পরদিনই চলে এলাম। আসার আগে সারা বাড়ির কোথায় কী গাছ ছিল মনে করার চেষ্টা করলাম। এক জীবনে একটা বাড়ি ছারখার হয়ে যেতে পারে, আমাদের সেই টিনের আটচালা ঘরটি না দেখলে অনুমান করাই কঠিন। রাস্তায় রিকশায় তুলে দেবার সময়ে ধিলু বলল, দাদা তুই পঁচিশ হাজার টাকা দিলেই হবে। আর তোর কাছে আমি কোনো দিন টাকা চাইব না।
কোনো কথা না বলে রওনা হয়ে রাতের দিকে বাড়ি ফিরে এলাম। অবাক, এসে দেখি ধিল আমার আগেই কীভাবে বাসায় পৌঁছে গেছে। সে আমার ছোটো পুত্রকে রাজি করিয়েও ফেলেছে। আর ছোটো পুত্রের কথা কখনোই আমি অগ্রাহ্য করি না। তবু কোথায় যেন এক প্রতারকের পাল্লায় পড়ে গেছি এমন মনে হল আমার।
মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরই, পিলুকে ধিলু শাসিয়ে গেছে, যে বাড়ি ঢুকবে দখল নিতে লাশ ফেলে দেব। আমাকেও সে ফোনে একই হুমকি দিয়েছে।
জমির দর বাড়ছে। ত্রিশ হাজার টাকা কাঠা। তিন বিঘা জমির দু-বিঘে তার, আর এক বিঘে আমরা ইচ্ছে করলে পাঁচ ভাইবোন নিতে পারি। সেই পিতার প্রকৃত অধিকারী তার দাবি। সবাই উড়ে গেছে, সেই একমাত্র এই বাড়িতে বসবাস করছে। তা ছাড়া জমি, আমার বাবার অনুমতি দখল, বলতে গেলে খাস জমি—সে, তার দুই পুত্র এবং কন্যা মিলে পাঁচ কাঠা করে কুড়ি কাঠা জমির আইনত উত্তরাধিকারী—তারা এখানে বাড়ি করে আছে। কে হঠায়!
ছোটো পুত্র শুধু বলল, একবার দেশ থেকে উচ্ছেদ, দ্বিতীয়বার পিতৃভূমি থেকে উচ্ছেদ। ভালোই হল।
সারা জীবন দাদার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার চেয়ে এ যে এক আশ্চর্য মুক্তি, আমার তা কে বোঝে!
উষ্ণতার ঐশ্বর্য
প্রকাশকরাও কম বড়ো মাপের মানুষ নয়—
শ্রাবণীর এমন বলায় নরেন্দু কিছুক্ষণ পুঁদ হয়ে বসে ছিল। শ্রাবণী মাসে-দুমাসে অন্তত এক-দু-বার তার দোকানে ঢুঁ মারবেই।
বই-এর খোঁজে আসে নতুন পুরোন। আজকাল প্রবন্ধ, সমালোচনা লেখার লেখকই মেলে না। উপন্যাসের কালান্তর বইটি খুঁজতে এসেই প্রথম তার আলাপ নবেন্দুর সঙ্গে।
শ্রাবণী বইটির পৃষ্ঠা উলটে দেখার সময় বলেছিল, আপনাদের এ-রকম আর কী বই আছে?
নবেন্দু তাদের একটি পুস্তক-তালিকা দিয়ে বলেছিল, দেখুন আপনার পছন্দমতো আর কোনও বই পান কি না।
শ্রাবণী প্রবন্ধের তালিকাটি দেখে তাজ্জব। এত বই। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটোগল্পের উপর সমালোচনার বইটি দেখতে চাইলে বলেছিল, ওটা নেই। আউট অব প্রিন্ট।
আউট অব প্রিন্ট!
আজ্ঞে। ছাপতে গেছে।
তা হলে আবার এলে পাব।
তা বলতে পারি না।
মানে!
মানে ওই একটাই। কালই যদি আসেন পাবেন না। দেরি হবে ছাপতে। কাজেই আবার।
এলেই পাবেন, কথা দিতে পারছি না সেটা কবে কত দিন পরে আসছেন। জানতে পারলে ভালো হয়।
এই সব কথার মধ্যে কিছুটা কৌতুক লুকিয়ে থাকায় শ্রাবণী হেসেছিল।
হাসছেন যে!
শ্রাবণী বলেছিল, আপনার রসবোধ আছে।
সাধারণত কাউন্টার পেরিয়ে ভিতরে ঢোকার অনুমতি থাকে না। শ্রাবণী কাউন্টারে দাঁড়িয়েই তার সঙ্গে যেন কিছুটা মজা ছুড়ে দিয়েছিল।
দেখুন না যদি কোনও স্পয়েলড কপিটপি থাকে।
স্পয়েলড কপি?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
ভিতরে এসে খুঁজে নিন। প্রসন্ন দেশে গেছে—তিনি বলতে পারতেন। থাকলেও আমার পক্ষে খুঁজে বের করা কঠিন। কাল আসুন না।
কাল হবে না।
কেন? কোনও অসুবিধা আছে?
আমি তো পাঁচটার ট্রেন ধরব। ওটাই আমার লাস্ট ট্রেন।
কী ভেবে নবেন্দু বলেছিল, ভিতরে এসে বসুন। সুধীর আসুক। দেখি। পাঁচটা বাজতে অনেক দেরি। কাছেই স্টেশন। ট্রেন ধরতে অসুবিধা হবে না।
নবেন্দু ফের বলল, কোথায় থাকেন?
থাকি তো দূরে, মাঝে মাঝে কলকাতায় এলে কলেজ স্ট্রিটে ঢুঁ মারতে না পারলে পেটের ভাত হজম হয় না।
সুধীর দোকানে ঢুকে দেখেছিল, ছিমছাম লম্বা এবং ভারি সুন্দর একজন যুবতী ভিতরের দিকের চেয়ারে বসে কী একটা বই উলটে পালটে দেখছে।
কোথায় ছিলি এতক্ষণ! একবার বের হলে ফিরতে চাস না।
সুধীর কাঁচুমাচু গলায় বলল, ধীরেনবাবু যে বললেন, বসতে হবে। উপন্যাস সংকলনের কভারের কিছু কাজ বাকি। বসে, করিয়ে নিয়ে এলাম।
উদ্ধার করেছিস। যা চা নিয়ে আয়। আপনি কিছু খাবেন? পাঁচটায় ট্রেন, কখন পৌছবেন? আপনার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসুক।
প্রকাশকরাও কম বড়ো মাপের মানুষ নয় মেয়েটির এমন মন্তব্যে সে কিছুটা সত্যি বিগলিত।
ঘুরে ফিরে একই রকমের ভাঙা। প্র
কাশকরা ঠগ জোচ্চর, বেশি বই ছাপে, গাড়ি-বাড়ি করে, লেখকরা খেতে পায়। প্রাপ্য রয়েলটি ফাঁকি দেবার নানা ধান্দা—কি শ্রাবণীর কাছে প্রকাশকরাও বড়ো মাপের মানুষ রেকর্ডের মতো কানে বাজছিল তার।
প্রকাশকরা অবশ্য সবাই সাধু নয়, শ্রাবণীর জানা উচিত। অসাধু প্রকাশকেরও অভাব নেই। তবে সবাই অসাধু এটাও বলা যায় না। নরেন্দুও এমন ভাবল।
লেখকের দুঃসময়ে প্রকাশকই ভরসা। বিপদে-আপদে ছোটাছুটি যতটা পারা যায়—লেখককে ভারমুক্ত করার ঘটনাও বিরল নয়। কত প্রকাশকের ভালো বই প্রকাশের নেশা হয়ে যায়। পেশার চেয়ে নেশা প্রবল হলে যা হয়, কেউ আবার সর্বস্বান্তও হয়—বই-এর বাজার সব সময়ই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে—বিশেষ করে গল্পউপন্যাসের ক্ষেত্রে বাজার ধরে গেলে পয়সা, সে আর কটা বই!
তার বাবা তো নানা দিক ভেবেই তাঁর দোকান চালু রাখার জন্য গল্প-উপন্যাসের সঙ্গে স্কুল-বইও করতেন। এতে খুব একটা মার নেই। ঠিকমতো বই ধরাতে পারলে দুটো পয়সাও হয়। তবে ভালো গল্প-উপন্যাসের বই না থাকলে প্রকাশক জাতে ওঠে না, তার বাবা এটা ভালোই বুঝেছিলেন—আর অপরিসীম ধৈর্য লেখককে খুশি রাখা, কাগজ আনা থেকে বাইন্ডার কাকে না খুশি রাখতে হয়! এক-একটা বই ছেপে বের হবার পর সে দেখেছে, বাবা কী নিশ্চিন্ত। বই-এর প্রোডাকশান-মলাটের ছবি থেকে ব্লক, সর্বত্র তাঁর সতর্ক নজর।
