হ্যাঁ বুঝেছি। যাও। ভাল লাগে না শুনবে না। তোমাকে কে শুনতে বলেছে! জোর করে পূর্বা সুইচ টিপে দিলে অরূপদা ফের ওটা আল্পা করে দেবেই। সে যতবার দেবে ততবার। তখন দুজনেরই গলা সপ্তমে। মাসি দেখ অরূপদা আমার সঙ্গে কী করছে!
ডাইনিং টেবিলে দুই বন্ধুতে ছেলেবেলার গল্পে মশগুল–মাঝে মাঝেই পূর্বার ঘর থেকে হাঁক আসছে—ওরা দু’জনেই চিক্কার করে ওঠে এখন, আবার শুরু হলো শম্ভ-নিশুম্ভ যুদ্ধ।
আমাকে মারছে।
এই অরূপ মারছিস কেন?
না মা, মারছি না। মিছে কথা বলছে। তারপর আরম্ভ হতো দু-জনের মধ্যে রেকর্ড নিয়ে কাড়াকাড়ি-ধস্তাধস্তি।
সে কিছুতেই রেকর্ডটা বাজাতে চাইত না। গানটার মধ্যে কি যেন এক নগ্ন নির্জনতা লুকিয়ে আছে। অরূপদাটা যে কী! কিছু বোঝে না! ছেলেমানুষির চুড়ান্ত। পাশের ডাইনিং স্পেসে মা–মাসি, ঘরে সে আর অরূপদা—এমন একটা গান বাজছে শুনলে মা-মাসি কী না মনে করবে। নেভার চেঞ্জ লাভার এট মিড-নাইট। এই মিড-নাইট কথাটাই কেন জানি আজকাল তাকে ভারি হন্ট করে। কতদিন ঘুম আসে না। ছটফট করে। কখনো মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেলে আর ঘুম আসতে চায় না। দুবছরে সে বুঝেছে, কেন অরূপদা গানটা এত ভালোবাসে। মধ্যরাতে মানুষের ভিতর এক আশ্চর্য নির্জনতা জেগে ওঠে। বোধ হয় এই বয়সে এটা বেশি হয়। মনে হয় সে এবং কেউ কোনো নদীর ধারে, কিংবা গভীর বনের অভ্যন্তরে হেঁটে চলে যাচ্ছে। সব সবুজ বৃক্ষ, লাল নীল ফুল ফুটে আছে চারপাশে–আবার খড়ের বন, বন পার হলে নদীর চরা—বালিয়াড়ি, দু-পা বালির ভিতর ঢুকিয়ে নদীর জলকল্লোল শুনতে পায়। শরীর তখন তার অবশ হয়ে আসে। অথবা স্বপ্নে সে এমন সব কিছু দেখে ফেলে যা ঘুম ভাঙলে মনে হয় কি যে একটা অসভ্যতা সে করে ফেলেছে। বাবা কি তার চোখ দেখলে, রাতের স্বপ্নের কথাও টের পান। তখন সে কেন জানি বাবার দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারে না। আশ্চর্য এক অপরাধবোধে সে বাবাকে দেখলেই মুখ নিচু করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
বাবা দরজার পাশে এসে বললেন, তুমি তবে যাচ্ছ না।
তোমরা যাও। আমার যেতে ভালো লাগছে না।
বাবা এরপর আর কোনো প্রশ্ন করবেন না সে জানে। মায়ের মতো বলবে না, তোমার কি শরীর খারাপ! জ্বরজ্বালা না হলে বাবা তার শরীর খারাপ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করে না। শরীর খারাপ কথাটা একজন নারীর পক্ষে কত দূরের খবর যে বয়ে আনে বাবা বুঝবে কী করে! যদিও ভারি অস্বস্তি হয় তার তখন। কেবল শুয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়—অথবা র্যাক থেকে গল্পের বই নিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে ইচ্ছে হয়—কেমন এক আলস্য সারা শরীরে জড়িয়ে থাকে তখন। আজ তার সে সবের কিছুই হয়নি। বরং সে আজ একটু বেশি ছিমছাম। এক হপ্তাও হয়নি, সময়টা পার হয়ে গেছে। দু-তিন হপ্তার জন্য নিশ্চিত। সে ইচ্ছে করলে সহজেই বের হয়ে পড়তে পারে।
কিন্তু কেন যে সে বলল, যাবে না, মাথায় কিছুতেই আসছে না। তার খুবই ইচ্ছে করছে, বলে, সে যাবে। কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম বাধা তাকে আটকে রাখছে। কেন এই সংকোচ সে ঠিক বুঝতেও পারছে না। দু-বছরে সে কতটা যে বদলে গেল! আগে সে এতটা ভাবতই না। সবার আগে গিয়ে সেজেগুঁজে বসে থাকত। ফ্রক গায়, বব করা চুল, সাদা মোজা, আর হালকা প্রসাধন মুখে। মেসো গাড়িতে ওঠার সময় তার দিকে তাকিয়ে বলত, ব্লমিং মাই গার্ল। এবারে কী বলত! অরূপদা প্রথম দিকে কেমন একটা আলগাভাব দেখাত। যেন চেনেই না। তারপর দিন যেতে না যেতেই অসুরের মতো উপদ্রব শুরু করে দিত। কোথায় কোনো সিনেমায় কোন নায়ক কীভাবে হাঁটাচলা করে, কিংবা কথা বলে সব নকল করে দেখাত। তারপর মজা করার জন্য বলত, মার দেঙ্গা। কেইসে তুম হো! আর তখনই তার রাগ বাড়ত। একদম হিন্দি বলবে না। তোমার এমন কথা শুনলে আমার বন্ধুরা হাসবে। আসলে পূর্ব বাংলা মিডিয়ামে পড়ে। ইংরেজিটা ভালো আসে না। অরূপদার সব কথাই হয় ইংরেজি না হয় হিন্দিতে। সে বলে দিয়েছে, আড়ি। এ কীরে বাবা, বাংলা বলতে পার না।
পারি। ঘোড়া হোড়া।
আবার ইয়ার্কি হচ্ছে!
আচ্ছা বাবা বাংলাই বলব। তোর এত রাগ কেন বুঝি না!
রাগ আবার কী! ও-ভাবে কথা বললে, কাছের মানুষ তোমরা মনেই হয় না।
কত সহজে সে বলতে পেরেছে অরূপদাকে, কাছের মানুষ! অরূপদার সেই থেকে কেমন একটা অধিকার জন্মে গেছে। মতো তার ঘরে এসে এটা ওটা ধরে টানাটানি করত। তুই আজকাল খুব হালকা নভেল পড়ছিস দেখছি। তারপর হেডলি চেজ থেকে আরম্ভ করে হ্যারল্ড রবিনস, আরভিং ওয়ালেস, এমনকী আরও আধুনিক লেখকদের নাম করে বলত, পড়বি। একটা বই দিয়েছিল অরূপদা, দু পাতা পড়েই শরীর কেমন গোলাচ্ছিল। মেয়েদের এ-সব কথা এ-ভাবে লেখা যায়। নোংরা! তুমি এ-সব পড়ো। ছি!
পড়তে বারণ করছিস!
একদম পড়বে না।
কেন পড়লে কী হয়!
নষ্ট হয়ে যায়।
নষ্ট হওয়াটা কী মজার তুই বুঝিস না।
আমি বুঝি। বুঝিস! আরে ব্বাস, মাই গড, তুই এত বুঝিস জানতামই না।
এবারে তবে জেনে রাখ।
কথাগুলো বলতে হয় বলে বলা। সে এত কিছু ভেবে বলেনি। শুধু বলেছিল, এসব বই পড়লে তুমি নষ্ট হয়ে গেছ ভাবব।
বাবা মাও তো পড়ে।
যা!
সত্যি বলছি।
পূর্বা কেমন অবাক হয়ে যায়। মানুষের কাছে এটা তো এক মুগ্ধ জীবনের প্রকাশ। ভারি গোপন। সবাইকে জানিয়ে দিলে এর সব স্নিগ্ধতা যেন নষ্ট হয়ে যায়। গভীর গোপন এই সৌন্দর্যকে নিয়ে চটকালে ফুলটা বিবর্ণ হয়ে যাবে না! এমনই ভাবে পূর্বা। অরূপদা ভালোবাসে বলেই ‘আবা’র বনি-এমের রেকর্ড কিনে এনেছিল—এই কী বাজাচ্ছিস, আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে। কী গান রে বাবা। চল তোকে আবা’র রেকর্ড কিনে দিচ্ছি। আশ্চর্য মিউজিক। রেকর্ডগুলো এনে বাজাবার সময়, আঙুলে তুড়ি মেরে কেমন গলা মিলিয়ে গাইত। পূর্বার মনে হত অরূপদা বড়ো কম বয়সে অনেক বেশি জেনে গেছে। মাঝে মাঝে রাগ হলে বলত, হঁচড়ে পক্ক।
