তার ভাবতে লজ্জা লাগছিল।
বাবা এ-সব জানবেন কী করে!
মা জানতে পারে। মার কাছে তার এখনকার পৃথিবীটা পুরোনো পৃথিবী।
কিন্তু বাবা!
সে কেমন তাড়াতাড়ি গা ঢেকে ফেলল। চাদর মুড়ি দিয়ে অলস চোখে বাগানের ফুল ফোঁটা দেখছিল।
সে ভাবল, ফুল ফোটে।
সে ভাবল, তার এখন ফোঁটার বয়স।
সে জানালায় দাঁড়িয়ে গাছপালার ফাঁকে সূর্য ওঠা দেখল। কত সব পাখি উড়ে যাচ্ছে দূরের আকাশে। সবাই বের হয়ে পড়েছে। সে টের পায় সুদূরের সব সৌন্দর্য এখন তার সারা গায়ে শীত হয়ে জড়িয়ে আছে। সে ভিতরে ভিতরে আজ ভারি শীত অনুভব করল।
বাবা সকাল আটটায় বের হয়ে যান।
বাবা বোধহয় বাথরুমে। ঘড়িতে সে দেখল সত্যি বেলা হয়ে গেছে। সাতটা বাজে। শীতের সকালে সাতটা খুব বেলা নয়। তবু বাড়িতে সকালের দিকে খুব তাড়াহুড়ো থাকে। বাবা বের না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এটা চলে। সে দরজা ভেজিয়ে দেয়, দরজা বন্ধ করে শুতে তার কেমন এখনো ভয় লাগে। বাড়িতে সে মা বাবা, আর দুজন কাজের লোক। ওরা রান্নাঘরের ওদিকটার থাকে। সবার আগে ঘুম ভাঙে মার। মারই কাজ সবাইকে ডেকেডুকে তোলা। করিডোরে হাঁটাহাঁটির শব্দ হলেই তার ঘুম ভেঙে যায়। মার ডাকাডাকিতেও ঘুম ভাঙে। তাদের দিকটার কোলাপসিবল গেট। রাতে শোবার সময় মা সেটা বন্ধ করে দেয়। কারণ বাবা-মা কেউ বোধ হয় কাজের লোক দুজনকে বিশ্বাস করে না। মেয়ে বড়ো হয়ে উঠছে, না চোর বাটপাড়ের ভয় কোনটা, সে বোঝে না। সুদামদা নিরীহ গোবেচারা মানুষ, আর নন্দ তো বুড়ো হয়ে গেছে। কতকাল হল আছে!
আজ নিনি মাসিরা আসবে। শীতের সময় নিনি মাসি, মেলোমশাই, অরূপদা এখানে একবার বেড়াতে আসেন। ফুল ফোঁটা দেখার সময় এ-কথাটা মনে হতেই ভেতরে সে কেমন চঞ্চল হয়ে উঠল। এমন চাঞ্চল্য সে কেন জানি কোনোদিন অনুভব করেনি! তার হাই উঠছিল।
আসলে বড়ো হবার সময় কত অকারণে মনের মধ্যে নিশিদিন কি যেন এক রপকথার জগৎ ভেসে থাকে। অরূপদার ভারি ফাজিল স্বভাব। মাথায় গাঁট্টা মেয়ে কথা বলবে। বছর খানেকের বড়ো। তবু যেন তার কত খবরদারি।-এই পূর্বা, আবার জানালায় মুখ বাড়াচ্ছিস!
গাড়িতে যাবার সময় বাবা মেসো সামনে। সে মাসি অরূপদা আর মা পেছনে। সব সময় সে জানলার পাশে বসতে ভালোবাসে। অরূপদা তার সঙ্গে। সে দশ ক্লাশে উঠেছে। এবার। অরূপদার দশ ক্লাস শেষ। অথচ খবরদারিতে একেবারে বাবা মেসোর মতো!
আবার!
পূর্বা জানালার কাচ নামিয়ে মুখ বাড়িয়ে চারপাশের বাড়িঘর গাছপালা দেখতে ভালোবাসে। হু হু করে হাওয়া বয়। চুল ওড়ে, যেন এক ড্যাং ড্যাং বাজনা শুরু হয় ভিতরে। আর তখনই অরূপদার শাসনের গলা, ইস আবার!
চার পাশে তখন রা রা করে যেন বাজনা বাজতে থাকে আবার মিউজিক–ক্যান ইউ হিয়ার দ্য ড্রামস ফারনানডেজ। ওর তখন চোখ বুজে আসে। আবার কানে ভাসতে থাকে সেই অলৌকিক জগতের বাজনা-কিংবা সংগীত-সিনস মেনি ইয়ারস আই হ্যাভেন্ট সিন ইউ লাইং ফোল্ডিং ইউর হ্যাণ্ডস। অথবা নিল ডায়মন্ডের সেই সব সঙ্গীতমালা, ইউ আর দ্য সান, আই অ্যাম দ্য মুন, ইউ আর দ্য ওয়ার্ডস, আই অ্যাম দ্য টিউন। প্লে মি।
আসলে বাবা কী বুঝতে পারেন, এই খেলা তার জীবনে শুরু হয়ে গেছে। নতুবা আয়নায় এবার মুখ দেখে কেন! বাথরুমে ঢুকলে বের হতে ইচ্ছে হয় না। আয়নায় সে কত ভাবে যে নিজেকে এই বছর দুইয়ের মধ্যে আবিষ্কার করে ফেলেছে। সারা শরীর দেখার মধ্যে আশ্চর্য এক মজা পায়। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে আয়নার সামনে ভালোবাসে। বাবা কি টের পেয়ে গেছেন কেউ তার জীবনে সকালের সব পবিত্রতা নিয়ে জেগে উঠছে। ঠিক সূর্যের মতো। যেন লালা আভা, দিগন্তবিস্তৃত শস্যক্ষেত্র, কীটপতঙ্গের আওয়াজ, ঝাঁকে ঝাঁকে নিরন্তর পাখিদের ওড়াউড়ি কোন এক সুদূরের জগতে নিয়ে চলে যায় বাবা কি সকালে মুখ দেখলেই এ-সব টের পান। এবারে সরস্বতী পূজার সময় বাবা না হলে তার জন্য হলুদ পাড়ের সাদা জমিনের শাড়ি কিনে আনলেন কেন! বললেন কেন, পূর্বা তুমি এই শাড়িটা পরে অঞ্জলি দেবে!
তখনই মার গলা পেল।
— কীরে এয়ারপোর্টে যাবি নাকি!
পূর্বার মনে হল মাসিদের আনার জন্য এয়ারপোর্টে গাড়ি যাবে। সব বারই সে মা-বাবার সঙ্গে যায়। নিনি মাসি মার বোন নয়। ছেলেবেলায় একসঙ্গে মানুষ, মার তো আর কেউ নেই। তার একটা মামা পর্যন্ত নেই। নিনি মাসিকেও দেখে বোঝা যাবে না, কথায়-বার্তায় এমনকী ব্যবহারে, নিজের বোনের চেয়েও বেশি। বোম্বেতে গেলে ওদের মাসি ছাড়তেই চায় না। যেমন কলকাতায় এসে মাও ছাড়তে চায় না নিনি মাসিকে। কটা দিন বাবার চেম্বার, নাসিংহোম সব কেমন ঢিলেঢালা। কখনও দীঘা, কখনো মুর্শিদাবাদ, আবার কখনো পিকনিক করতে চিড়িয়াখানায়। নানা রকম প্রোগ্রামে দিনগুলি ঠাসা থাকে।
কেন জানি সে বলল, আমি যাব না মা। তোমরা যাও।
মার কথা বলার সময় নেই। বাবার ঘরে উঁকি দিয়ে বলে গেল পূর্বা যাচ্ছে না। শরীরটা বোধ হয় ভালো নেই।
শরীর ভালো নেই বললেই বাবা সব বোঝেন। তখন আর কেউ তাকে পীড়াপীড়ি করতে সাহস পায় না।
এই শরীর ভালো না থাকার মধ্যেও সে দেখেছে বাবা মজা পান। সে যে গিয়ে বলবে, ধূস, তোমরা যে কী না, আমার শরীর ভালো নেই কে বলল! এমনি যেতে ইচ্ছে করছে না। দু-বছরে সে কত বড় হয়ে গেছে বাবা-মা বুঝবে কী করে। এই তো সেবারে অরূপদারা এল, তার ঘরে অরূপদা সব কিছু নিয়ে টানাটানি করত। তার ছবির খাতা, অ্যালবাম, ক্যাসেট, রেকর্ডপ্লেয়ার যা কিছু সবই হাঁটকাত। এটা না, ওটা। কী কেবল ‘আবা’র রেকর্ড দিচ্ছিস। বনি-এমে’র রেকর্ড দে না শুনি। সেই গানটা বাই দ্য বিভারস অব ব্যাবিলন, অথবা সেই রেকর্ডটা, নেভার চেঞ্জ লাভার এট মিড-নাইট। কেন যে এ গানটা এত ভালোবাসত অরূপদা। না দিলে কাড়াকাড়ি শুরু করে দিত। অরূপদা রেকর্ডটা বাজাবেই। সে কিছুতেই দেবে না— কী বিশ্রী গান! না ওটা না। এটা শোন, আবার সেই রেকর্ড দিলে, অরূপদা সুইচ অফ করে দিত। এটা তোর খুব ভালো গান, না! ইউ আর দ্য ওয়ার্ডস, আই অ্যাম দ্য টিউন! এই একটাই বুঝেছিস!
