মৎস্যমুখ হয়ে যাওয়ার পর স্ত্রী-পুত্রদের নিয়ে কলকাতার ফিরব। বড়ো পুত্রের বারো ক্লাসের রেজাল্ট বের হবে পরদিনই বড়ো মাটির ঘরটায় তক্তপোশে বসে আছি। মা কেমন ব্যাজার মুখ করে বলল, আমাকে আলাদা ক-টা টাকা দিয়ে যাস বাবা। স্টোভ না কিনলে আমার রান্না হবে কীসে। মন আমার আরও খারাপ হয়ে গেল। বাড়ির টানে বাড়ি ফিরব ঠিক, তবে বারন্দার চেয়ারে বাবা বসে তামাক খাচ্ছেন, এই দৃশ্যটি আর চোখে পড়বে না। কেন যে চোখে জল এসে গেল। বড় বিষণ্ণ হয়ে গেলাম—বাইরে বের হয়ে অবাক, গাছের একটি পাতাও নড়ছে না। কেমন চার–পাশ এবং গাছপালা সহ সমস্ত প্রাণীজগৎ যেন স্তব্ধ হয়ে আছে।
আসলে আমি বিষণ্ণতার শিকার এবং কোথাও যেন প্রাণের লক্ষণ খুঁজে পাচ্ছি না।
পিলুকে ডেকে পাঠালাম।
ধিলুকেও।
শোনো, আমার মা থাকল, রুমি থাকল। এদের তোমরা দেখো। অযথা ঝগড়া করবে না। অসুবিধে হলে আমাকে জানাবে। এই যে গাছপালা বাবা লাগিয়ে গেছেন, এখন সব মহাবৃক্ষ, আম, জাম নারকেল গাছ কী নেই। নারকেল গাছ দুটো এই সে দিন বাবা লাগালেন। পঁচিশ-ত্রিশ বছর ধরে বাবা এই গাছগুলির সঙ্গেই কথা বলেছেন, তোমাদের আচরণে তিনি তোমাদের প্রতি বিশেষ সন্তুষ্ট ছিলেন না, মা চোপা করলে, বাবার এককথা, এই যে গাছ লাগিয়ে গেলাম—এরাই তোমাকে দেখবে। পুত্র না মূত্র বলে তিনি আমাদের অবজ্ঞাও করতেন। যাহোক, তোমরা গাছের কিছু ধরবে না। জমিজমা যেটুকু আছে, সবই মা ভোগ করবেন।
যেহেতু ধিলু পিলুর সুবিধা-অসুবিধায় আমি আছি, তারা সুবোধ বালকের মতো বলল, তুই যা বলবি তাই হবে।
ধিলু বলল, জমি ভাগ হবে না?
না। মা যদ্দিন আছেন, এ-বাড়ির, মাসির বাড়ির কোনো জমিই ভাগ হবে না। মা যত দিন বেঁচে আছেন, তাঁর ইচ্ছে মতো জমি ভোগ করবেন। ফলপাকুড় যা তিনি তোমাদের হাতে ধরে দেবেন তাই নেবে।
তুই যা বলবি, তাই হবে।
সেই এক কথা–একেবারে একান্ত বশংবদ। ঘাড় তুলতে বললে তুলবে, ঘাড় নামাতে বললে নামাবে।
মাকে নিয়ে মুশকিল হচ্ছে, তিনি কারও ওপর প্রীত থাকলে, দু-হাত উজার করে তাকে সব দিয়ে দিতেন। রুমি আর ধিলুর বউ দুজনেরই আচরণ সাপ আর নেউলের মতো। গাছের আম জাম জামরুল, প্রতিবেশীদের ডেকে দেবেন, কিন্তু ধিলুর বউকে দেবেন না। তার ছেলেমেয়েরা গাছতলায় ঘুরে বেড়ালেও রক্ষা থাকত না।—গাছতলায় ক্যারে।
অবশ্য আমার মা কখন কার পক্ষ নেবে বলাও মুশকিল মা কীভাবে যে কার অনুগত হয়ে যান তাও বোঝা যায় না। ধিলু এক সকালে কলকাতার বাসায় এসে হাজির। মা তাকে চিঠি লিখে দিয়েছেন, আমাকে দিতে। চিঠিতে দেখি গাছ বিক্রির কথা আছে। ধিলুব খুব অভাব। আতপ চাল রাখার অজুহাতে পুলিশ তার দোকান সিজ করে দিয়েছে। তার ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। থানা, পুলিশ, আদালত, সামলাতে অনেক টাকার দরকার।
লাইসেন্স না থাকলে দোকানে চাল রাখা যায় না। ধিলুর দোকান থেকে প্রায় আট কুইন্টাল চাল পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে। দোকানও বন্ধ করে দিয়ে গেছে, এখন বাড়ির বাবার লাগানো গাছই একমাত্র তাকে রক্ষা করতে পারে। গাছই ভরসা।
মামলা কত দিন চলবে উকিলও বলতে পারল না পুলিশে ছুলে আঠারো ঘা বুঝি, এই খরচ চালানো আমার পক্ষেও কঠিন, বললাম, তোরা যা ভালো বুঝিস করবি।
গাছ কাটা শুরু হয়ে গেল। আমারও ধিলুর জন্য দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকল। আমিই বা কতকাল টানব।
ধিলু দুটো বিশাল আমগাছ বিক্রি করে আপাতত শান্ত আছে। মাঝে মাঝে সে আমার বাসায় এসে বাড়ির খবর জানিয়ে যায়, হেমন্ত উকিলের ফিজ বাবদ টাকাও নিয়ে যায়—আর আমার এত অনুগত যে সে তার লেবুগাছ থেকে কিছু কাগজি লেবু নিয়ে এলেই নীরা খুশি, বাড়ির গাছের লেবু, এতেই নীরা ধন্য।
ধিলু এলেই এক কথা, জানিস দাদা মা কাঁঠাল গাছ দুটো বিক্রি করে দিয়েছে, দিদির পরামর্শে এ সব করে মা, সব টাকা রুমির নামে পাশবুকে রাখছে। আমার মেয়েটাও বড়ো হচ্ছে—আমি যাব কার কাছে! এভাবে কখনো মা, কখনো ধিলু, কখনো পিলু, আপদে বিপদে গাছই যে ভরসা—গাছ কাটতে অনুমতি না দিলে দায়টা যে আমার ঘাড়ে চাপবে বুঝি। নীরাও বোঝে, ওর এক কথা, যা খুশি করুক।
তবে যা খুশি করলেই তো হয় না। বাড়ি যাই, বাবার ঘরটায় থাকি, গাছপালা কাটা হয়ে গেলে কী যে শূন্যতা সৃষ্টি হয় কেউ বোঝেই না। অজুহাতেরও শেষ নেই। ধিলু বড়ো রাস্তার ধারে বাড়ির সামনের দিকটার আছে—সে নতুন করে গাছ লাগাচ্ছে সামনের দিকটায়। মা বলল, তুই ধিলুকে গাছ লাগাতে দিস না। আমিও বুঝি, জমি দখলের চেষ্টা, বাধ্য হয়ে বললাম, জমি বন্টন নামা হয়নি, গাছ লাগাচ্ছিস তুই!
ধিলুর একেবারে দরাজ প্রাণ, জমি খালি আছে, লাগিয়ে দিচ্ছি। বন্টননামা হলে যার যার জায়গা সেই পাবে। গাছ তো কাটলে বাধা দিতে যাবে না।
অকাট্য যুক্তি। আমার বাবাও গাছ লাগাতে ভালোবাসতেন। ধিলুও গাছ লাগাতে ভালোবাসে। আমি শুধু বললাম, তুই লাগাচ্ছিস ভালো। পরে এই নিয়ে যেন ঝামেলা না হয়।
না না। তুই যা বলবি তাই হবে।
মামলা করতে গিয়েই আদালতের উকিল মুহুরিদের সঙ্গে চেনা জানা হয়ে গেল ধিলুর। সে আদালত চত্বরে ফলের কারবারিও হয়ে গেল। যে দিনের যে ফল। গরমে ডাব, শীতে আঙুর, আপেল বেদানা নেসপাতিও বিক্রি করে। আম, লিচু, কাঁঠালের সময়, লিচু বিক্রি করে, আম বিক্রি করে। বাড়ির গাছের একটা ফল থাকে না। মা শাপ-শাপান্ত করে, তোর সর্বনাশ হবে রে, তুই নির্বংশ হয়ে যাবি। রাতে আমার গাছ কে ফাঁকা করে দেয় বুঝি না! মা গেলেই নালিশ দেবে, তুই অরে কিছু বলবি না। আসলে ধিলু পিলু আমার পায়ে পায়ে বড়ো হয়েছে, ধিলুর অভাব সে দূর না করতে পারলে আমার সাধ্য কী দূর করি! ছ্যাঁচড়ামি করে যে পেট ভরে না, কলকাতার বাসায় এলে তাও টের পাই। চোখ মুখ শুকনো, যেমন সত্যি চোরের মতো চেহারা হয়ে গেছে—বাসায় ঢুকেই নীচের ঘরের খাটে লম্বা হয়ে যাবে, কথা বলবে না, স্নান করতে যাবে না, জোর করে যেন তাকে স্নানে পাঠানো হয়, খেতে বসানো হয়, রান্নার মেয়েটা পিছু লেগে থাকে। বাড়িতে যে তার স্ত্রীর সঙ্গে অশান্তি হয়, ঠিক মতো টাকা না পাঠালে আমাকে আত্মহত্যারও হুমকি দেয়। ধিলু আমার বাড়িতে এসে যদি কিছু করে বসে, এই এক আতঙ্কও কাজ করে। স্ত্রীর স্কুল, আমার অফিস, বউমাদেরও কলেজ না হয় হাসপাতলে ডিউটি, কাজের লোকরাই সব দেখে, রান্নার মেয়ে প্রভারই দায়—সে বার বার তাগাদা দেবে, যান কাকা, স্নানে যান, খাবেন কখন, খেতে বসুন, এবং সে খায় আবার শুয়ে থাকে, বাড়ি ফিরলে দেখি নীচের ঘরের খাটে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। আমি জানি যে অভিপ্রায়ে এসেছে, তা না মেটা পর্যন্ত স্বাভাবিক হবে না।
