গাছ না হলে বাড়ি হয়।
এবারেও কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।
কপালি সত্যি সন্ধ্যাতারা। তারার সঙ্গে কে কথা বলে!
কাকচরিত্র
বড়োই বিপাকে পড়েছি হে। ঘিলুতে লোকটার এই একটা কথাই পাক খাচ্ছে। তাও মনে মনে। কী বিপাক, কীসের বিপাক কেউ জানে না। মাসখানেক ধরে এই একটা কথাই পাক খায়। ছনের চালে কাক এসে বসে থাকে হুস করলে উড়ে যায়, কিন্তু এই বিপাক উড়ে যায় না। আবাদে আখাম্বা ষাঁড় দৌড়ায়, হাতে লাঠি নিয়ে তাড়া করলে, সেও দৌড়ায়। পাখ পাখালি গমের জমিতে উড়ে এলে হাঁ হাঁ করে তেড়ে যায়, পোকামাকড়ের বড়ো উপদ্রব। তার এক কথা। বিষম বিপাকে পড়েছি হে।
এই বিপাক মাসখানেক দৌড় করাচ্ছে তাকে। তা তুই আবাগির বেটি বুঝলি না, তোর বাপ মুখ দেখায় কী করে! শিরে বজ্জাঘাত। এখন আমি তাকে পাই কোথা!
হা শুনছ বাবা!
কে?
আমি তোমার খুড়ামশায়।
কিছু করেন।
আরে দেবীর খোঁজ জান!
ও তো নলহাটির কাছে কোথায় থাকে?
তারে যে একখান খবর পাঠাতে হয়।
তারপরই চুপ, খবর কেন! কীসের খবর!
মাখন কুণ্ডু দেবী ঠাকুরের খবর জানতে চায় কেন! খবর পাঠাতে চায় কেন!
পাড়া প্রতিবেশীরা কেমন চুপ মেরে গেছে। সৃষ্টিছাড়া কাজ হয়ে গেল যে, উঠোনের মাঝখানে অপকৰ্ম্মটা সেরে গেল। ধূপ ধুনোর তো খামতি নেই। সকাল থেকে তার কাজ, জমিতে যে দিনে যা লাগে সবকিছুর জন্য ছোটাছুটি। গোরুর দুধ ঘরে—তা অভাব অনটন আছে, ছানি মানি ধানি তিন কন্যে, বড়ো পুত্র কাঁচরাপাড়ায় কলে কাজ করে, হপ্তার ছুটিতে এলে যেতে চায় নালাগোয়া ঘরটায়। উঠতি যুবকেরা তখন ভিড় বাড়ায়—কীসের গরমে সে বোঝে। শরীরে গরম ধরলে এটা হয়।
