যুবকটি রুমাল দিয়ে ঘাড় গলা মুছে পা ফাঁক করে দাঁড়াল-মশায়ের কোথায় যাওয়া হবে।
অময় বলল, এতটা রাস্তা রোদে হেঁটে যাবেন, কষ্ট হবে। ছাতাটা নিন। সে ছাতাটা বের করার সময় কালো একটা কী বের করে প্যান্টের ভাঁজে লুকিয়ে রাখল।
যুবক চমকে গেল। পুলিশের লোক! পুলিশের বড়োকর্তা হতে পারে। বেশি রং সহ্য নাও করতে পারে। সে গা ঢাকা দেবার জন্য তাড়াতাড়ি ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। অময় হাসল। বুড়ো লোকটি বলল, না না ছাতা আমার লাগবে না। আমার অভ্যাস আছে। মাথায় রোদ লাগে না।
অময় বলল, আপনি না নিলে, জানালা দিয়ে ফেলে দেব। দেখবেন। বলে সত্যি সে ছাতাটা তুলে ফেলতে গেলে কেমন অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল বুড়োমানুষটি। ভাবছে তার মাথা খারাপ নয় ত। কিন্তু আচরণে কোথাও বুড়োমানুষটি তা টের পায়নি। বলল, ছাতা ফেলে দেবেন কেন?
তারপরেই মনে হল অময়ের, নাটক হয়ে যাচ্ছে, আশপাশের যাত্রীরা তাকে দেখছে। সে এটা চায় না।
সে একসময় ভাবল, থাক ছাতাটা। বাড়ি গিয়ে মণিকে দেবে। টিফিন বের করে সে খেল না। থাক, বাড়ি ফিরে মণির ছেলেমেয়েদের খেতে দেবে। সে চিনাবাদাম কিনে খেল। শোনপাপড়ি খেল। কলের জল থেকে জল খেল। ঘামে জামা-প্যান্ট ভিজে গেছে! ভালো লাগছে—এটাই সে চাইছে। বাড়ি গিয়ে পৌঁছোল সাড়ে পাঁচটায়। মা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে। প্রচণ্ড গরমে সে হেঁটে এসেছে স্টেশন থেকে। রিকশা পর্যন্ত নেয়নি। মা বলল, তোর কি মাথা খারাপ। এই রোদে হেঁটে এলি! অসুখবিসুখ হলে কে দেখবে বাবা!
অময় বলতে পারত, অনেকদিন পর মা আমি আবার আমার মধ্যে ফিরে আসতে পেরেছি। ফিরে আসার এই মজা যে বোঝে সে বোঝে।
সে মাকে গড় করার সময় বলল, কোনো কষ্ট হয়নি। অনেকদিন পর নিজের সুখ কাকে বলে টের পেলাম মা। তুমি কেমন আছ! আর সবাই?
মণি তখন তার গোরুটাকে মাঠের মধ্যে রোদে ঘাস খাওয়াচ্ছে। দাদাকে দেখেই সে ছুটে আসছে। সবাই। এই বাড়ির গাছপালা বনজঙ্গল সব তার শৈশব কৈশোর এবং যৌবনের কথা বলে। সে এখানে এলেই মুক্তির স্বাদ পায়। মা গাছের নীচে মাদুর বিছিয়ে দিলে সে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল, বলল, আঃ কি আরাম!
ঝোড়ো হাওয়ায় পাতা উড়ে গেল। পাখিরা ডালে এসে বসল। পরিচিত মানুষজন বলল, কে অময়? সদরে কোনো কাজ ছিল? গাড়িতে না ট্রেনে?
সে বলল, ট্রেনে কাকা। সেই ট্রেনে-জলের বোতল নেই, ছাতা নেই, টিকিট নেই। সেই ট্রেনে আমি আবার আজ ফিরে আসতে পেরেছি! সে আর যা বলতে পারত, আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ ট্রেন ওই একটাই। অন্য ট্রেনে চেপে বসলে বড়ো অস্বস্তি।
সাদা বিছানা
সুদক্ষিণা মুখে ক্রিম ঘসছিল। জানালা খোলা। চৈত্রের ঝড়ো হাওয়া কদিন থেকেই বেশ জোর বইছে। কেমন সব অগোছালো করে দেয় গাছপালা, জানল বিছানার চাদর। সকালের দিকে থমকে থাকে। বেলা যত বাড়ে হাওয়ার জোর তত বাড়ে। মাঘ-ফাল্গুনে মশার উৎপাতাটা ঝড়ো হাওয়ায় এক সময় উড়িয়ে নিয়ে যায়। সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে আকাশ দেখার অবসর মেলে। কনকেন্দু বিছানায় শুয়ে সুদক্ষিণার ক্রিম ঘসা দেখছিল। সুদক্ষিণার এগুলো সহবাসের আগেকার প্রস্তুতি। ভোজে বসার আগে কলাপাতা ধুয়ে নেওয়ার মতো। শরীরে তার এখন কেমন জ্বর জ্বর লাগছে। বোধ হয় সুদক্ষিণা আগে থেকে এ-সব করে জানিয়ে দেয়, আমি কিন্তু রেডি হচ্ছি। তুমি নিজেকে ঠিকঠাক করে নাও। আজ আমার পৃথিবী আবার নতুন হয়ে গেছে।
কনকেন্দু হাসল।
অফিস থেকে তার ফিরতে আজ একটু দেরিই হয়েছে। রাস্তাঘাট ভালো না। সে ফিরে না আসা পর্যন্ত বাড়িটা কেমন অস্বস্তির মধ্যে থাকে। সে ফিরলেই একটা রাতের মতো সুদক্ষিণা কেমন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। যাক কারো জন্য আর আশঙ্কা নিয়ে বারান্দায় পায়চারি করতে হয় না, অথবা খুট করে গেট খোলার আওয়াজের জন্য তাকে বসেও থাকতে হয় না। সুদক্ষিণা তখন যেন বাড়ির সব কাজ বড়ো নিখুঁত ভাবে সেরে ফেলতে পারে।
আয়নায় মুখ দেখছিল সুদক্ষিণা।
পর্দা সরিয়ে পাপু ডাকল, মা।
তোমরা এখনও ঘুমাওনি! বিছানা থেকে নেমে এলে কেন!
পাপু পর্দা সরিয়ে মাকে দেখছিল।
পেছনে আর একটা মুখ। ঝুমকি।
মা, দাদা আমার বালিশ দিচ্ছে না।
সুদক্ষিণা নিজেকে সামলাচ্ছিল। এবং যেন একটু ক্ষোভও সৃষ্টি হয়েছে সুদক্ষিণার ভেতর। এটা কার উপর কনকে জানে। মা বুড়ো মানুষ, সুদক্ষিণা বোঝে না এই দুটো দৈত্যকে সামলানো কত দায় একজন বুড়ো মানুষের পক্ষে।
কনকেন্দু বলল, চল দেখছি। সে পাপুকে বলল, তোরা শান্তিতে তোর মাকে একটু ঘুমোতে যেতে দিবি না! ওর বালিস দিচ্ছিস না কেন!
ও আমারটা নিয়েছে। নিজেরটা কী করেছে কে জানে! বা
রান্দা পার হয়ে ডানদিকের ঘরটায় দুটো খাট। একটাতে মা, পাশেরটাতে পাপু আর ঝুমকি। মার চোখে চশমা, সামনে বই। বোধ হয় কোনো ধর্মগ্রন্থ হবে। রাত করে মার এ-সব পড়ার অভ্যাস। সাদা থান, সাদা বিছানা, সাদা বালিসে মার বিছানাটা তার আজ কেন জানি সহসা আদ্ভুত ঠেকল। সে ডাকল, দেখ মা এদের কাণ্ড।
কখন নেমে গেলি! কী হয়েছে!
কনকে দেখল, তার মা উঠে বসেছে। তারপর বইয়ের ভাঁজে চশমাটা রেখে নীচে নেমে এল। দরজা থেকে দুজনের হাত ধরে টেনে নেবার সময় বলল, তোদের চোখে ঘুম নেই! কখন থেকে খটাখটি করছিস। বিছানায় ওঠ।
