বললাম, এই লক্ষ্মী, দে তো। পেয়েছি।
অরূপা বলল, কী পেয়েছ?
বাসাটা।
কোথায়?
এতক্ষণে লক্ষ্মী এসে বাঁশটা আমার হাতে তুলে দিয়েছে।
আমি ছুটে বাড়ির পেছনটায় বের হয়ে গেলাম। পেছনে অরূপা কেবল বলছে, কোথায় যাচ্ছ।
আরে, তোমার সেই কামিনী ফুলের গাছটায় কাকটা বাসা বানাচ্ছে। তোমার বাড়িতেই তার সংসার।
অরূপা থমকে গেল। তারপর কী ভেবে সঙ্গ নিল। যেতে যেতে বলল, বাঁশটা আমাকে দাও।
অরূপা চাইতেই পারে। এত জ্বালিয়েছে, তার সাধের ফুলগাছ ন্যাড়া করে দিয়েছে কাকটা—তাকে শায়েস্তা করার অধিকার তারই।
আর কেবল প্রশ্ন, কোথায়, কই দেখছি না তো!
গাছটার নীচে নুয়ে কিছুটা এগিয়ে ডালপালার মধ্যে মাথা গুঁজে কানে কানে বললাম, ওই দ্যাখো গাছের মাথায়।
অরূপা কী দেখল কে জানে! তারপর আমার হাত থেকে ঝুল-ঝাড়ার বাঁশটা কেড়ে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।
ছোটো পুত্রও তখন নেমে এসেছে, কেবল বলছে, কী হয়েছে বাবা?
আমি বললাম, কিছু না।
শুধু জোরে ডাকলাম, কী হল অরূপা, দাও।
না, এবারেও সাড়া পাওয়া গেল না।
ভিতরে ঢুকে বললাম, দাও। কোথায় রাখলে বাঁশটা!
অরূপা কিছুটা ক্ষোভের গলায় বলল, নিজের কাজ কর গে। ওটা আছে, থাক না। বাড়িতে গাছ থাকবে, পাখি থাকবে না, সে কী করে হয়! বলে মুচকি হেসে সিঁড়ি ধরে সে বাঁশটা নিয়ে উপরে উঠে গেল।
ছোটো পুত্রও সিঁড়ি ধরে মাকে অনুসরণ করছে, আর কেবল বলছে, কী হয়েছে মা–বাঁশটা দিয়ে বাবা কী করবে?
কী করবে তিনিই জানেন। তোমার বাবা তো ওইরকমেরই!
শেকড়
সে আজকাল টের পায় সূর্য তার আকাশে আর মধ্যগগনে নেই—হেলে পড়েছে। এই বয়সে উপদ্রব কমবার কথা–কমছে না। বরং বাড়ছে। পোকামাকড়ের উৎপাতে সে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। জীবনে বোধহয় এমন সব উৎপাত সব মানুষকেই কামড়ায়। অহরহ সে জ্বলছে। কোনো উৎপাত থাকবে না জীবনে তাই বা হয় কী করে। তবু তার মনে হয় সবাই তাকে পেয়ে বসেছে। সংসারের সব দুর্ভোগের দায় তার। জায়া থেকে জননী সবারই অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। সে কাউকে খুশি করতে পারেনি।
চিঠিটা পাবার পরই এমন সে ভাবছে।
অভিযোগ, তোমাকে আমি পেটে ধরিনি। সেই কবে পুজোর সময় বাড়ি ঘুরে গেলে, আর এ-মুখো হওনি। আমি বেঁচে আছি কি মরেছি তার খোঁজখবর পর্যন্ত নাও না। আমি মরে গেলে তোমরা রক্ষা পাও বুঝি। ভগবান কেন যে আমাকে নেয় না!
আসলে আট-দশ মাস হয়ে গেল, কিছুতেই বাড়ি ঘুরে আসার সময় পাচ্ছে না সে।
দু-পাঁচদিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি ঘুরে এলে মা খুশি হবে সে জানে। বেশি তো দূর না। ট্রেনে পাঁচ ছ-ঘন্টাও লাগে না। বাড়ি যেতে পারছে না বলেই ক্ষোভ। শীতের সময় ভেবেছিল যাবে। কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এত ঠাণ্ডায় কষ্ট পাবে বলেই ঝুনু রাজি হয়নি। তার ঠাণ্ডার ধাত আছে। অসুখবিসুখ বাধিয়ে ফিরলে কে দেখবে!
সংসারে সে টের পায়, সবার সব কিছু হতে পারে, কেবল তাকে নীরোগ থাকতে হবে। স্বাস্থ্য অবশ্য তার অটুট। গত বিশ-ত্রিশ বছরের মধ্যে সে কোনো অসুখে ভুগেছে মনে করতে পারে না। তার একটাই অসুখ—ভাইবোন স্ত্রী-পুত্র সবাই ভালো থাকুক। সবাই সুখে থাকুক। কেউ সুখে নেই চিঠি পেলে সে অস্থির হয়ে ওঠে। তার এই দুর্বলতা সবাই টের পেয়ে গেছে। বড়ো পুত্রটিকে নিয়ে পুজোর পর থেকে বড়ো রকমের ঝামেলায় পড়ে গেছিল। তার ছোটাছুটির শেষ ছিল না। কোথায় হায়দরাবাদ, সেখানে বদলি। বড়ো পুত্রটি আজ দু-তিন বছর ধরেই একটা না একটা ঝামেলা সৃষ্টি করে চলেছে। বোকারোতে পোস্টিং। জুনিয়ার একজিকিউটিভ ট্রেনিং। ট্রেনিং শেষ হতে না হতেই মারাত্মক জণ্ডিস। তাকে বাড়ি নিয়ে আসা, চিকিৎসা এবং আরোগ্য লাভের পর ডাক্তারের পরামর্শ মতো বিয়ে। কোথায় থাকবে, কী খাবে, এই দুশ্চিন্তায় সে অস্থির ছিল। অনিয়ম অত্যাচার থেকে রিলাপস করলে ভোগান্তি। বিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দিন। পাঠিয়ে দিয়েছিল—দু-পাঁচ মাসও পার হয়নি, বৌমা অন্তঃসত্ত্বা। আর বাচ্চা হবার দু-তিন মাস বাদেই হায়দরাবাদে ছ-মাসের জন্য অস্থায়ী বদলি।
অস্থায়ী বদলির ক্ষেত্রে স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু বড়ো পুত্র কেমন নিরুপায় তার। সে একা থাকতে ভয় পায়। অতিরিক্ত মাত্রায় ইনট্রোভার্ট। অপরিচিত জায়গায় সে নির্বান্ধব অবস্থায় থাকতে রাজি নয়, ফ্ল্যাট ভাড়া করে চিঠি, বউমাকে দিয়ে যাও। চিঠি পেয়ে মাথা গরম—বন্ধুবান্ধবরা ঠিকই বলেছে, এত অল্পবয়সে বিয়ে দেওয়া তোমার ঠিক হয়নি। ম্যাচিওরিটি গ্রো করেনি। তা তেইশ চবিবশ বছরে কে আজকাল আর ছেলের বিয়ে দেয়।
কিন্তু তার যে গলায় কাঁটা। এমন স্বভাব, পুত্রটি নিজে কিছু করে নিতে শেখেনি। ট্রেনিং পিরিয়ডে মেসে ছিল। তারপর বাসা নিয়েছে। কাজের লোক পাঠাও। কাজের লোক গেল। তারপর ব্যাধি। অন্তত তার পুত্রটির ভালোমন্দ দেখার কেউ থাকুক সে এটা চাইত। বিয়ে দিলে দুশ্চিন্তার হাত থেকে নিস্তার পাবে এটাও ছিল এক ধরনের স্বস্তি।
ছোটো। কী আর করা! বউমা নাতি আর সে প্লেনে সোজা হায়দরাবাদ। ঘন্টা দুই লাগে ঠিক, তার আগে টিকিট কাটা থেকে, সংসার করতে অতি প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিস, তালিকা মিলিয়ে নেওয়া—কতটা নেওয়া যাবে, ওজনের প্রশ্ন আছে, নাতির কাঁথা বালিশ ফিডিং বোতল এবং ছোটো স্টোভ, এ-ধরনের কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটা করে এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সিতে শ্রীনিবাসনগর কলোনিতে দোতলায় ফ্ল্যাটে উঠে অবাক। মাত্র একটা ক্যাম্প খাট আর ভি আই পি সুটকেস ছাড়া ঘরে কোনো আসবাব নেই। জল নেই। একদিন অন্তর জল, এমন বিপাকে মানুষকে পড়তে হয় সেই প্রথম টের পেল। পুত্রটির ধারণা, বাবা আছেন।
