শোনো বউমা, ধিলু কোথায়?
কাজে গেছে। কারাখানায় ওর শিফট ডিউটি।
বিলু!
আপনার ছেলে বাজারে গেছে। আসছে।
আমি বসব না বউমা। মরনির ছেলের বিয়ে, বিয়ে বলে কথা, না এসেও পারা যায় না। সংসার ফেলে আসা সোজা কথা না, এলাম প্রাণের দায়ে–
আমি দরজা খুলে ঢুকতেই কানে এল কথাটা—বাজারের থলে নামিয়ে বসার ঘরে ঢুকে প্রণাম সেরে বললাম, প্রাণের দায়! প্রাণের দায় কেন মা!
হ্যাঁরে বাবা। তোর পলতার মরনিমামির ছেলে জনার্দনের বিয়ে। যখন এতটা দূরে এলামই, তোকে, নাতি দুটোকে না দেখে যাই কী করে। প্রাণ কাঁদে।
কে তোমাকে দিয়ে গেল!
নরহরি।
অর্থাৎ আমার মেলোমশাই, বললাম, তিনি এলেন না।
আসে কী করে! বিয়ে বলে কথা, এদিকটার আত্মীয়স্বজনদের বিয়ের চিঠি দিয়ে আসবে। তার সঙ্গেই ফিরব।
প্রাণের দায়টা কী তোমার! এসেই যাওয়ার কী হল।
তুই কি বাবা মানুষ আছিস!
বুঝলাম হয়ে গেল। সবটাই নীরা উপলক্ষ।
নিজের ভাই বলে কথা! সে থাকে তোর কাছে, তার কাছ থেকে, কোন মুখে খোরাকির টাকা নিস—
ও তো কোনো টাকা দেয় না মা!
দেবে কোত্থেকে, কটা টাকা মাইনে, তোকে দিলে ওর বউকে কী পাঠাবে! ওর বউয়ের যা চোপা, ঠেস দিয়ে কথা—নিজের ভাই, থাকে খায় সে জন্য কেউ টাকা নেয়! কী মুখ বউটার! তোকেও ঠেস দিয়ে কথা বলে। একজনের নামের চোটে গগন ফাটে, আর তারই ভাই উবু হয়ে ঘাস কাটে। আরে তোর এ-কথা সাজে, বিপদে আপদে সেই তো দেখে!
বললাম, মা ধিলু আমাকে কানাকড়িও দেয় না। খোরাকির টাকার কথা আসে কী করে!
কী জানি বাবা তোরাই জানিস।
বছর দশেক ছিল ধিলু আমার বাসায়। তারপর ফের বাড়িতে। কোম্পানির প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং সঞ্চিত টাকা নিয়ে গিয়ে ফের মোরের মাথায় দোকান, এবং বাড়ি ছেড়ে সে যে থাকতে পারেনি—কাজে কামাই করারও স্বভাব ছিল তার। বাড়ি গেলে আর ফিরতে চাইত না। কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়ার এটাও বোধহয় একটা কারণ। ধিলুকে নিয়ে আমার শুধু দুশ্চিন্তা বাড়ে।
৩.
সে বারে বাড়ি গিয়ে দেখি, ধিলুর ঘরটা ফাঁকা।
বাবা বুঝতে পেরে বললেন, তাড়িয়েছি। অত্যাচারের শেষ নেই। সে আমার ত্যাজ্যপুত্র।
কী বলছেন!
তোমার ভাইঝিকে ধিলুর বউ চর মেরেছে। ধিলু বারান্দার টালি টেনে ছুঁড়ে ফেলেছে উঠোনে। তোমাকে জানাইনি। পিলু ছুটে না এলে ধিলুর বউ তোমার ভাইঝিকে মেরেই ফেলত। চুল ধরে টানতে টানতে উঠোনে আছড়ে ফেলেছে। মানিক ছুটে এসে লাঠি নিয়ে তাড়া না করলে আমাদেরও মেরেই ফেলত। বাড়িটা দিন দিন শেষে কী হয়ে উঠল।
আমার মা জেদি, একগুঁয়ে। বুঝি দোষ সবটাই ধিলুর বউয়ের নয়। ভাইঝিও রগচটা। সে যাহোক, বললাম ওরা কোথায়।
দীনবন্ধুর বাড়িতে বাসা ভাড়া করে আছে। এটা খারাপ দেখায় বাবা। বাড়ি ঘর থাকতে বাসা ভাড়া করবে শত হলেও সে আপনার পুত্র।
পুত্র না মূত্র। তুমি যা পাঠাও ওই সম্বল আমার। একটা পয়সা দেয়! দিতে পারে, দেবে না। কুপুত্র থাকার চেয়ে না থাকা ভালো। আর প্রতারণা, তোমাকে সাতকাহন করে যে অভাবের কথা লেখে সব বানানো। সুদের ব্যবসা করছে সে।
কথায় কথা বাড়ে। মা বললেন, থাকবি তো! রুমির একটা সম্বন্ধের কথা হচ্ছে। সবই ঠিক, কেবল বলেছি তুই না এলে কিছু হবে না। তুই না দেখলে কিছু হবে না। দেনা পাওনা নিয়ে সেই কথা বলবে।
আমি বললাম, দাদা কী বলছে! দাদা দেখুক।
বাবা বললেন, সে দেখবে না। তার দায় নেই জানিয়ে গেছে। আমার কাছে
বড়ো হয়েছে, আমার দায়। তার নিত্য অভাব, জানিয়েছে, বিয়ে দেবে কোত্থেকে। ঘাড়ের উপর তার আরও তিনটি মেয়ে দাদার দোষও দেওয়া যায় না। পুত্র দুটির তার অপুষ্টি কিংবা অন্য যে কোনো কারণেই হোক, বুদ্ধি-বিবেচনার খুব অভাব। কিছুটা মানসিক প্রতিবন্ধীও বলা যায়। রেলের চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মীর পক্ষে এতগুলো মানুষের ভরণপোষণই কঠিন।
মা বললেন, কীরে কদিন থাকবি তো! গলায় বিষধর সর্প নিয়ে ঘুরছি। তুই ছাড়া কে উদ্ধার করবে—তুই দেখে যা। দাবিদাওয়া বলতে নগদ পঞ্চাশ হাজার চায়, আর কিছু চায় না। আর বিয়ের খরচ।
আমি কী যে বলি! নগদ দেওয়া যে অপরাধ, যে দেয় সেও অপরাধী। তারপর এত টাকা পাব কোথায়! সব আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইছে মা। মা ফের বললেন, সাদুল্লা আমগাছটা বিক্রি করলে হাজার তিনেক টাকা পাওয়া যাবে। যদি বলিস, গাছটা না হয় বিক্রি করে দিবি। বিয়ের খরচ মিটে যাবে।
বাবা খেপে গেলেন, শোনো ঠাকরুণ, গাছ আমার প্রাণ। গাছগুলোর দিকে তোমাদের নজর পড়েছে দেখছি। এত বড়ো বড়ো গাছ বাড়ির চারপাশে তোমার সহ্য হচ্ছে না!
বিকেলে আমার বোন বিনিও হাজির। তার বিয়ে কলোনিতেই হয়েছে। সে কলোনির প্রাথমিক স্কুলে মাস্টারিও করে। সপ্তাহে দু-সপ্তাহে একবার মাকে রুমিকে দেখে যায়-রুমিকে সে মেয়ের মতোই ভালোবাসে। কারণ মাকে যখন দাদা রেখে যান তারই উৎসাহ ছিল বেশি। আমি রাজি ছিলাম না।
ভগ্নিপতিও কিছুক্ষণ পরেই হাজির। কথাবার্তায় খুবই ভদ্র এই ভগ্নিপতি, প্রণাম সেরে বলল, কবে এলেন দাদা। ছেলেটিকে আমার পছন্দ। বাজারে স্টেনলেস স্টিলের বাসনকোসনের দোকান আছে। দোকানটা সে বড়ো করতে চায়। এই জন্যই নগদ টাকা তার দরকার।
কী যে বলি! তবু বললাম, সবাই মিলে দিলে ত হয়েই যায়। তবে এত টাকা!
