কীরে কী খবর?
আর খবর! মেঘার কোনও খোঁজ নাই। মেঘা তার বড়ো পুত্র।
বলিস কী!
কী যে করি! ওর মাসির বাড়ি যাব, যদি সেখানে যায়। এবং আরও নানা অছিলায় আমার মাথায় কাঁঠাল ভেঙে যখন টাকাটি তার হস্তগত হয়, তখন আর তাকে দেখে কে! দ্রুত স্নান টান সেরে, তখন তার খাবারও সময় থাকে না, রাস্তায় খেয়ে নেবে বলে, এবং বের হয়।
মায়ের মৃত্যুর জন্যও ধিলু দায়ী এমন মনে হয় আজকাল। লিচু গাছটায় এত লিচু হয়, যে দূর থেকে মনে হয় এক থোকা মেরুন রঙের ফুল হয়ে গাছটা দাঁড়িয়ে আছে। লিচু চুরি যাবে বলে, রাতে মা ঘুমায় না, বার বার উঠে গিয়ে গাছটার নীচে দাঁড়ায়। হাতে লণ্ঠন, লণ্ঠন তুলে দেখারও চেষ্টা করে। হনুমানেরও উৎপাত আছে, তবে মা আসল হনুমানের চেয়ে ধিলুকেই ভয় পায় বেশি। দুপুরে পর্যন্ত ঘুমায় না, গাছতলায় বসে থাকে। জ্যৈষ্ঠ মাস, বৃষ্টি নেই হাওয়া আগুনের মতো গরম এবং যেন লু বয়, যত কষ্টই হোক মা লিচুগাছ পাহারা দেবেই। এবং এই করে গাছতলা থেকে বারান্দায় উঠে চেঁচায়, এক গ্লাস জল দে রুমি। বলে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে, রুমি জল নিয়ে এসে দেখে ঠাম্মা, কাত হয়ে পড়ে আছে। কোনো হুস নেই মার। তাঁর আর হুস ফিরেও আসেনি। মা বোধহয় বুঝেছিলেন, যে কটা টাকা পাওয়া যায় লিচু বিক্রি করে, রুমির পাশ-বুকে রেখে দেবেন। মা যে আমার রুমি-অন্ত প্রাণ। রুমির বিয়ে না হোক, তার নামে ব্যাঙ্কে অনেক টাকা জমা রাখার স্বপ্ন দেখতেন মা। সেই স্বপ্নও আমার মা-র শেষ হয়ে গেল।
তারপর যা হয় বাড়িটা আবার আত্মীয়স্বজনে ভরে যায়।
মাটির আটচালা ঘরটির তক্তপোশে শুয়ে কত কথা যে ভাবি, এই মা, আর আমরা তার এই পুত্র। কষ্ট হয়—মায়ের কাজ-কামও ঘটা করে করতে হয়, কারণ তিনি যে বিলুঠাকুরণের মা।
আটচালা টিনের ঘরটাতে গেলেই থাকি। একবার গিয়ে দেখি বড়ো তক্তপোশটা নেই।
ধিলু বলল, বড়ো তক্তপোশটা দুই ভাই ভাগ করে কেটে তাদের ঘরে তুলে নিয়ে গেছে।
কী আর বলি! তবে ছোটো তক্তপোশটা আছে। গেলে সেখানেই শুই। সে ঘরেই থাকি চাল ডাল তেল নুন এক মাসের মতো ধিলুকে কিনে দিই। সকালে ভালমন্দ বাজারও করি। দুবেলা ধিলুর বউই রান্না করে খাওয়ায়। বাড়িতে গাছ বলতে আর বিশেষ কিছু নেই, শুধু জঙ্গল, নারকেল গাছ দুটো শুধু আছে।
নিরানব্বই সালের বন্যায় আমার প্রিয় সেই টিনের আধচালা ঘরটির খুব ক্ষতি হয়। ধিলুর ঘরটিরই বেশি ক্ষতি হবার কথা। নীচু জমিতে তার ঘর। অথচ ধিলুর ফোন পেলাম, সে জানাল, মাটির দেয়াল ফেটে একটা দিক ধসে গেছে। বড়োই ফাঁপড়ে পড়ে গেলাম, ঘরটি মেরামত না হলে বাড়িতে গিয়ে থাকার আর কোনো সুযোগ থাকবে না। বাবা-মা এবং আমরা থেকেছি, সব ভাইবোনেরা এই ঘরটায় বড়ো হয়েছি। এই ঘরেই বাবার মৃত্যু হয়েছে, মাও গত হয়েছেন এই ঘরে। এ তো ঘর নয়, আমার পরমায়ুর প্রাসাদ—ইট গেঁথে পাকা করারও সুযোগ নেই কারণ মাটির ঘরের সৌন্দর্য পাকা বাড়িতে থাকে না। বাবা কিংবা মায়ের কারও ইচ্ছাই ছিল না ঘরটি পাকা হোক।
এই ঘরের মেরামত উপলক্ষেও ধিলু যথেষ্ট টাকাপয়সা নিয়ে গেছে। আশায় আছি, ঘরটি থাকার উপযুক্ত হয়ে ধিলু ফোন করে জানাবে। বাড়ির পাশেই এস টি ডি বুথ থেকে আজকাল সবাই ফোন করে থাকে। আমার বোন বিনি জানাল, দাদা তুই আর টাকা দিস না। তুইও ফতুর হয়ে যাবি।
সত্যি তো দু-তিন মাস হয়ে গেল, নিজের চোখেই একবার দেখে আসা যাক। গিয়ে দেখি ঘরটা আছে। তবে দেয়াল মেরামত হয়নি। ছোট্ট তক্তপোশটাও হাওয়া।
বললাম, মেঝেতেই থাকা যাবে। তোর দুই ছেলে তো এ ঘরে থাকে বলেছিলি।
ধিলুর মুখ করুণ।
ধিলুর বড়ো পুত্র মেঘা বলল, তুমি থাকবে। এই সে দিন একটা এত্ত বড়ো মোটা চিতি ফুলগাছটা থেকে লাফিয়ে পড়ল টিনের চালে। ভয়ে আর আমরা ঘরটায় শুই না।
ধিলু বলল, ঘরে বাড়ির সেই বাস্তু সাপটা আশ্রয় নিয়ে আছে। রাত-বিরেতে পা পড়লে–
পিলু এসে বলল, দাদা, তুই আমার বাড়ি চল। এ ঘরে থাকা ঠিক হবে না। মেঝেতে শুবি কী করে!
ঘরে ঢুকে দেখলাম, দেয়ালের দুরবস্থা। টিনের চাল একদিকে কাত হয়ে আছে।
ঘরটায় আমি থাকলে দখল-স্বত্ব থাকত। ধিলু ঠিক পরিকল্পনামাফিক আমাকে উৎখাত করছে। সব বুঝি। কিন্তু ধিলুকে দেখে আমার কষ্টই হল, সেই লুঙ্গি-পরা বাসি দাঁড়ি গালে।
ধিলু বলল দাদা তুই আমার বারান্দায় থাক। কোনো অসুবিধা হবে না। আমার বাড়িতে লাইট এসেছে। তোর অসুবিধা হবে না। ধিলুর বউ মেয়ে খুব আদর যত্নের মধ্যেই রাখল। খেতে বসলে বউমা বলল, আপনার ভাইঝির বিয়ের কী করবেন। আপনি মাথা না পাতলে আমাদের সাধ্য আছে বিয়ে দিই। নগদই আঠারো হাজার টাকা চায়— তারপর দানসামগ্রী। তা ছাড়া ধিলু বাইরে ডেকে বলল, দাদা বংশের মান সম্মান আর থাকবে না। তোর ভাইঝি এস টি ডি-র ছোকরাটার সঙ্গে পালাবার ধান্দা করছে। আমাকে রক্ষা কর দাদা।
মনে মনে ভাবলাম, এরা আমাকে কী পেয়েছে। আমি পাগল, না ভাইদের উপসারী একজন দানব। আমারও তো সংসার আছে। যদিও আমার পুত্ররা কৃতী তবু কেন যে মনে হল কোনো ছলনা আমাকে গ্রাস করছে।
ন্যাড়া আর বেলতলায় যায়!
বিনি আমাকে ফোনে জানাল, খবরদার দাদা, টাকা দিবি না। তার আগে জমি বন্টননামা করে নে। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেলে, ধিলু তোদের কিন্তু জমির দখল দেবে না। বাড়িতে ঢুকতে দেবে না।
