আসলে জীবনের এই মাধুর্য কেউ জানে না কখন জেগে ওঠে। রান্নাঘরে এসে সে এটা-ওটা মাকে এগিয়ে দিচ্ছে।
মা অবাক!—কী রে তুই। তোকে এ-সব কে করতে বলল! যা ওদের সঙ্গে গল্প করগে। ওরা কী ভাববে!
অরূপ রান্নাঘরে ঢুকে বলল, আন্টি তোমার মেয়ে পালিয়ে এল কেন?
কী জানি! জিজ্ঞেস করে দ্যাখ, কেন পালিয়ে এল।
আমার ইচ্ছে। বলে সে আবার মাকে কাজে সাহায্য করতে গেলে তার মা কেমন বিরূপ হয়ে উঠল।—সব ভাঙবে। ইস তোমাকে কে বলেছে! কবে ঢুকেছ। মেসোকে গিয়ে বল হাত মুখ ধুয়ে নিতে। ওদের ঘরগুলো দেখ ঠিক আছে কি না!
পূর্বা ঘর হয়ে এল। মা বুঝতেই পারছে না, সবার কাছে সে ধরা পড়ে গেছে। অরূপদার চোখ কি রকমের বন্য, মেসোর চোখে অপার প্রশান্তি, মাসির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার মতো যেন বলা, যাক তবে বড়ো হয়ে গেলি! অরূপদার বন্য চোখ দেখলে সে কেমন অস্থির হয়ে উঠছে। অরূপদার ঘরটায় সব ঠিক আছে কি না–পার্ট করা সাদা চাদর বের করল, বালিশের ওয়াড় পাল্টে দিল, সামান্য ঝুল ছিল কোণায়, নিজেই তা পরিষ্কার করার সময় দেখল অরূপদা হাজির। তাকে অরূপদা এক দণ্ড কোথাও একা থাকতে দিচ্ছে না।
এই।
বল!
এখানে এ-সব কী হচ্ছে!
কী করব।
চল না সেই রেকর্ডটা বাজাই।
কোনটা?
কিস মি, কিস মি।
না।
কেন না।
বললাম তো না।
অরূপ বলল, দেন লেট মি কিস ইয়ু বলে হাত ধরে টানতেই পূর্বা কেমন ক্ষেপে গেল, ছোটোলোক! ইতর!
অরূপ কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। সে মাথা নীচু করে বসে থাকল। পূর্ব ছুটে বের হয়ে গেছে।
পূর্বা নিজের ঘরে এসে কেমন হাঁপাতে থাকল। সে বলতে চায়নি। সে এত ছোটো নয়, তবু কেন যে এমন কুৎসিত ভাবে অরূপদাকে অপমান করল! কী তার হয়েছে! সে তো চায় কোনো কাশবনের গভীরে অরূপদাকে নিয়ে প্রবেশ করতে সে তো চায়, আকাশের নীচে একজন মানুষই তার সর্বস্ব কেড়ে নিক— তবু কেন, সে এ-ভাবে মানুষটার খোলামেলা স্বভাবে আঘাত দিতে গেল। নিজের মধ্যে এত সব বৈপরীত্য কাজ করে কেন! কেন! সে প্রায় বিছানায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল। বালিশে মুখ চাপা দিল। এমন সুন্দর মানুষটাকে অপমান করে এসে বিষের জ্বালায় নিজেই জ্বলছে।
সে-দিনই রাতে প্রথম পূর্বা তার দরজার ছিটকিনি আটকে ঘুমাতে গেল। জীবনে আর একটা নতুন ভয় এবার তার সামনে হাজির। সবাই জেনে গেছে এই বয়সেই বালিকারা নারী হয়ে যায়। আর মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে সে শুনতে পেল সুদুরে সেই মিউজিক বাজছে, আই অ্যাম দ্য সান, ইউ আর দ্য মুন, আই অ্যাম দ্য ওয়ার্ডস, ইউ আর দ্য টিউন। মিউজিক শুনতে শুনতে নারীমহিমায় চোখের জলে ভেসে যাচ্ছিল পূর্বা।– প্লে মি।
কপালি
কপালি থেকে গেল।
কপালির বাপ কালীপদ বলেছিল, বাবু ভালোমানুষ। থাক। মন টিকে গেলে থাকবি। মন খারাপ হলে বাবু চিঠি দেবে, তখন না হয় নিয়ে যাব। থেকে দ্যাখ। পেটভরে খেতে পাবি। জামাকাপড়ের অভাব রাখবে না। তা ছাড়া দেশের মানুষ। অচেনা নয়।
এর আগেও দেশের মানুষের বাড়িতে কপালি যে কাজ না করেছে তা নয়। তবে তার মন টেকে না। দুদিন যেতে না যেতেই বাড়ির জন্য মন খারাপ। বাড়ি বলতে খালপাড়-ভাইবোনগুলির জন্য মন পোড়ে। ভিটেমাটি বলতে কাঠা দু-এক জমি, সরকারের খাস থেকে পাওয়া। ছিল বিগেখানেক–কমতে কমতে কাঠা দু কাঠায় ঠেকেছে। খড়ের চাল, মাটির দেয়াল আর যেদিকে চোখ যায় বনজঙ্গল গাছপালা। খালের জল নদীতে গিয়ে পড়ে। নদী থেকে সমুদ্রে।
নদীর পাড়ে দৌড়ে গেলেই হুহু করে হাওয়া উঠে আসে। কপালি ফাঁক পেলেই দৌড়ে বনজঙ্গল পার হয়ে নদীর ধারে চলে যায়–ও-পার দেখা যায় না, নদীর ঢেউ, ভটভটির শব্দ, নীল খোলামেলা আকাশের নীচে সন্ধ্যা তারা কিংবা দূরের বটগাছ, বটগাছের নীচে সাধুবাবার আশ্রম—মেলার সময় কী ভিড়, কী ভিড়!
তার মধ্যে আছে এক প্রকৃতির সুষমা।
বাপ কালীপদ এটা জানে, বোঝে। বনজঙ্গল পার হলেই নদী, ঘরের পাশে খাল, আদিগন্ত মাঠ সামনে—ফসলের দিনে সবুজ গন্ধে বাড়িটা ডুবে থাকে।
বৃষ্টির দিনে কাঠকুটো পাঁজাকোলে করে নিয়ে আসে। ভিজা কাঠে ধোঁয়া। বারান্দায় ভুখা ভাইবোনগুলির জন্য কপালি একদণ্ড বসে থাকে না। মা নেই—সে নামেই বাপ। বাপের কাজ তো কিছুই করতে পারে না। রায়মশায়দের বড়ো শরিকের ছোটোবাবুর পুত্র শহরে থাকে। বিদ্যার জাহাজ। তবে সংসারে শান্তি নেই। রোগভোগে বাবুর পরিবার জেরবার। সে দায়ে, অদায়ে ছোটোবাবুর কাছে যায়। তিনিই বলেছিলেন, বৌমা ছেলেপুলে নিয়ে পারে না। বিশ্বাসী লোকজনের খোঁজ পাসতো জানাবি।
বাবুতো জানে না, কপালি বড়ো হয়ে গেছে। বাবুতো জানে না, কপালি দু-দুবার শহরে কাজ করতে গিয়ে টিকতে পারেনি। একাই একবার চলে এসেছিল। রাস্তাখান তো সোজা না। শ্যামবাজার থেকে বাস। বাসে বারাসাত। আবার বাস। বাসে মহেশখালি। মহেশখালি থেকে ভটভটিতে পা কা দু-ঘণ্টা। তারপর ঘাট থেকে নেমে টানা এক ক্রোশ পথ। সকালে বের হলে গাঁয়ে পৌঁছাতে সাঁজ লেগে যায়। বড়োই দুর্গম অঞ্চল। শাকপাতা, বন আলু, খালে বিলে মাছ আর নদী ধরে যায় হাঁড়ি পাতিলের নৌকা। কপালির নেশা—ওই হাঁড়ি পাতিলের নৌকা দেখা। ঘাটে যদি ভিড়ে যায়—টাকা পাঁচসিকেয় সে যা পারে কিনে আনে। শহরে টাকা ওড়ে কালীপদ জানে। সে নিজেও শহরে গিয়ে সুখ পায় না। কপালি চলে এলে কোনো ধন্দ থাকে না। বনজঙ্গলের নেশা। সহজে কাটবার নয়। বাবুরা বুঝিয়েও রাখতে পারেনি। সে কান্নাকাটি করলে রাখেই বা কী করে? দেশগাঁয়ের লোক পেলে পাঠিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায়ও থাকে না।
