পাপু উঠে গেল। ঝুমকি উঠল না।
ঝুমকি বলল, আমার বালিশ পাচ্ছি না ঠাকুমা। দাদা কোথায় লুকিয়ে রেখেছে।
মারব, আমার নামে মিছে কথা বললে।
কনকেন্দুর দিকে তাকিয়ে মা বলল, তুই যা। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে যাস। আমি দেখছি।
কনকেন্দুর কেমন লজ্জা লাগছিল মার দরজা বন্ধ করে দেওয়া দেখতে। দরজাটা খোলাই থাকে। ও-ঘর দিয়ে রাতে বাথরুমে যেতে হয়। বাবা প্ল্যানে ওই একটা মস্ত ভুল করেছিলেন বাড়িটা করার সময়। তখন অবশ্য বাড়িতে দুই কাকা থাকতেন। জ্যাঠামশাই থাকতেন। এক একটা ঘর ছিল এক একজনের জন্য। এ ঘরটা খাবার ঘর হিসাবে ব্যবহার হত। ওরা বাড়ি করে উঠে যাবার পর, নীচের তলাটা বাবা ভাড়া দিয়ে দেন। এতগুলো ঘরের সত্যি দরকার হয় না। ওপরে তিনখানা ঘর। একটা বসার। ওটা সিঁড়ির মুখে পড়ে। মার ঘরটা কড়িডোরের মুখে। তাদের ঘরটা একেবারে দক্ষিণ ঘেঁষে। জানলায় দাঁড়ালে আগে বড়ো মাঠ দেখা যেত। এখন মাঠও নেই—সেইসব গাছপালাও নেই। কেমন ঘিঞ্জি। মাঝে মাঝে মনে হয় এটা আর বড়ো শহরের উপকণ্ঠ নয়। বরং মূল শহরটাই যেন এখানে উঠে এসেছে।
কনকেন্দু করিডোর ধরে হাঁটার সময় এ-সব ভাবছিল। কারণ কনকে জানে মা দরজায় ছিটকিনি তুলবে না। রাতে বাথরুম যেতে হলে মাকে ডেকে তুলতে হবে। এসব কারণে মা আর দরজায় ছিটকিনি তুলে দেয় না। সে বলতেও পারে না, আজ তুমি ছিটকিনি তুলে দাও। নীচের তলায় আলগা একটা বাথরুম আছে। বাড়িতে লোজন বেশি হলে ওটা খুলে রাখা হয়। এমনিতে বন্ধ থাকে। নীচের তলায় ভাড়াটেরা নাহলে সেটাও দখল করে নেবে। এই একটা ভয় আছে কনকেন্দুর।
সুদক্ষিণার মাঝে মাঝে কী হয়। সহবাসের ব্যাপারে কেমন ওর শরীরে এক ধরনের জোয়ারভাটা আছে। সুদক্ষিণা আসার পর তার এটা মনে হয়নি। কিন্তু সাত-আট বছরের অভিজ্ঞতায় এটা মনে হচ্ছে তার। মাসখানেক সুদক্ষিণার জোয়ার থাকে, মাসখানেক ভাটা চলে। পুরুষ মানুষের বোধ হয় এটা থাকে না। তার কাছে একজন নারী সব সময়ই উষ্ণতা ছড়িয়ে রাখে। তবে একই ভাবে কতদিন আর এক জানলায় বসে গভীর নীল আকাশ দেখা যায়। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় জানলাটা বন্ধ থাক। কিন্তু জোয়ারের সময় সুদক্ষিণা, জানলাটা নিজেই খুলে দেবে। তার ভালো লাগা মন্দ লাগা নিয়ে যেন সুদক্ষিণার কিছু আসে যায় না। তখন এক ধরনের ক্লান্তিকর আকাশের নীচে সে বসে আছে এমন মনে হয়। পাশ ফিরে চুপচাপ শুয়ে থাকার চেষ্টা করেও পারে না। সুদক্ষিণা, ঠিক এক সময় না এক সময় তাকে অস্থির করে তুলবেই।
ঘরে ঢুকতেই সুদক্ষিণা বলল, দরজাটা বন্ধ করে দাও।
দরজাটা বন্ধ করে দিতে কনকেন্দুর অস্বস্তি হচ্ছিল। পাপু কিংবা ঝুমকি যে কোনো সময় এসে দরজা ধাক্কাতে পারে। কারণ ওরা যে একটা বালিশ নিয়ে পড়েছে, সেটা মার পক্ষে বের করা কতটা কঠিন সুদক্ষিণা বোঝে না। ঝুমকি ও ঘরে এমনিতেই শুতে চায় না। সে ফাঁক পেলেই উঠে এসে মার পাশে শুয়ে থাকে। বছর খানেক আগেও ওকে ঘুমোলে মার ঘরে তুলে দিয়ে আসতে হত। এখন অবশ্য বুঝেছে, কী বুঝেছে জানে না, তবু আর মার সঙ্গে শোবে, বাবার পাশে শোবে এমন বায়না ধরে বসে থাকে না।
সুদক্ষিণা এ বাড়িতে বেশ কম বয়সেই এসেছিল। কুড়িও পার হয়নি। কনকেন্দু বাবার একমাত্র সন্তান। পাসটাশ করে যাবার দৌলতে সে দামি চাকরিও পেয়ে গেছিল। ওকে বেকার থাকতে হয়নি। একদিনও। বাবা কম বয়সে ছেলের বিয়ে দিয়ে যেন একটা জীবনের বড়ো কাজ করে ফেলেছেন—যেটা অনেক বাবাদের পক্ষেই সম্ভব হয় না, এ-কারণে সে, দেখেছে, বাবার যাদুবিদ্যা আছে কোনো, কিংবা বাবা ঠিক টের পেয়েছিলেন, কম বয়সে বিয়ে দিলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রগাঢ়তা বাড়ে। তা না হলে, সে এই বয়সেই এত সংসারী হয়ে উঠবে কেন। যেন সুদক্ষিণাকে খুশি রাখা ছাড়া পৃথিবীতে তার আর অন্য কোন দায়িত্ব নেই।
কনকেন্দু দেখল, সুদক্ষিণা নতুন পাট ভাঙা শাড়ি পরছে। সে যে দরজাটা বন্ধ করেনি, সাজগোজের বহরে সুদক্ষিণার সেটা খেয়াল নেই। নাকে নথ পরেছে। নথ পরলে সুদক্ষিণার কাছ থেকে সে আর কিছুতেই দূরে সরে থাকতে পারে না। কিংবা, শাড়ি পেঁচিয়ে পরার সময় স্তন আলগা, সুদক্ষিণা তখন চুমো খাবার বড়ো আগ্রহ বোধ করে। চুমোর সঙ্গে রোজকার সেই অভ্যেসের কথাটাও বের হয়ে আসে—তুমি সুদক্ষিণা এখনও সুইট সিকসটিন। কবে টুয়েন্টি হবে।
সুইট সিকসটিন বললেই যেন এক ঝড় উঠে যায়—চোখ অলস হয়ে আসে। সারা আকাশময় ঘন গভীর বিদ্যুতের ছটা মুহুর্মুহু জ্বলে ওঠে। নারী বড়ো সুধাময়ী, এত সুধাময়ী যে সে তখন আর স্থির থাকতে পারে না। সুদক্ষিণার কাছে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, হাত ধরে। দুজন হাঁটে পাশাপাশি। এবং আঁচল খসে পড়ে। চোখের কাজল চিক চিক করতে থাকে। সারা শরীরে সুঘ্রাণ ওঠে। সুদক্ষিণার নারী মহিমা বড়ো রহস্যজনক হয়ে উঠে তখন।
দরজাটা বন্ধ করলে না।
কনকেন্দু বলল, দিচ্ছি।
সুদক্ষিণা ব্লাউজের নীচে এবং বগলে পাউডার ছড়াচ্ছে।
কনকেন্দু বলল, আমার ঘুম পাচ্ছে।
সুদক্ষিণা বলল, শুয়ে পড় না। কে তোমাকে জেগে থাকতে বলেছে।
এ সময় কনকে একবার সকালের সুদক্ষিণাকে ভাবল। সকাল হলে কে বলবে, এই সুদক্ষিণা রাতে যাত্রার সখির মতো সহবাসে যাবার জন্য সাজতে বসেছিল। সংসারে সে মা, তার আর তখন কোন পরিচয় থাকে না যেন। এই পাপু ওঠো। এই ঝুমকি ওঠ মা। হাত মুখ ধুয়ে নে। স্কুলের গাড়ি চলে আসবে। ওঠ ওঠ। এক মুহূর্ত বিশ্রাম নেই। বাথরুমে যাবার আগে কনকেন্দুর চা, বাথরুম থেকে এলে কনকেন্দুর দাঁত মাজার ব্রাশ, আবার চা, ছেলেমেয়ের জলখাবার, সুদক্ষিণা কোন সকালে ওঠে তার স্নান বাথরুম কখন সব শেষ, কেউ টের পায় না। স্নান সেরে কাজের মেয়ের হাতে সব কাচাকাচির ভার দিয়েই রান্নাঘরে এবং এক হাতে তখন সে অতি আয়াসে সব করে যাবে।
