সুমি বলল, ‘দাদু তুই ইতর হয়েছিস?’ বলে হাতটা তুলে দিতেই দেখল, ফকিরচাঁদের চোখ যেন ঘোলা ঘোলা-ফকিরচাঁদ যেন মরে যাচ্ছে।
সে চিৎকার করে উঠল ‘দাদু! দাদু! ফকিরচাঁদ ঈষৎ চোখ মেলে ফের চোখ বুজতে চাইল। সুমি তাড়াতাড়ি একটু আশ্রয়ের জন্য হোক অথবা ভীতির জন্য তোক উঠে পড়ল। বৃষ্টি মাথায় একটু আশ্রয়ের জন্য দোকানে দোকানে এবং ফুটপাতের সর্বত্র এমনকী গলিঘুজির সন্ধানে সে ছুটে ছুটে বেড়াল। বৃষ্টি ক্রমশ বাড়ছে। ফুটপাথে ফের জল উঠতে আরম্ভ করেছে। আর অধিক রাতে সুমি যখন ফিরল, যখন ফের তলপেটে ঈশ্বর কামড়ে ধরছে, শরীরটা নুয়ে পড়ছিল, জলের জন্য ভিতরে ভিতরে ঈশ্বর মোচড় দিচ্ছে এবং ট্রাম বাস চলছে না, ইতস্তত দূরে দূরে কিছু ট্যাক্সি কচ্ছপের মতো ভেসে আছে এবং হোটেল রেস্তরাঁর দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কেউ বৃষ্টিতে ভিজে জেগে থাকবার জন্য বসে নেই—সুমির তখন ক্লিষ্ট চেহারা বড়ো করুণ দেখাচ্ছিল। সামনে অপরিচিত অন্ধকার, চার্চের সামনে হেমলক গাছ লোহার রেলিং টপকে গেলে ছোটো ঘর এবং সেখানে কাঠের কফিন মাচানের মতো করে রাখা। হেমলক গাছের বড়ো বড়ো পাতার ভিতর জলের শব্দ আর সামনে সব কবরভূমি—চার্চের ভিতর কোনো আলো জ্বলছে না…সুমি নিঃশব্দে লোহার রেলিং টপকে কফিনের ভিতর শুয়ে সন্তান প্রসবের কথা ভাবতেই ফকিরচাঁদের কথা মনে হল—আবার এই পথ এবং জলের শব্দ, সুমি ফুটপাথের জল ভেঙে ফকিরচাঁদকে আনার জন্য ধীরে ধীরে রাজবাড়ির সদর দরজার ঝোলানো এক হাত গণ্ডারের ছবির নীচে দাঁড়াল। ওর অদ্ভুত এক কান্না উঠে আসছে ভিতর থেকে। জন্মের পর এই বৃদ্ধকে সে দেখেছে আর সেই মোষের মতো পুরুষটা যাকে সে তার ভালোবাসা দিতে চেয়েছিল, যে চুন গোলা জল ফেলে ঘুঘু পাখিদের উড়িয়ে দিয়েছে…..সদর দরজায় এক হাত গণ্ডারের ছবির নীচে দাঁড়িয়ে সুমি কাঁদতে থাকল। বৃষ্টির ঘন ফোঁটা, গাছগাছালির অস্পষ্ট ছায়া অথবা সাপ বাঘের ডাকের মতো ব্যাঙের ডাক আর নগরীর দুর্ভেদ্য স্বার্থপরতা সুমির দুঃখকে অসহনীয় করে তুলছে। সুমির শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এমনকী পাগলেরাও এই বৃষ্টিতে বের হচ্ছে না, পুলিশ কোথাও পাহারায় নেই। সুমি এত বড়ো শহরের ভিতর এখন একা এবং একমাত্র সন্তান যে মুখ বের করবার জন্য ভিতরে ভিতরে প্রাণপণ চেষ্টা করছে। তখনই সুমি দেখতে পাচ্ছে পাগল জলের ভিতর হেঁকে হেঁকে যাচ্ছে ‘দু-ঘরের মাঝে অথৈ সমুদ্দুর’। পিছনে পাগলিনি। আজ এই রাতে দুজনের হাতেই লাঠি। লাঠির মাথায় পাখির পালক উড়ছে।
সুমি ফকিরচাঁদের হাত ধরে কফিনের ভিতর ঢুকে প্রসব করার জন্য কাঠের দোকানগুলো অতিক্রম করে গেল। ফকিরচাঁদ দেখল ওদের কাপড়জামা জলে ভিজে সপসপ করছে। শীত সেজন্য ভয়ংকর। ওরা দুজনে প্রথম জামাকাপড় ছেড়ে ফেলল—এখন ফকিরচাঁদই সব করছে। সুমি অতীব দুঃখে এবং বেদনায় একটা খুঁটি ধরে দাঁড়িয়েছিল। ওদের শরীরে কোনো আবরণ ছিল না। মাচানের নীচে সুমি ঢুকে যেতে চাইল। কিন্তু কফিনের ভিতরে কে যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। কে! কে!’ ফকিরচাঁদ চিৎকার করে যুবকের মতো রুখে দাঁড়াল।
কফিনের ডালা খুলে মুখ বের করতেই বুঝল সেই পাগল, পাগলিনি। ওরা আশ্রয়ের জন্য এখানে এসে উঠেছে।
ফকিরচাঁদ বলল, তোরা সকলে মিলে সুমিকে ধর। সুমির বাচ্চা হবে।
ফকিরচাঁদ এবং পাগল হেমলক গাছটার নীচে বসে থাকল। পাগলিনি মায়ের মতো স্নেহ দিয়ে সুমিকে কোলে তুলে চুমু খেল একটা। তারপর কফিনের ভিতর সন্তানের জন্ম হলে পাগলিনি গ্রাম্য প্রথায় তিনবার উলু দিল। সেই শব্দের ঝংকারে মনে হচ্ছিল সমুদ্র কোথাও না কোথাও আপন পথে অগ্রসর হচ্ছে, মনে হচ্ছিল— এই সংসার হাতির অথবা গণ্ডারের ছবির ভিতর কখনো-কখনো লুকিয়ে থাকে। শুধু কোনো সৎ যুবকের সংগ্রাম প্রয়োজন। পাগল হেমলক গাছের নীচে শেষবারের মতো চিৎকার করে উঠল—’কে আসবি আয়, সংক্রান্তির মাদল বাজছে আয়। ফকিরচাঁদ ধূসর অন্ধকারের ভিতর সুন্দর হস্তাক্ষরে শিশুর নতুন নামকরণ করে অদৃশ্য এক জগতের উদ্দেশে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল।
[দু-ঘরের মাঝে অথৈ সমুদ্দুর’ এবং ‘সংক্রান্তির মাদল বাজছে আয়’ কবি বিমল চক্রবর্তীর কবিতা থেকে সংগৃহীত
এখন ফোঁটার সময়
কোনো কোনো দিন কাকে যে কীভাবে মুখর করে তোলে। চারপাশে মনে হয়। ব্যাপ্ত জীবন-আকাশ গভীর নীল, পৃথিবীর অদূরে শুকতারা জ্বলে। দখিনের হাওয়া বয়—মনের মধ্যে কারা কেবল কথা কয়ে যায়—জীবনের চারপাশে অপার এক সৌন্দর্য খেলা করতে থাকে। এরই নাম বোধ হয় জীবনের সুষম্য—কখনো অতর্কিতে সে আসে। আবার গভীর এক রহস্য লোকে সে হারিয়ে যায়।
আজ জানালা খুলতেই পূর্বার এমনটি মনে হল। শীত যাই যাই করেও যাচ্ছে না। বাগানে বড়ো বড়ো ডালিয়া, ক্রিসেন্থিমাম সব ফুটে আছে। শিশির ভেজা। সকাল সকাল তার আজ ঘুম ভেঙে গেছে। এত সকালে তার ওঠার অভ্যাস নেই। মা গায়ের লেপ সরিয়ে না দিলে সে উঠতেই চায় না। সকাল থেকে বাবা ডেকে যান, মা ডেকে যায়, আরে ওঠ। কত ঘুমাবি।
মা বলবে, ঘুম না ছাই। লেপে মাথা ঢেকে শুয়ে আছে। পড়ার ভয়ে উঠছে না।
বাবা বলবেন, উঠে পড়। শুনছিস তো কী বলছে তোর মা।
আসলে পূর্বা জানে বাবা বিশ্বাসই করেন না, সে পড়ার ভয়ে না ওঠার মেয়ে। বাবা কি টের পান, ভোরে জেগে জেগে সে একটা স্বপ্ন দেখে। বাবা না হলে বেসিন থেকে হয়ত মুখ ধুয়ে আসার সময় চোখে পড়ে গেলে মিষ্টি করে হাসেন কেন!
