সঙ্গে সঙ্গে গলায় ঝাঁজ-সরো তো, কাজের নামে অষ্টরম্ভা, কেবল পেছনে লাগা। আমাকে তুমি শেখাতে এস না।
তা অবশ্য ঠিক, সে জানতেই পারে, কারণ বি. টি কলেজের একটা কামিনী ফুলের গাছের নীচেই অরূপার সঙ্গে প্রথম আলাপ আমরা তখন বিটি ট্রেনিং, কলেজের আলাদা ছাত্রাবাসে থাকি। একসঙ্গে কমিউনিটি ডাইনিং হলে খাই, ক্লাস করি একই হলঘরে। ডাইনিং হলে যেতে, ক্লাসরুমে যেতে, এমনকি ক্যান্টিনের রাস্তায় যেতেও গাছটা পড়ে। গাছ কত বড়ো হয়, আমাদের সংসারই তার প্রমাণ। গাছ কত বড়ো হয় বলা বোধহয় খুবই অনুচিত কাজ হয়েছে।
আসলে গাছটার নীচে দাঁড়িয়েই সে ডেকেছিল—এই যে শুনুন।
আমাকে না অন্য কাউকে, বুঝতে পারিনি। তবু ঘাড় ফিরিয়ে দেখতে গেলে হাতের ইশারায় ডেকেছিল, শুনুন না।
মাসখানেক হল ছাত্রাবাসে তখন আমরা আছি। একজন সুন্দরী যুবতী ডাকলে এমন কোন মহাপুরুষ আছে যে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারে! আমিও পারিনি। যতদিন যতবার সে আমার খোঁজ করেছে, ততবারই দেখেছি, সে দাঁড়িয়ে আছে কামিনী ফুলগাছটার নীচে। বর্ষা আসতে না আসতেই টের পেলাম, গাছটা আর একা নেই, ডালপালা ঝাঁকিয়ে অজস্র রেণুর মতো সাদা ফুলে ছেয়ে গেছে। ফুলের সুঘ্রাণে চারপাশটা ম-ম করছে।
অবশ্য সেসব কবেকার কথা—বিশ-বাইশ বছর আগেকার স্মৃতি। অরূপা আর কামিনী ফুলের গাছটা কেন যে আমার স্মৃতিতে এখনও সমার্থক হয়ে আছে বুঝতে পারি না।
সে যাই হোক বাড়িটা করার পর যেখানে যেটুকু ফাঁকা জায়গা ছিল সব শান বাঁধানো হয়ে যেতেই অরূপা ক্ষেপে গেল—এটা কী করলে! একটু মাটি নেই।
চারপাশের পাঁচিল আগেই তোলা হয়ে গেছে। চারকাঠা জমি, জমির এদিক ওদিক কিছু ফাঁকা জায়গা রাখলে যেন ভালোই হত। গৃহপ্রবেশের দিনই অরূপা বলল, বাড়িতে না থাকলে এমনই হবে জানতাম। আমার মতামতের কোনও দাম নেই।
তারপরেই অভিযোগ, একটু মাটি রাখলে না, ফুল ফলের গাছ না লাগালে বাড়িটা কখনও বাড়ি মনে হয়!
কথাটা মিছে না। কিন্তু অরূপা বোঝে না—আগাছা সাফ করার লোক শহরে কম। বৃষ্টিবাদলার দিনে এত বুনো ঘাস জন্মায় যে সাফ করে কুল করা যায় না। পোকামাকড়ের উৎপাতও থাকে। এসব আছে বলেই তিনকাঠা জমিতে বাড়ি করে বাকি ফাঁকা জায়গা ইট সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে ফেলেছি। অরূপার আগ্রহও বজায় থাকবে, তাকে বলেছিলাম, তোমার জন্য সুন্দর সব টব বানিয়ে দেব। যত পার ফুলের গাছ লাগিও। এবং অরূপার ইচ্ছেতেই বারান্দায় বিশাল ঢাউস টব, পেছনেও আছে ফুলের টব। এবং অরূপার ইচ্ছেতেই মাটি ফেলে কিছুটা জায়গা করে দেওয়া হল—কোথাও সে মরসুমি ফুলের চাষ পর্যন্ত করেছে।
কিন্তু বারান্দা এবং পেছনের ঢাউস দুটো টব তাকে যথেষ্ট নাড়া দিয়েছে। কী লাগানো যায়! অর্থাৎ এমন গাছ লাগাতে হবে—যাতে বাড়ির সৌন্দর্য বাড়ে অথচ গাছের ডালপালায় বাড়িটা না ঢেকে যায়।
এরপর বারান্দায় ঢাউস টবটায় সে কোথা থেকে সব ক্যাকটাস এনে লাগাতে থাকল। ক্যাকটাসগুলোর কপাল খারাপ—বছরখানেক যেতে না যেতেই অরূপার কেন যে মনে হয়েছিল, এমন সুন্দর ছিমছাম বাড়িটায় ক্যাকটাস বেমানান। এটা তার আরও মনে হয়েছিল চন্দননগরে আমার কাকার বাড়ি গিয়ে। বাড়িটা ঘুরে দেখল, বোঝাই যায় তিনি খুবই শৌখিন মানুষ, তাঁকে তার নিজের বাড়িটা না দেখালেই নয়, এবং তিনি এসে বললেন, খোলা বারান্দার টবে ক্যাকটাস কেন? বাড়ির সামনে ক্যাকটাস লাগাতে নেই। বরং এখানে একটা বোগেনভেলিয়া লাগিয়ে দাও। ফুল ফুটলে বাড়িটার এক আশ্চর্য আকর্ষণ তৈরি হয়।
বোগেনভেলিয়া লাগাবার সময় তার সতর্কতা ছিল প্রখর। অবশ্য শুধু বোগেনভেলিয়া কেন, সব ব্যাপারেই। ভালোবেসে একজন বেকার মানুষকে বিয়ে করার পর থেকে সে চারপাশের কীটপতঙ্গ সম্পর্কে বড়ো সজাগ ছিল। সজাগ ছিল বলেই আমার বাড়ি হয়েছে, কৃতী মানুষ হয়েছি—ছেলেরা জয়েন্ট দিয়ে কৃতী হবার মুখে।
নার্সিংহোম থেকে বের হচ্ছি, সবই অবশ্য কবেকার কথা, বৃষ্টি পড়ছিল, অরূপা ডাকল, এই যে শোনো—সেই গলা যেন, সেই কামিনী ফুলের গাছটার নীচে সে আমায় যেভাবে ডাকত। কোলে তার নবজাতক, মহীয়সীর মতো তাকে কোলে নিয়ে বসে আছে।
চলে যাচ্ছ, পাজিটা যা জ্বালায়! বললে না তো কী রকম হয়েছে দেখতে!
ভালোই তো! বেশ সুন্দর!
চলে আসছি, ফের ডাকল, এই যে শোনো।
বলো।
এতদিন ছিল অরূপা, এখন একেবারে রাজমহিষী।
অর্ডার—
যাবার সময় রথের মেলা থেকে একটা কামিনী ফুলের গাছ নিয়ে যাবে।
গাছ!
হ্যাঁ চারাগাছ। বলেই আমার কোলে তুলে দিয়ে বলল, একটু আদর কর না। লজ্জা এবং সঙ্কোচ দুই তখন আমাকে কাতর করেছে। কী যে করি!
কামিনী ফুলের গাছটা না থাকলে, তার ফুল না ফুটলে, তার সুঘ্রাণ না ছড়ালে সে আমরা কেউ কাউকে চিনতামই না।
গাছটা লাগানো খুবই জরুরি।
কোথায় লাগাব?
আমি যাই। দুজনে লাগাব। অরূপার দুচোখ দুষ্টুমিতে ভরা।
কপর্দকশূন্য অবস্থা থেকে দুজনের মিলিত সংগ্রামে বিশ-বাইশ বছরে এতদূরে আসা কম মানুষের সৌভাগ্যেই ঘটে। এসবের জন্য সব কৃতিত্বই অরূপার প্রাপ্য। বাড়ির গাছপালা সম্পর্কে যেমন সজাগ, ছেলেদের সম্পর্কেও তেমনি। আসলে অরূপা বোধহয় ভেবেছে, জীবনটাই ফুলের বাগান। তার জন্য জল চাই, সার চাই, আগাছা বেছে দিতে হয়। এই আন্তরিকতাই আজ আবার তাকে নতুন একটা বিপাকের মুখে ফেলে দিয়েছে। সেটি একটি সামান্য কাক।
