আর কার দেবার সামর্থ্য আছে বলুন! থাকলেও মুখ শুকিয়ে রাখার স্বভাব। কার কাছে চাইবেন বলুন। ইচ্ছা হল বলি বিনিও দিতে পারে। তুমিও পার। সবাই মিলে দিলে আমার ভার লাঘব হয়। গাছও কাটতে হয় না। যাই হোক বিয়ে আর হয়নি। ছেলের কী খুঁত পাওয়া গেছে।
রাতের দিকে বারান্দায় বসে আছি। বাড়ি এলে যে আমরা পরমায়ু বাড়ে—এত সব গাছপালার মধ্যে বসে থাকার আনন্দই আলাদা।-দেখি অন্ধকারে উঠোন অতিক্রম করে কে বারান্দায় উঠে আসছে। পরনে লুঙ্গি, গায়ে ফতুয়া। ধিলু! তার ছেলে দুটি এবং মেয়েটিও হাজির। ওরা প্রণাম করে বলল, জেঠু তুমি কিন্তু আমাদের বাসায় যাবে। মা রাতে তোমাকে খেতে বলেছে।
সবারই কুশল নিতে হয়।
তুই কোন ক্লাশে পড়িস মেঘা?
ক্লাশ ফোরে পড়ি।
সিধু তুই?
আমি পড়ি না জেঠু।
তখনই মা বললেন, ও তো ব্যবসা করবে বলছে। একটা সাইকেল না হলে চলছে না। আমাকে ধরেছে, ঠাম্মা তুমি জেঠুকে বলো, আমাকে একটা সাইকেল কিনে দেয়।
ধিলু বাঁশে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে আছে। কোনো কথা বলছে না। সে যে ভিতরে ভিতরে ফুঁসছে বুঝি, তার এই ক্রোধ যে বাবা বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ায় তাও বুঝি— বারান্দার এক কোনায় হারিকেনটা রাখা, তার আলোতে সবার মুখই আবছা দেখা যায়, রুমি ঘর থেকে গলা বাড়িয়ে বলল, কাকা সবারই চা হচ্ছে, আপনাকে দেয়?
দে। ধিলুকে বললাম, তুই এত অমানুষ ধিলু, বারান্দার টালি সব ভেঙে ফেললি, তোর স্ত্রী রুমিকে ধরে মারধর করল ছেলেটার পড়া বন্ধ করে দিলি, এই সে দিন হল, ব্যবসার ও কী বোঝে!
সহসা ধিলু আগুনের মতো জ্বলে উঠল। আমি অমানুষ—তোরা সব মানুষ। তুই আমাকে টাকা পাঠাতিস, মা-র সহ্য হল না। বউদিকে লাগাল। তুই টাকা বন্ধ করে দিলি।
তোর দোকান তো ভালোই চলছে।
মিছে কথা। ঈর্ষা, এই দোকান থেকে কী হয় বুঝিস না, ধার দেনায় ডুবে গেছি। বাসা ভাড়া করে থাকতে হয়, এখন সব রুমি, তুই জানিস দাদা, দিদি মা মিলে তোর টাকা থেকে রুমিকে পাসবই করে দিয়েছে। তোকে চাপ দিয়ে, তুই খাস না-খাস বছরের পর বছর টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে নিচ্ছে, দিদিই দেখবি রুমির বিয়ে দেবে না। ওর মেয়েকে কে পাহারা দেবে, সকাল হলেই রুমি দিদির বাড়ি চলে যায়—তার মেয়ের দেখাশোনা করে, বাড়িতে কতক্ষণ থাকে!
এসব কথা আমার শুনতে ভালো লাগে না, বললাম ঠিক আছে, বাবাকে বললাম, আপনি সামনের দিকে ওকে দুকাঠা জমি দিন, ধিলু বাড়ি করে থাকুক। বাড়ির ছেলে পাড়াতে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকবে, দেখতেও খারাপ লাগে।
বাবা আর কী করেন? বাড়ির দায়-অদায় সব যে সামলায় তার কথা ফেলাও যায় না, তিনি বললেন, আমার উঠোনে সে থাকতে পারবে না। জায়গার তো অভাব নেই, রাস্তার দিকে জায়গা দে।
সেই মতো ধিলু জমিটার এক কোনায় বাড়িঘর করে আছে। বছরে দু-চারবার কখনো আরও বেশি বাড়ি যাওয়াই আমার স্বভাব। মাটির টানে হতে পারে, মা বাবা ভাই বোনের টানে হতে পারে, গেলেই কেমন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। অথবা সেই গাছপালা বৃক্ষ, কারণ কখনো যে বাড়িটাকে তপোবনের মতো মনে হয়, শহরের কোলাহল থেকে এই সব বৃক্ষসমূহের নির্জনতায় ঢুকে গেলে তৃপ্তিতে মন ভরে ওঠে। বাবার লাগানো গাছ, আমার লাগানো গাছ পঁচিশ-ত্রিশ বছরে যে-সব মহাবৃক্ষ হয়ে গেল, তার নীচে চেয়ার পেতে দিলে গাছের সঙ্গে আমার কথা হয়।
বাবাও সারা দিন এ-গাছ সে-গাছের গোড়া খুঁড়ে মাটি আলগা করে দেন, এতে গাছের প্রাণশক্তি বাড়ে। সারা দিন বাবাও গাছের সঙ্গে কথা বলেন।
সে যাহোক, সে বারে বাড়ি গিয়ে টের পাই, প্রকৃতই বাবার অনেক বয়েস হয়ে গেছে। বাবা বারান্দায় জলচকিতে বসে আছেন। বর্ষাকাল, বাবার শরীর কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
আমার জরুরি কাজ, পরদিনই ফিরতে হবে। পিলুকে ডেকে পাঠালাম। সে কয়েকটা জমি পার হয়ে আলাদা জমি কিনে পাকা বাড়ি করে আছে।
বাবার শরীর কিন্তু ভালো না পিলু।
সে তো জানি দাদা, আমি একা কী করব?
কালু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যা, না হয় কল দে। বাবার রক্ত পরীক্ষা করা দরকার। ধিলুকে ডেকে বললাম, বাবার কিন্তু শরীর ভালো না।
ধিলুর সোজা কথা, আমার পক্ষে সম্ভব না কিছু করা। অগত্যা আর কী করা, নিজেই ছোটাছুটি করে বাবাকে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ পথ্যের ব্যবস্থা করে আসার সময় বিনিকে খবরটা দিয়ে এলাম। সাত দিনের মাথায় বিনির টেলিগ্রাম। আমাদের বাবা আর নেই।
৪.
নামের চোটে গগন ফাটে এমন সব কথা এমনিতেই পাড়াগাঁয়ে চাউর হতে সময় লাগে না। মান এবং বংশের মর্যাদা রক্ষার্থে, সব ভাইরাই বসল। দাদাও বাড়িতে চলে এসেছেন।
বললাম, দাদা, বাবার শেষ কাজ। আমরা সবাই তঁরা আত্মার সদগতির অংশীদার। তোমরা কে কী দিতে পারবে, বললে ভালো হয়।
দাদার দিকে তাকালাম, আমি ভাই হাজার টাকার বেশি দিতে পারব না।
পিলু—
দাদা আমার অবস্থা তো বুঝিস?
ধিলু—
আমরা ক্ষমতা কোথায়! মাঝে মাঝে কিছু দিস বলে এখনো দুবেলা খেতে পাই।
অগত্যা ভগ্নীপতিকে ডেকে পাঠালাম। এবং পুরোহিত ডেকে ফর্দ তৈরি হল।
আমাদের আত্মীয়স্বজন মেলা। জেঠা কাকারাও আছেন, বংশটি বড়ো, কারণ বাবা জেঠারা পাঁচ ভাই-দুই বোনও আছে, তা ছাড়া কলোনির কাজে কর্মে যারা আমাদের নিমন্ত্রণ করে তাদেরও বলা দরকার। এ ছাড়া পিলু ধিলুর শ্বশুরবাড়ির মানুষজন, কাজেই তালিকাটিতে নামের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে যেতে লাগল। বাবার কাজে কোনো কার্পণ্য থাকুক আমি চাই না। বৃষোৎসর্গ শ্রাদ্ধ সহ দান-ধ্যানেরও ব্যবস্থা থাকল। বলতে গেলে ঘটা করেই কাজ সারা হল।
