আরে ছুটছ কেন, পড়ে যাবে তো। ঝুলঝাড়ার বাঁশ নিয়ে ছুটতে গেলে আমার এমনই মনে হল।
সঙ্গে সঙ্গে গলায় ঝাঁজ-সরো, সরো, সব শত্রু, শত্রু শত্রু। এই তো বড়োটা হোস্টেলে গেছেন-ইঞ্জিনিয়ারিং আর কেউ পড়ে না। বাড়ির কথা কারও মনে থাকে না। একটা চিঠি পর্যন্ত নেই, বাড়ির কারও হুঁশ আছে।
আরে গেছে, চিঠি দেবে। পোস্টঅফিসেরও তো গণ্ডগোল হতে পারে। ছেলেমানুষ।
বাড়ির সবাই ছেলেমানুষ? আমার হয়েছে মরণ—
কাকটা কোথায় জানি না। কথার সোজা জবাব দিচ্ছে না। বাঁকা-ত্যাড়া জবাব রাগ হয় না! সক্কাল বেলা, এক কাপ চা পর্যন্ত নেই। লক্ষ্মী কলপাড়ে—কী করছে। সেখানে?
যাই হোক কিছুটা বেহায়ার মতোই বললাম, কাকটা কোথায়? কী ক্ষতি করছে তোমার?
আমার মাথা চিবোচ্ছে! তোমার তাতে জল ঢালতে হবে না।
ঝুলঝাড়ার বাঁশটা হাতে নিয়ে অরূপা খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। চোখে জ্বালা। যেন কাকটা এসে কখন বোগেনভেলিয়া গাছটার বসবে এবং সে তাকে আড়াল থেকে মারবে সেই অপেক্ষায় আছে। এতক্ষণে লক্ষ্মী আমার হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে গেছে—এমনকী আমি যে তার পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি তাও খেয়াল নেই। আমিও অরূপার এধরনের ছেলেমানুষি ক্ষোভে মজা পাই—পৃথিবীতে সবকিছু এত অনিত্য অথচ তার মধ্যে অরূপার হাবভাব যেন, বাড়িটা থেকে সে কোনওদিনই নড়বে না, তার একই রকম বয়স থাকবে। একই দুর্ভাবনা থাকবে। একই আন্তরিকতা থাকবে পৃথিবীতে মেয়েরা বোধহয় সব কিছু এতটা চিরস্থায়ীভাবে বলেই সামান্য একটু এদিক ওদিকেই তারা সহজে ভেঙে পড়ে।
যাই হোক আমি বললাম, কাকটা কী ক্ষতি করেছে তোমার?
কী আবার করবে! কাল সারাদিন গাছটার এসে ঝাপটাচ্ছে। গাছটার কী কালশত্রু রে বাবা!
ঝাপটালে ক্ষতির কী?
ক্ষতি! আমার মুণ্ড। এই লক্ষ্মী, শিগগির ওদিকে যা।
পাঁচিলটার পাশে গিয়ে কামিনী ফুল গাছটার আড়ালে বসে পড়।
তা হলে কাকের প্রতিপক্ষ এখন দুজন। দুজন দু’দিক থেকে কাকটাকে জব্দ করবে বলে বসে আছে। আমি তৃতীয় পক্ষ হতে চাইলে গলায় আবার ঝাঁজ। তোমাকে দিয়ে হলেই হয়েছে!
কেন হবে না?
তোমাকে দেখলে কাকটা আরও বেশি মজা পাবে।
কেন মজা পাবে!
পুরুষমানুষের নির্বুদ্ধিতা ওরা ঠিকই টের পায়।
তার মানে?
মানে আর কী? অতশত বলতে পারব না।
কাকটা কি মেয়ে কাক?
তবে আর বলছি কী!
কী করে বুঝলে?
বা রে, বুঝব না! কাল থেকে গাছটার ঝাপটাচ্ছে আর যাবার সময় ঠোঁটে ডাল নিয়ে উড়ে যাচ্ছে।
ডাল নিয়ে উড়ে যাবে কেন? কাকটার কি শত্রুতা আছে তোমার সঙ্গে?
কী জানি, কার কী শত্রুতা কখন কীভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, আমি কী করে বুঝব!
আর সেই সময় ঠিক উড়ে এল কাকটা। উড়ে এসে বসল পাশের বাড়ির কার্নিশে। গাছটার সঙ্গে তবে সত্যি শত্রুতা আছে কাকটার। গাছটাকে প্রায় ন্যাড়া করে দিয়েছে। আরও অবাক, কিছু বোঝার আগেই গাছটা থেকে ছোঁ মেয়ে একটা ডাল মুখে নিয়ে উড়ে চলে গেল। দুজন প্রতিপক্ষ ঠায় দাঁড়িয়ে। কিছুই করার বিন্দুমাত্র সময় পেল না।
কাকটা উড়ে যাচ্ছে। ডালের সর্বত্র লাল সাদা ফুল। হালকা সরু তারের মতো ফুলের ডাল-বড়ো হালকা, সহজেই মট করে ভেঙে নেওয়া যায়।
অরূপা আর অপরূপা থাকল না। সেই এক অরূপা হয়ে গেল। হা-হা করে উঠল—দেখলে তো! দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছ, একবার তেড়ে গেলে না!
আমি বললাম, অরূপা বুঝছ না কাকটা বাসা বানাবে। নিতে দাও না।
বাসা!
হ্যাঁ তাই। মাঘ-ফাল্গুন মাসে এরা বোধহয় গর্ভবতী হয়।
তাই বলে আমার অমন সুন্দর গাছটাকে ন্যাড়া করে দেবো ফুলের ডাল নিয়ে উড়ে যাবে! আর কোথাও কিছু পেল না।
সবাই তো সুন্দর ফুলের ডালপাতা দিয়ে বাড়িঘর সাজাতে চায়। কাকটার দোষ কোথায়?
অরূপা ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, কাকের আবার সুন্দর অসুন্দর কী! তুমিও যেমন। আসুক ফের, দেখাচ্ছি মজা!
তখন কাকটা পাশের বাড়ির নিমগাছটার বসে আছে। ঠোঁটে ফুলের ডাল। উড়বার জন্য ঘাড় বাঁকিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। প্রথমে মনে হয়েছিল, নিমগাছের ডালেই বোধহয় বাসা বানাচ্ছে।
অরূপা বলল, তাড়িয়ে দিয়ে এস না। মনে হয় ওই গাছটাতেই থাকে কাকটা। দূরে কোথাও তাড়িয়ে দিলে পথ ভুল করে আসতে পারবে না। যাও না গো!
এমন অনুরোধ উপেক্ষা করি কী করে! নামতে যাব, দেখি কাকটা আবার উড়তে শুরু করেছে। এখন পাঁচিল না টপকালে চলবে না। হাতে ইটের টুকরো হুস করলেই কাক উড়ে পালায় জানি। আর তখনই দেখি কাকটা ফের উড়তে শুরু করেছে। ঠোঁটে ফুলের ডাল। উড়তে উড়তে পাশের বাড়ির পেয়ারা গাছের ডালে বসে গেল।
অরূপাকে বললাম, কাছে কোথাও কাকটা বাসা বানাচ্ছে। বাসাটা ভেঙে দিতে পারলে কাকটার উচিত শিক্ষা হবে।
অরূপাও বলল, চল তো দেখি। লক্ষ্মীর হাতে এখন ঝুল ঝাড়ার বাঁশ, সেও লাফিয়ে বাড়ির পেছনে ঢুকে গেল।
কিন্তু হাতে একগাদা কাজ। সক্কাল বেলায় একটা কাকের পিছ ধাওয়া করলে, কত দূরে নিয়ে যাবে কে জানে! মনে মনে খুবই বিরক্ত। কিন্তু সংসারের শান্তি বলে কথা, অরূপার অনুরোধ উপেক্ষাও করতে পারছি না। বললাম, আমি দেখছি, ডালটা নিয়ে কোথায় যায়—লক্ষ রাখছি।
এতক্ষণে মনে হল, অরূপা খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়েছে। কাকটাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেলে কিংবা তার পিছু ধাওয়া করলে এদিকে আসতে আর সাহস পাবে না। চুপিচুপি তাড়া করতে গিয়ে দেখি বাড়ির পেছনে কামিনী ফুলের গাছটার কাকটা নিশ্চিন্তে উড়ে এসে বসেছে। আর দেখলাম, গাছটার মাথায় পরিপাটি করে সে তার বাসা বানাতে ব্যস্ত। বোগেনভেলিয়ার ডাল দিয়ে সে তার বাসস্থান গড়ে তুলছে। পাশে আর একটা কাক—বাসাটা ভেঙে না দিলে সমূহ বিপদ। এত কাছে বাসা বানাবার উপকরণ থাকতে কাকটা দূরে উড়ে যাবে ভাবাই যায় না। সন্তর্পণে ঘরে ঢুকে ঝুল-ঝাড়ার বাঁশটার খোঁজ করতেই অরূপা বলল, কী ব্যাপার? পেলে?
