২.
বাড়িটা আর বাড়ি থাকল না। দাদা দেশভাগের আগেই রেলে কাজ নিয়ে সুদুরে হারিয়ে গেল, সেখানে সে ঘরবাড়িও বানিয়েছে। বছরে দু-বছরে আসে এই পর্যন্ত।
তার কথায় বুঝি তারও অভাবের অন্ত নেই, পর পর সন্তান ধারণ করে বউদিও জেরবার, এবং একবার বাড়ি গিয়ে জানতে পারি সে তার বড়ো মেয়েটিকে বাড়িতেই রেখে গেছে।
বাবা বললেন, কী আর করা!
বাবা যে খুব অদৃষ্টবাদী এবং ধর্মভীরু মানুষ। জীবন একভাবে না একভাবে চলে যায়। এত ভেবে কী হবে!
তত দিনে আমারও কলকাতায় থাকার একটা আস্তানা হয়েছে। কিন্তু মা বাবা ভাই বোনের টানে, এবং সেই গাছপালা—যা প্রায় তিন বিঘা জুড়ে বড়ো হয়ে উঠেছিল, তারা প্রায় বলতে গেলে মহাবৃক্ষ হয়ে উঠেছে—ডালপালা মেলে দিয়েছে —বড়োঘর, রান্নাঘর, ঠাকুরঘরও হয়ে গেছে এবং শহর জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে, প্রায়ই মা বাবার কাছে ছুটে যাই। মাটির আটচালা ঘরটির একটি তক্তপোশে বাবার বিছানা হয়, আমারও হয়, পাশের তক্তপোশে আমার মা এবং ভাইঝি শোয়, আমায় ছেলেরা কিংবা স্ত্রী গেলেও কোনো রকমে সেই ঘরটাতেই থাকি। ধিলু বাড়ির সামনের দিকটায় মাটির ঘর তুলে সে তার আলাদা সংসার করে নিয়েছে। বাড়ি গেলে বাবাই একবার বললেন, ধিলুর দোকান ধারদেনায় বসে গেছে। তুই যদি পারিস মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠাস।
মা দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তাঁরও এক কথা। তুই না দেখলে, কে দেখবে। এমন অবস্থা ধিলুর, দুবেলা পেট ভরে খেতে পায় না। তুই যা টাকা পাঠাস আমাদেরই হয় না, তার উপর ধিলুর বাড়তি মুখের অন্ন জোটানো তো বাবার পক্ষে সম্ভব! ধিলুকে কত বললাম, তোকে চিঠি লিখতে, সে কিছুতেই রাজি না। বড়ো বিবেচক, দাদা কত দিক সামলাবে। বরং তোমরা বললে দাদা গুরুত্ব দেবে।
কী আর বলি, দেখি বলে চুপ করে গেলাম। সেই কবে কলেজের চাকরি নিয়ে প্রথম বাড়ি ছেড়ে কাটোয়ায় যাই। তখন থেকেই ধিলু আমার কাছে। সে স্কুলে যায়, আমার স্ত্রী শিক্ষয়িত্ৰী একটা স্কুলের। সে-ই সকালে কাজের ফাঁকে ধিলুকে পড়ায়। কিন্তু তার পড়ায় মন বসে না। সুযোগ পেলেই, পড়া ছেড়ে উঠে যায়, স্টেশনে গিয়ে বসে থাকে—বাড়ির জন্য মন খারাপ হলেই, তাকে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। স্কুল কামাই হয়। স্কুলে না গেলে পড়ায় যে ক্ষতি হয়, কিছুতেই সে তা বোঝে না।
এক সকালে বাবার চিঠি নিয়ে বোনও হাজির। আমার কাছে না থাকলে সে পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না। তার বউদি স্কুলে পড়ায়। এই ভরসাতেই বাবা ভেবেছেন, বউমা সাহায্য করলে বিনি ঠিক পাশ করে যাবে।
পাশ আর করে!
পড়তে বসে, তবে মন অন্যমনস্ক। পড়া ছাড়া আর সব কাজই তার প্রিয়। ধিলুর সঙ্গে বিনি একদণ্ড বনে না। অথচ বাড়ি গেলে দুই ভাইবোনেই বউদিটি যে তার ভালো না, কারণ দাদাকে গ্লাস ভরতি দুধ দেয়, তাদের গ্লাস ভরতি দুধ দেয় না, বউদির খুবই দেড় নজরে স্বভাব, এই সব অভিযোগে মা ক্ষিপ্ত হন, তাঁর এক কথা, তুই পেটে ধরেছিস, না আমি ধরেছি। তোর উপার্জনে খায়, না আমার পুত্রের উপার্জনে খায়। এই সব নিন্দামন্দ কানে উঠতেও দেরি হয় না। স্ত্রী মাঝে মাঝে এই নিয়ে কান্নাকাটিও করতেন। সে যাইহোক, কাটোয়া থেকে সরকারি কলেজে চাকরি নিয়ে কলকাতায় চলে আসার আগে জেলা বোর্ডের বড়োবাবু ধ্রুবকে ধরে আমার স্ত্রী একটি মাদার টিচার ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করে দেয় বিনিকে। আর কলকাতার স্কুলে ধিলুকে যে ভর্তি করানো কঠিন, বরং তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া দরকার। সেখানে কলোনির হাইস্কুলে যদি ভর্তি করে দেওয়া যায়।
আমি নিজেই বাড়ি গেলাম।
বাবা।
বলো। আমি তো কলকাতা চলে যাচ্ছি। আপনার বউমার ডেপুটেশনে কাজ, সেও চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে। কলকাতার স্কুলে ভর্তি করানো খুব টাফ ব্যাপার। ওকে কলোনির হাইস্কুলে ভর্তি করে দিন। বাড়ি থেকে পড়ুক। আর একটা তো বছর দেখি তারপর কী করা যায়।
আর, একটা বছর!
বাবার চিঠি নিয়ে ধিলু আমার বাসায় হাজির।
বাবা লিখেছেন, ধিলু আর পড়তে চায় না। সে তোমার কাছে চলে যাচ্ছে। যে কোনো একটা কাজ তাকে তুমি জুটিয়ে দিও। কী করি! বাধ্য হয়ে আমার এক ছাত্রের বাবাকে ধরে ধিলুকে কারাখানায় ঢুকিয়ে দিই। এই সব স্মৃতি আমাকে বিষণ্ণ করে দেয়। ধিলুর শেষে এই পরিণতি! বড় দুশ্চিন্তা আমার। তার মারামারির স্বভাব প্রকট, মাথা গরম, একবার স্কুলেও সে তার এক সহপাঠীর মাথা ফাটিয়ে দিয়ে বাড়িতে পালিয়েছিল। স্ত্রী শিক্ষয়িত্রী, আমি কলেজে পড়াই, কাটোয়ায় আমাদের বিশেষ পরিচিতির দরুনই বিষয়টি বেশি দূর গড়ায়নি। কারখানায়ও সে মারপিট করে চাকরিটা শেষ পর্যন্ত খুইয়েছে।
তখন সে আমার বাসায় থেকে কারখানায় কাজ করত। ধিলু কাজ পেয়েছে শুনেই, মা এক সকালে হাজির আমার কলকাতায় বাসায়।
আমি যে জন্যে এলাম— মা বললেন।
বিশেষ জরুরি কাজেই এসেছেন মা। স্ত্রী নীরা মাকে ভালোই জানে। সে ভয়ে ভয়ে প্রণাম সেরে বলল, আপনি হাতমুখ ধুয়ে বিশ্রাম করুন মা। আপনার ছেলে আসুক। আমার দুই পুত্র তাদের ঠাম্মাকে ধরে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসিয়ে দিয়েছে। তারাও জানে ঠাম্মা তাদের মাকে পছন্দ করে না। মা বাবাকে অন্য গ্রহে
তুলে আনায় ঠাম্মার যে ক্ষোভ আছে তাও তারা বোঝে
