গরমে অময় দরদর করে ঘামছিল। এত ভিড় যে পাখার নীচে গিয়েও দাঁড়াতে পারছে না। সে তার অ্যাটাচিটা একটা বেঞ্চিতে রেখে ঠাণ্ডা হাওয়া খাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালে কেন জানি মনে হল—না ঠিক না। সেই সুখ তাকে আবার তাড়া করছে। এক দঙ্গল যুবতী ভিড়ের মধ্যে ঝুঁকে পাখাওয়ালার কাছে গিয়ে ঘিরে দাঁড়াল, সবাই একটা করে তালপাতার জাপানি পাখা কিনে ফেলল, যেন স্টেজে উঠে এক্ষুনি তারা নাচ শুরু করবে—শরীরে সুবাস তাদের, দূরে থেকেও এই সুবাস সে টের পাচ্ছে। তারপর যুবতীরা কে কোথায় নিমেষে হারিয়ে গেল। সে দেখল, মানুষের ছোটাছুটির শেষ নেই, ব্যস্ততার শেষ নেই। তার আজ কোনো ব্যস্ততা নেই। জলের বোতলটার কথা মনে হল, তেষ্টা পাচ্ছে, পাশে বেঞ্চে ছোট্ট শিশু নিয়ে বসে আছে চাষি বউ। নাকে নথ। ঘোমটায় কপাল ঢাকা। মেয়েটা কাঁদছিল। ছোট্ট ফ্রক গায়। জল তেষ্টা পেতে পারে, লোকটা জলের ফ্লাস্ক দরদাম করছে, এই গরমে কাঁধে হরেক রকম প্লাস্টিকের জলের বোতল নিয়ে ঘুরছে ফেরিওয়ালা। ডাবল দামে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে সব। গরিব মানুষের হিসাব সহজে মেলে না। জলের বোতল কিনতে তার সাহস হয়নি, গুচ্ছের টাকা দেবার ক্ষমতা নেই—অময়ের কি হল কে জানে, সে ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা বের করে বলল, নিন।
লোকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। না না বাবু আপনার চলবে কি করে। কি গরম! গলা শুকিয়ে যাচ্ছে! অময় হাসল, চলবে। আমি একা মানুষ, কোথাও খেয়ে নেব। সে ইচ্ছে করে বোতলটা ছোট্ট শিশুর পাশে রেখে হাঁটা দিল। জলের কল থেকে জল খেল। যেমন সে পঁচিশ ত্রিশ বছর আগে এই লাইনে, কতবার টাকার অভাবে টিকিট না কেটেই গেছে—আর তখন লকোচুরি খেলা।
একবার মনে আছে, কলকাতায় ইন্টারভিউ দিতে এসে ফেরার পয়সা ছিল না। কাশিমবাজার স্টেশনে নেমে রাতের অন্ধকারে ধরা পড়ে গেল। নীল বাতি নিয়ে পয়েন্টসম্যান দাঁড়িয়েছিল শেষ মাথায়। ধরা পড়ার ভয়ে গেট দিয়ে ঢোকেনি, কোনোরকমে লাইন পার হয়ে আমবাগানে ঢুকে গেলেই আর পায় কে! আর কোত্থেকে ভূতের মতো পয়েন্টসম্যান ফুস করে উঠে দাঁড়াল। সে পালাতে গেলে তার কাঁধের ঝোলানো ব্যাগ চেপে ধরেছিল। সে ব্যাগ ফেলেই ছুটেছিল, আঠারো উনিশ বয়সে বোধহয় মানুষ বেশি দুঃসাহসী হয়, ব্যাগ ফেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়। সামনের বনজঙ্গল পার হয়ে মিলের রাস্তায় পড়ে নিশ্চিন্তি।
এমন একটা খেলা শুরু করলে কেমন হয়। এই বয়সে খেলাটা জমলে মন্দ হয় না। সে তার সেই আগেকার জীবনে ফিরে যেতে চায় বলেই ত, বছরে এক দু বার তার বাড়ি না গেলে মেজাজ ঠিক থাকে না।
জম্মু-তাওয়াই এক্সপ্রেস ছেড়ে গেলেই প্ল্যাটফরম ফাঁকা হয়ে গেল। লালগোলা প্যাসেঞ্জার ঢুকছে। ভিড় নেই বললেই হয়। ভিড় থাকলেও সে ছোটাছুটি করত কিনা জানে না। দাঁড়িয়ে কতবার কতটা রাস্তা ট্রেনে গেছে! রানাঘাটে কিছুটা খালি হয়। কৃষ্ণনগর গেলে আরও খালি–বসার জায়গার অভাব হয় না। কিন্তু আজ দেখছে, বেশ খালি কামরা। সে একদিকের একজনের আলাদা সিটে জানালার কাছে বসে গেল। ট্রেনটা প্ল্যাটফরম ছেড়ে যেতেই বুঝল, গরম বাতাস ঝাপটা মারছে। যেন লু বইছে। ঘরবাড়ি ইলেকট্রিকের তার ইস্পাতের মতো চকচক করছে। কাক–শালিখের ওড়াওড়ি গরমের ত্রাস থেকে। তার কেমন মজা লাগছিল। সে কেমন তার নিজের কাছে ফিরে যেতে পারছে। অফিসে এ-সময়টায় সে তার এয়ারকণ্ডিশান ঘরে বসে থাকে। এখন সে বসে আছে নিরন্তর এক দাবদাহ সঙ্গে নিয়ে। দমদমে গাড়িটা থামবে। ভিড় বাড়ছে। ব্যারাকপুর এলে, আরও। দু-একজন দাঁড়িয়ে আছে। একজন ষণ্ডামার্কা লোক তার দিকে এগিয়ে এসে বলল, সরে বসুন।
সে মাঠ দেখছে। এরাই সেইসব লোক, যারা তার গোত্রের। এদের সুবিধাভোগী লোক বলা হয়। সুযোগ পেলেই অন্যের সুখ কেড়ে নেয়। নিজের সুখ তৈরি করে।
কি বলছি শুনতে পাচ্ছেন!
সে শুনতে পেল না।
সরে বসতে বলছি। দুজন হয়ে যায়।
হয় না। একজন বসতে পারে। অময় না তাকিয়েই বলল। অময় কঠিন মুখে যুবকটিকে দেখল। তার হাতের কবজি শক্ত। লোমশ বুক। চোখে জ্যৈষ্ঠ ঘাসের খরতাপ। টের পেরেই যুবকটি কাকে যেন ডাকতে গেল। কতটা হুজ্জোতি হতে পারে অময়ের কেন জানি আজ দেখার আগ্রহ। আর তখনই দেখল, একজন বুড়ো মতো মানুষ ওদিকটায় দাঁড়িয়ে আছে। সে ডাকল, শুনুন। কাছে এলে বলল, দাঁড়িয়ে আছেন কেন, বসুন না। বলে সে সরে বসে বুড়ো মানুষটিকে জায়গা করে দিল। পাঁচ-সাতজন জড়ো করে সেই যুবক এসে দেখল, লোকটা রোদের মধ্যে গরম বাতাসের হলকায় পুড়ছে। পাসে একজন বুড়ো মানুষকে বসিয়ে রেখেছে। নিতান্ত হতদরিদ্র, গালে বাসি দাড়ি। গায়ে প্যাঁচপ্যাচে ঘামের গন্ধ। যুবক দাঁত শক্ত করে বলল, একজনের সিট বলছিলেন।
অময় তাকাল না।
অময় জানে, এরা ট্রেনের নিত্যযাত্রী। এরা গাড়িটাকে পর্যন্ত নিজের বাপের মনে করে। শুয়োরের বাচ্চা সব।
শুনতে পাচ্ছেন?
না।
অময় মাঠ দেখছে।
এখন দু-জনের সিট হল কী করে?
অময় জবাব দিল না। বুড়ো লোকটিকে সে বলল কোথায় যাবেন!
রেজিনগর নামব। ওখান থেকে দু-ক্রোশ পথ।
এই রোদে হেঁটে যেতে পারবেন?
যুবকটি এবার তার সাঙ্গপাঙ্গদের বলল, কি রে কি বুঝছিস! ধরব নাকি!
অময় ভ্রূক্ষেপ করল না। গম্ভীর গলায় বলল, ট্রেনের জানালায় আজকাল রড দেওয়া থাকে দেখছি।
