তক্তপোশ বিছানার দরকার—বাবা আছেন।
রান্না-বান্নার ইউটেনসিল—বাবা আছেন।
তার মাথা গরম হয়ে গেছিল। দু-তিন মাসের শিশুকে নিয়ে যে এভাবে থাকা যায় না, সে বোধটুকু পর্যন্ত পুত্রের নেই। ফ্ল্যাটে বেসিন, বাথরুম সব ঠিকঠাক। জল আসে না। জল আসে, ঝি আসে না—এটা যে দেখে নেওয়া দরকার অসংসারী পুত্রের মাথায় তাও কাজ করেনি। যেন বউমা গেলেই তার কল থেকে জল গড়গড় করে পড়বে—তার সকালের টিফিন ঠিকঠাক হয়ে যাবে, অফিসে লাঞ্চ, রাতে ফিরে দেখবে খাওয়ার টেবিলে সব ঠিকঠাক আছে। এগুলোর জন্য যে বন্দোবস্ত রাখতে হয়, সেটা বোধহয় পুত্রের মাথাতেই ছিল না। তার ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠেছিল, কিন্তু বউমা খারাপ ভাবে ভেবে পুত্রটি কত অবিবেচক তাও প্রকাশ করতে পারেনি। গ্যাস থেকে আরম্ভ করে সবকিছুর বন্দোবস্ত করে ফিরে আসতে তার প্রায় দু-হপ্তা লেগে গেছিল।
একবার শুধু বলেছিল, তুই কী রে! সামান্য বোধ-বুদ্ধিটুকুও নেই। কিছু ঠিকঠাক না করে হুট করে লিখে দিলি বউমাকে দিয়ে যাও।
তার জবাব শুনে সে থ।—আমি লিখলেই তুমি পাঠাবে কেন! অসুবিধা হবে যখন জানতে, নিয়ে এলে কেন। ও পারবে কেন? তোমারই উচিত ছিল না নিয়ে আসা। পুত্রটি যেন বুঝিয়ে দিতে চাইল কাণ্ডজ্ঞানের অভাব কার বোঝো!
এরপর আর কী কথা বলা যায় মাথায় আসেনি। সে কোনোরকমে প্রায় নরকবাসের মতো কটা দিন কাটিয়ে দিয়েছিল। নিজের উপর প্রতিশোধ নেবার জন্য ইস্টকোস্ট ট্রেনের দ্বিতীয় শ্রেণির কামরায় উঠে বসেছিল। নিজেকে নির্যাতন করার মধ্যেও কোনো ক্ষোভ লুকিয়ে থাকে, ফেরার সময় সেটা সে টের পেয়েছিল।
সে তার ক্ষোভ থেকেই সহসা কেন যে স্থির করে ফেলল, বাড়ি যাবেই। যত গরমই হোক, যত লু-এর হলকা চলুক সে যাবেই। বাড়ির নামে ঝুনু তটস্ত হয়ে থাকে।
পঁয়ত্রিশ-ত্রিশ বছরে ঝুনু তার স্বভাব পালটে দিয়েছে। শহরবাসের ফল। নিজের বাড়িঘর, দোতলা বাড়িতে তিনটে প্রাণী—সে ঝুনু আর ছোট ছেলে। রান্নার লোক, ঠিকে ঝি উচ্চবিত্ত পরিবারে যা যা থাকবার সবই আছে তার। স্ত্রীর কলেজ, তার অফিস, ছোটো ছেলে সি-ই-এস-সি-র ম্যানজমেন্ট ট্রেনি, তবু ঝুনুর নাই-নাই বাতিক। সে বাড়ি যাবে বললেই ঝুনুর মুখ গোমড়া—ঠিক অসুখবিসুখ বাধিয়ে ফিরবে, এই ভয় নিরন্তর। গাঁয়ের বাড়িতে আলো পাখা নেই। বাথরুমের অবন্দোবস্ত, জানলা ছোটো, ঘরে হাওয়া ঢোকে না, মাটির ঘর, চারপাশে গাছপালা, ঝোপজঙ্গল, সাপের উৎপাত আছে, কিছু একটা হলে কে এসে পাশে দাঁড়াবে। বাড়ি যাব বললেই ঝুনুর তিক্ততা বেড়ে যায়।
এসব কারণে সে ইচ্ছে হলেই যেতে পারে না। গেলে আর ফিরে আসবে না এমনও আতঙ্ক থাকে ঝুনুর। সে কত বুঝিয়েছে, ওখানে আমি বড়ো হয়েছি, আমার অভ্যাস আছে, পাখা আলো না থাকলেও অসুবিধা হবে না। অবশ্য সে জানে অসুবিধা তার ঠিকই হয়। কিন্তু ভাইবোনদের মধ্যে কয়েকদিন কাটিয়ে আসতে পারলে আশ্চর্যরকমের মুক্তির স্বাদ পায়। তার যেন আয়ু বাড়ে। ঝুনু তার এই অমল আনন্দ থেকে যতদিন পারে বঞ্চিত রাখার চেষ্টা করে। শেষে সে মরিয়া হয়ে উঠলে, ঝুনুর সেই এক বস্তাপচা উপদেশ, জল ফুটিয়ে দিতে বলবে। বাসি খাবার খাবে না। রাতে টর্চ নিয়ে বের হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
বয়স যত বাড়ছে, তত তার ক্ষোভ পাহাড় প্রমাণ হয়ে উঠছে। মনে হয় সবাই অবিবেচক। মণিটা এত অমানুষ, চিঠিতে ভয় দেখিয়েছে, যা অবস্থা তাতে তোমার ভাইকে জনমজুর খাটতে হতে পারে। আসলে মাসোহারা সে যা দেয় তাতে সংকুলান না হবারই কথা। মা-ও মাঝে মাঝে চিঠি দেবে, আর কটা টাকা বেশি দিস। বাজার দিনকে দিন গরম, এতে চলে কী করে! দারিদ্র্য কাকে বলে বাড়ি গেলে সে টের পায়। মা আলাদা। মণি আলাদা। বড়দা আলাদা। বড়দা রিটায়ার করে, পাশেই আলাদা বাড়ি করেছেন। রিটায়ার করার পর পেনশন, প্রভিডেন্ট ফাণ্ড মিলে যা সঞ্চয় অভাব থাকার কথা না। দাদা বউদি মেয়ে দুই ছেলে তার। তারও নাই নাই ভাব। পাছে মাকে উপুড় হস্ত করতে হয়, যতটা না অভাব তার চেয়ে বেশি ছদ্মবেশ। মাঝে মাঝে সে উত্তপ্ত হয়ে উঠলে না বলে পারে না, তুমি মাকে কিছু দিতে পার না দিলে মা কত খুশি হয়!
কোত্থেকে দি অময়। আমার তো ঘাড়ের উপর শমন। নামাতে পারছি না, রাতে অনিদ্রায় ভুগি, বল কি করে দিই।
মণি, তুই বিয়ে করে বসে থাকলি! বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে আমার ঘাড়ে চেপে বসলি। নিজে কিছু করার চেষ্টা কর। আমি আর কতদিন। কেবল মিলুর সচ্ছল সংসার। মিলুর ইস্কুলে চাকরি, তার বর সরকারি চাকুরে, এক ছেলে—বাড়িঘর নিজের। এরা তার এককালে কাছেপিঠে ছিল। এখন কেমন সবাই ভিন্ন গ্রহ তৈরি করে নিয়েছে। বাড়িতে গেলে এইসব পোকামাকড়ের উপদ্রবের মধ্যেও তার মনে হয় সে আবার তার কৈশোর যৌবনে ফিরে এসেছে।
মার খুব ইচ্ছে ছিল, বাড়িটা শহরে না করে দেশে করলে সবাই দেখত, কত লায়েক তার ছেলে—কিন্তু ঝুনুর এককথা, আমি এত টানতে পারব না। থাকব এখানে, আর বাড়ি করবে দেশে। ইচ্ছে হয় কর, কিছু বলব না। সেখানে তুমি ভাইবোনদের নিয়ে সুখে থাকো, আমার কপালে যা আছে হবে।
কলকাতায় যার বাড়ি, সংসারে যার চারজন প্রাণী এবং সবাই উপার্জনশীল, তার কাছে সবার প্রত্যাশা একটু বেশি পরিমাণে-অময় তা বোঝে। কিন্তু যে যার রোজগার মতো মর্যাদা বাড়িয়ে নেয়। ঝুনুকে বললে, এককথা, কি আছে, বাড়ি করেছ, গ্যারেজের কোনো ব্যবস্থা রাখোনি। তোমার ক্ষমতায় না কুলায়, ছেলেরা তো আছে। গ্যারেজ না থাকায় বাড়িটা কেমন দাম হারিয়ে ফেলছে দিনকে দিন। বাড়িতে গ্যারেজের ব্যবস্থা না থাকায় কখনো অশান্তি হয় সে আগে জানত না।
