সেই অরূপদারা আসছে।
গাড়ি বের হয়ে যাবার শব্দ পেল পূর্বা।
পূর্বা এখন কী করবে বুঝতে পারছে না। বাথরুমে ঢুকে স্নান সেরে নিলে হয়।
নন্দ বলল, দিদিমণি চা।
সে চা না খেয়েই বাথরুমে ঢুকে গেল। সেই বড়ো আয়না। সে ছোটোবেলা থেকেই আয়নাটা দেখে আসছে। মাথা সমান একটা উঁচ আয়না দেয়ালের সঙ্গে সাঁটা আগে বুঝত না, বাথরুমে এত বড়ো একটা আয়নার কী দরকার! যত বড়ো হচ্ছে তত বুঝতে পারছে আয়না আছে বলেই সে নিজের সব কিছু এত খোলামেলা দেখতে পায়। আগে সে বাথরুমে ফ্রক প্যান্টি খুলতে পর্যন্ত লজ্জা পেত। সে খুলত না। বাবাকে মনে হত, বুদ্ধির চেঁকি। আর জায়গা পেলে না! এত বড়ো আয়না এখানে! এখন বুঝতে পারে আয়নার রহস্য! আয়নাটা না থাকলে বাথরুমের আসল সৌন্দর্যটা নষ্ট হয়ে যেত। বাথরুমে ঢুকলেই আয়নায় সে তার নারী মহিমা টের পায়।
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আজ নিজেকে একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে দেখল। আশ্চর্য, আয়নার অদুরে কেউ দাঁড়িয়ে হাসছে। এই ফাজিল ছেলে, ওখানে কেন। মারব। সরে যাও বলছি। ছিঃ তুমি কী! যাওনা। নানা। ও-ভাবে না। আমি ওভাবে ভালোবাসি না।—পাশ থেকে? না না আমি মরে যাব। ও-ভাবে না! তুমি কী বোকা। এই পাগলের মতো কী করছ! আঃ।
সে কতক্ষণ আয়নার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল জানে না। কখনো চড়াই উত্রাই পার হয়ে গেছে কারো হাত ধরে, কখনো কোনো নির্জন দ্বীপে সে আর অরূপদা। একটা বোটে করে চলে গেছে। এক উলঙ্গ পৃথিবীর বাসিন্দা দুজনে। সবুজ প্রান্তর পার হয়ে ছুটে গেছে প্রজাপতি ধরতে। আবার কখনো সমুদ্রের তরঙ্গমালায় ভেসে যেতে যেতে চিৎকার করে উঠেছে, আমি ডুবে যাচ্ছি কেন। আমাকে কে তলিয়ে দিচ্ছে। সমুদ্রের গভীরতা খুঁজে পাচ্ছি না অরূপদা! আর তখন অরূপদার ক্ষীণ গলা শুনতে পাচ্ছে, গভীরতার খবর আমি রাখি। আমি আছি বলেই তোমার এই গভীরতার সন্ধান দিতে পারব। আমরা আছি বলেই তোমার এই রহস্যময় গভীরতা পৃথিবীতে জন্মের ইশারা ডেকে আনে।
নন্দ ডাকছে তখন, ও দিদিমণি, খাবার ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
তার হুঁশ ফেরে।
সে বের হয়ে এল শাড়ি পরে।
নন্দ বলল, কী সুন্দর লাগছে দিদিমণি! সরস্বতী ঠাকরুণ একেবারে।
এই মারব।
তুমি একেবারে দুগগা ঠাকুর হয়ে গেছ দিদিমণি!
মারব বলছি।
আসলে পূর্বার মনে হচ্ছিল দুগগা ঠাকরুণ না ছাই। বাথরুমে কত রকমের অসভ্য চিন্তা করেছে। ওটা ভালো না। নিজেকে বড়ো ছোটো মনে হয়। অথচ না ভেবেও কেন যে থাকতে পারে না। অসভ্যতা ভেবেও সে স্থির থাকতে পারে না। ভাবতে ভাবতে কখন অবশ হয়ে আসে শরীর। পিচ্ছিল এক নদীপথে ভাসমান নক্ষত্রমালার স্বপ্ন দেখতে দেখতে তার ঘুম চলে আসে। নন্দ তা বুঝবে কী করে! সে খুব সাহসী না। সে এখনও দরজা ভেজিয়ে শোয়। বন্ধ করে শুতে ভয় পায়।
আর তখনই সিঁড়িতে হৈ-চৈ করে উঠে আসছে কারা। অরূপদার গলা পাওয়া যাচ্ছে। সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠলেই দেখতে পাবে তাকে। তাড়াতাড়ি নিজেকে কেমন লুকিয়ে ফেলতে ইচ্ছে হল। কেন যে সোজাসুজি ছুটে গিয়ে বলতে পারছে না—অরূপ-দা, কি মজা, তোমরা এসে গেছো! এবারে তোমাকে নিয়ে কাকুলিয়া পার হয়ে চলে যাব। কাঁচা রাস্তা, তারপর আর গাড়ি চলে না। আমরা হেঁটে যাব। গ্রামটা কী সুন্দর! সব গরিব মানুষের বাস। ওখানে আমার এক বন্ধু থাকে। বাবা তার পড়ার খরচ চালান। বড়ো হোস্টেলে থাকে। বাবা মাঝে মাঝে আমাদের ওখানে নিয়ে যান। এবার আমি তোমার সেখানে নিয়ে যাব। ওর বাবা মা কী ভালো। সামনে পুকুর, তেঁতুল গাছ কী প্রকাণ্ড, তার ছায়া কী গভীর আর কী ঠাণ্ডা! তেঁতুল গাছের নীচে আমরা দুজনে চুপচাপ বসে থাকব।
আর তখনই গলা পাওয়া গেল, এই পূর্বা তুই কোথায়।
সে আয়নায় নিজের মুখ দেখে চুলে সামান্য চিরুনি চালিয়ে বের হয়ে বলল, তালে এসে গেলে!
আমরা ভাবলুম, তোর আবার কোনো অসুখ-বিসুখ নাকি!
তুই গেলি না!
পূর্বা কিছু বলল না।
অরূপদাকে কিছু না বললেও আসে যায় না। নিজেই অজস্র কথা বলে যাবে। কে কী কথার জবাব দিল তোয়াক্কা করে না। দু-বছরে মানুষ সত্যি দ্রুত বদল হয়ে যায়। অরূপদা আরও লম্বা হয়েছে। ঢ্যাঙা, লম্বু। চুল ব্যাকব্রাস করা। নরম নীলাভ দাড়ি গালে অল্প অল্প। প্রায় নবীন সন্ন্যাসী গেরুয়া পরলে। পূর্বা ঠিক চোখ তুলে তাকাতে পারছে না।
আবার অরূপদার কথা, এই আর। তোকে মা ডাকছে বাবা খোঁজাখুঁজি করছেন।
পূর্বা জানে ওরা এখন বসার ঘরে। বসার ঘরটা করিডোরের শেষ প্রান্তে। সিঁড়ির মুখেই। মা ওদের জলখাবার করার জন্য ব্যস্ত। বাবা বসে শহরের যানজট নিয়ে কথা বলছেন। বাবার এক কথা, যে ভাবে পপুলেশন বাড়ছে, বামফ্রন্ট কেন, কোনো সরকারেরই ক্ষমতা নেই সমস্যার সমাধান করতে পারে।
প্রায় যেন অরূপদাই তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। সে যেতেই মেসো বলল, দেন মাই ফেয়ার লেডি, কেমন আছ!
পূর্বা হেসে বলল, ভালো।
— পড়াশোনা কি রকম চলছে?
— ভালো। আসলে পূর্বা এর চেয়ে বেশি জবাব দিতে পারছে না। এবারে মাই ব্লমিং গার্ল না বলে, মাই ফেয়ার লেডি বলছে। সে কেমন নিজের মধ্যে অতর্কিতে ড্রাম পেটানোর শব্দ শুনতে পায়। সে বড় হয়ে গেছে। শাড়ি পরলে বড়ো দেখায়। আর বোধ হয় ঠিক ফ্রক গায় সে আর তাদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। আসলে মেয়েরা শাড়ি পরলে অনেক বড়ো হয়ে যায়। সে প্রায় ছুটেই বের হয়ে গেল। বলল, আসছি।
