তার এই প্রাণপাতের মূল্য কেউ দেয় না। সে এত কষ্ট করে বাড়িটা করেছে, অথচ এখন দেখছে খুঁতের অন্ত নেই। ঝুনুকে সে কিছুতেই খুশি করতে পারে না, গ্যারেজের বন্দোবস্ত নেই। বললে কথায় কথায় খোঁটা, যেমন মানুষ, তার তেমন বাড়ি। অথচ সস্তায় জমিটা পেয়ে যাবার পর অময় ভাবতেই পারেনি, কখনো সেখানে তার বাড়ি উঠবে। মানুষের ঘরবাড়ি এক বয়সে যে জীবনের স্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায় বাড়িটা করার সময় সে টের পেয়েছে।
অময় বলল, কালই বাড়ি যাচ্ছি। সে টাইম টেবিল দেখল। বারোটায় ট্রেন আছে একটা। নতুন চালু হয়েছে। সকাল সাড়ে আটটার ট্রেনে ভিড় হয়।
ঝুনু ও-ঘর থেকে বলল, তোমার কী মাথা খারাপ! এই গরমে কেউ বের হয়। এত দূরে কেউ যায়। এক ফোঁটা বৃষ্টি নেই, চারপাশে আগুন জ্বলছে, তিনি বাড়ি যাবেন।
আমার কিছু হবে না।
তোমার হবে না, আমাদের হবে।
ছোটো পুত্রটি বোঝে লেগে গেল দুজনে। সে বলল, ক-টা দিন পরে গেলে কি হয় বুঝি না!
কটা দিন পরে গেলে মানে, বৃষ্টি বাদলা হলে এত গরম থাকবে না। একটানা কতকাল থেকে যেন আকাশ দিনের বেলা আগুন হয়ে আছে। কালবৈশাখী পর্যন্ত টের পাওয়া গেল না। দুপুরে দরজা জানালা বন্ধ করে না দিলে গরমের হলকায় শরীর পুড়ে যায়। কেবল ঠাণ্ডা জল, তেষ্টা বাড়ে, দরদর করে ঘাম, লোডশেডিং হলে বাড়িতে প্রায় মড়াকান্না শুরু হয়—হেন ধুন্ধুমার যখন চলছে তিনি বাড়ি যাবেন!
অময় বলল, ওখানে কি মানুষজন থাকে না? ওখানে কি আমার মা বেঁচে নেই, ভাইবোনেরা বেঁচে নেই?
ঝুনু বলল, বেঁচে আছে। ওকে বেঁচে থাকা বলে না।
মাথায় দপ করে আগুনটা ছড়িয়ে পড়ে। আত্মপর মনে হয় ঝুনুকে। অময় আর ঝুনুকে কিছু না বলে অফিসে বের হয়ে গেল।
পরদিন সকাল সকাল উঠে পড়ল অময়। ফোনে কথা বলল, দু-একজনের সঙ্গে। এখন এসে লাভ হবে না এমন জানাল। সে বাড়ি থাকছে না। দেশে যাচ্ছে। রান্নার মেয়েটাকে বলল, এগারোটায় বের হবে।
ঝুনু সব শুনছে। কিছু বলছে না। দিন দিন কেমন জেদি একগুঁয়ে হয়ে উঠছে এত জেদ ভালো না, ভালোর জন্যই বলছি, অভ্যাস নেই, গরমে কিছু একটা হলে গাঁজায়গায় কে কি করবে! ঝুনু খুবই ক্ষেপে গেছে। তার কথার কোনো দাম থাকে না সংসারে। খুশিমতো চলে। সময় অসময় বুঝবে না। মার চিঠি পেয়ে উতলা। মা জানে না, ছেলের কষ্ট হবে। কি অবুঝ মা! এমন মা সংসারে থাকে ঝুনুর কিছুতেই মাথায় আসে না। নিজের দিকটা ষোলো আনা, নিজের জেদ ষোলো আনা—কিছুতেই এখানে এসে থাকবেন না। তা আমার সংসারে ভালো লাগবে কেন! নিজের সংসার ফেলে এখানে থাকবেন কেন! কিছুতেই দু-পাঁচদিনের বেশি থাকতে চান না। সে নিজেও চিঠি লিখেছিল, এত গরমে আপনার কষ্ট, গরমের সময়টা এখানে কাটিয়ে যান। চিঠির উত্তরই দেননি। যেমন মা, তেমন তার ছেলে, বেশি ভালো হবে কোত্থেকে?
ঝুনু না পেরে বলল, যাবেই ঠিক করেছ?
দেখতেই তো পাচ্ছ।
ঝুনু বুঝতে পারছে, বাবুর গোঁ উঠেছে। তার সাধ্য কি, ধরে রাখে। সারাদিন প্যাঁচপ্যাচে গরমে তারও মাথা ঠিক নেই। তবু যখন যাবেন বাবু, যাক। মজা বুঝে আসুক। কপালে যা আছে হবে।
সে এক বোতল বরফ ঠাণ্ডা ফোঁটানো জল দিল। রাস্তার টিফিন দিল। বার বার বলে দিল, রাস্তার কিছু খাবে না। যেন বাবুটি খুবই ছেলেমানুষ—একবার মার কথা মাথায় চেপে বসলে কেমন দিগভ্রান্ত হয়ে যায়। সংসারে মা-ই সব, ক্ষোভে অভিমানে সে যে জ্বলছে বুঝতে দিচ্ছে না।
ছাতা নাও সঙ্গে।
লাগবে না।
তবু অ্যাটাচিতে জোরজার করে ছাতা ঢুকিয়ে দিল। টর্চলাইট, জলের বোতল, রাস্তার টিফিন কোথায় রেখেছে বলে দিল। ট্যাক্সি এলে অময় উঠে বসল। ঝুনু গেটে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় ট্যাক্সিটা চোখের উপর থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলে ঝুনু ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
এই ক্ষোভ কত মারাত্মক হতে পারে অময়ের মুখ দেখলে টের পাওয়া যায়।
অময় ভিতরে ভালো নেই। মাঝে মাঝে মনে হয়, সুখ সচ্ছলতা মানুষকে অমানুষ করে দেয়।
তার বাবার চাষবাস, জমিজমা, গৃহদেবতা, গোরুবাছুর এই ছিল সম্বল। মাটির ঘরে সে জন্মেছে, বড়ো হয়েছে। পড়াশোনা করেছে, আবার জনমজুরদের সঙ্গে দরকারে জমিতে নিড়ি দিতে বসে গেছে। বাবার সঙ্গে থেকে চাষবাসের যে আলাদা একটা মাধুর্য আছে সে টের পেয়েছিল। দরকারে ভাইবোনেরা মিলে পাট কেটেছে, খালের জলে পাট জাব দিয়েছে—চাষবাস থাকলে সংসার যেমনটা হয়ে থাকে আর কি? গোরুর দুধ দোয়ানোর কাজটা সেই করত। কলেজ থেকে ফিরে অনেকদিন সে গোরু নিয়ে জমির আলে আলে ঘাস খাইয়েছে। এর মধ্যেও আশ্চর্য মাদকতা আছে। কাঁচা ঘাস খাওয়ালে দুধ ঘন হয়, কাঁচা ঘাস খাওয়ালে দুধ বেশি দেয় এসব সে নিজের হাতে করে দেখেছে। প্রকৃতির মধ্যে গোরুর দড়ি ধরে হেঁটে যাওয়া, সবুজ ঘাসের খোঁজে থাকা, অনেক কিছুর মধ্যে নিরন্তর এই আগ্রহের খবর ঝুনু জানেই না।
আসলে সে যে বাড়ি যায়, মার চিঠি পেলে স্থির থাকতে পারে না, রক্তে সেই স্বাদ সুপ্ত হয়ে আছে বলে। কেমন এক মুক্তির স্বাদ। বাবাকে দেখে বুঝেছিল, জড়িয়ে থাকা যেমন জীবনের লক্ষণ আবার প্রয়োজনে উপেক্ষা করার মধ্যেও আছে মুক্তির স্বাদ।
সে স্টেশনে গিয়ে দেখল, জম্মু-তাওয়াই এক্সপ্রেস প্ল্যাটফরমে দাঁড়িয়ে আছে। ওটা ছেড়ে দিলেই লালগোলা প্যাসেঞ্জার প্ল্যাটফরমে ঢুকবে।
