অরূপার এখন শত্রুপক্ষ, সরকার।
ইংরেজি তুলে দেওয়ার বিষয় ছাড়া তার যেন আর কোনও অভিযোগ নেই।
আবার অরূপার গলা পাওয়া গেল।
শত্রু, সব শত্রু।
আমি সব শুনতে পাচ্ছি।
কে শত্রু? সরকার, না আমি, ঠিক বুঝতে পারছি না। রেগে গেলে তার মুখে এক কথা, জানা আছে—সবাই একরকম। তুমি সাধু সেঝে কাঁহাতক আর জ্বালাবে।
সংসারে এমনই বুঝি হয়। অরূপার মান-অভিমান বোঝাও ভার। কেন যে হঠাৎ হঠাৎ বিরূপ হয়ে যায় তাও বুঝি না।
আজ এমন শত্রুপক্ষকে নিয়ে পড়েছে, যে স্কুল পর্যন্ত কামাই করতে বাধ্য হয়েছে। কাজের মেয়েটিকে বলছে, দ্যাখ তো এবার এল কিনা।
না, আর শুয়ে থাকা নিরাপদ নয়। সামান্য জটিলতা থেকে কীভাবে যে দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়, এবং একমাত্র আসামি বলতে এই মহাপুরুষটি, ঠিক অভিযোগের অজুহাত শেষ পর্যন্ত আমার উপরই বর্তাবে।
বললেই হল, তুমি শুয়ে থাকতে পারলে! বাড়িতে কত বড় সর্বনাশ, আর তুমি শুয়ে শুয়ে মজা উপভোগ করছ, তুমি মানুষ না অপদেবতা!
কাজের মেয়েটি বোধহয় অরূপার কথায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি, তা যে কোনও কারণেই হোক অরূপা চেঁচাচ্ছে, তোকে কী বললাম, কাকটা আবার এল কিনা দ্যাখ।
না, মারাত্মক কিছু নয়। সামান্য একটা কাক। আজ তবে একটা কাক নিয়ে অরূপা দুশ্চিন্তায় ভুগছে, স্কুলে ইংরেজি পড়ানো নিয়ে নয়।
আড়মোড়া ভেঙে লেপ-টেপ সরিয়ে উঠে পড়লাম। ডাকলাম, এই লক্ষ্মী, লক্ষ্মী চা দে।
ঘুম থেকে উঠে আমার এক কাপ চা চাই। চা না হলে শরীরের জড়তা কাটে না। শুতে শুতে রাত বারোটা হয়ে যায়। পড়াশোনার বাতিক থাকলে যা হয়। এখন বদ অভ্যাসটি এমন হয়েছে যে একটু সকাল সকাল শুলে রাত একটা দুটোর আগে ঘুম আসে না।
কিন্তু কারও কোনও সাড়া পেলাম না।
খাট থেকে নেমে চটিতে পা গলাতে গেলাম।
নীচে সাড়া নেই কেন, এমন তো হয় না!
শালটা গায়ে জড়িয়ে বেশ জোরেই হাঁকলাম, আমার চা, চায়ের কী হল?
নীচ থেকে ঝাঁজের গলা, রাখো তোমার চা, এই লক্ষ্মী, খবরদার চা-ফা এখন হবে না। তোর কাজ তুই কর—যা গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে থাক। এলেই ঢিল ছুঁড়ে মারবিশেষের কথাটা আমাকে না কাকটাকে উদ্দেশ্য করে বুঝতে পারলাম না।
বাড়িটার কথা এবারে বলা যাক।
বাড়িটা আমার দোতলা। উপরতলায় থাকি। নীচে বসার ঘর, ডাইনিং হল, কিচেন, সামনের খোলা বারান্দায় একটি বোগে ভেলিয়ার গাছ ঢাউস একটি টবে ডালপালা মেলে অজস্র ফুল নিয়ে ফুটে আছে। আমার পড়ার বাতিক, আর অরূপার গাছ লাগাবার বাতিক। আপাতত এই সকালে আমি উপরে, ও নীচে।
মানুষ নানারকমের দুশ্চিন্তা নিয়ে বাস করতে এমনিতেই একটু বেশি ভালোবাসে। দুশ্চিন্তা না থাকলে মানুষের বেঁচেও সুখ নেই। তাও সামান্য একটা কাক, সাতসকালে কাকটা এমন কী উপদ্রব শুরু করল যে অরূপার এত মাথা গরম।
আর অরূপা এও জানে সকালে ঘুম থেকে উঠে হাতের কাছে চা না পেলে মেজাজ গরম হয়ে যায়। অথচ কারও সাড়া নেই—কী করছে ওরা?
খেপে গিয়ে বললাম, কাকটা কি তোমার মাথার চুল ঠুকরে তুলে নিচ্ছে। কোনও সাড়া নেই।
চুল ঠুকরে তুলে নিলেই দেখছে কে। মরেছি কি বেঁচে আছি, তাও কি কেউ দ্যাখে। এ বাড়িতে কারও তো কুটো গাছটি নেড়ে দেখার অভ্যাস নেই। মুখে মারিতং জগৎ–কখন থেকে শুধু চা আর চা করছে। নীচে এসে দ্যাখ, শুধু হুকুম করে খালাস। এমন লক্ষ্মীছাড়া বাড়ি—কাকটাও টের পেয়েছে।
এরপর আর উপরে চায়ের আশায় বসে থাকা ঠিক না। নিশ্চয়ই বাড়িতে কাকটার উপদ্রবে সবাই তটস্থ। চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নীচে নামতেই হল, নীচে ঠান্ডা একটু বেশি।
নীচের করিডোরে উঁকি দিলাম। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ডাইনিং স্পেস পার হয়ে খোলা বারান্দায় চোখ গেল—দেখি অরূপার হাতে একটা লম্বা ঝুল ঝাড়ার বাঁশ-রণ-রঙ্গিনী চেহারা।
লক্ষ্মী ধারে কাছে কোথাও নেই।
হলটা কী তোমাদের। সক্কালবেলায় শেষে একটা কাকের পেছনে লেগেছ!
লাগব না! গাছটাকে কী করেছে দ্যাখো।
খোলা বারান্দার টবের সেই বোগেনভেলিয়া গাছটা—শহরের বাড়ি-ঘরে যা হয়, জায়গা কম, অথচ ইচ্ছে অনেক—যেখানে যতটুকু ফাঁকা জায়গা, নানা গাছ আর ক্যাকটাসে ভর্তি। টবটায় বোগেনভেলিয়ার ঝোপ-শীত বসন্তে যেন ফুলের দ্যাখরে বাহার। তবে বছর দুই-তিন আগে গাছটা তেমন ফুল দিচ্ছিল না। গাছ বুড়ো হলে এমনই হয় বলেছিলাম।
আমার দিকে তাকিয়ে অরূপা শুধু বলেছিল, তোমার মুণ্ড হয়।
বুঝতে পারলাম অরূপা আমার সিদ্ধান্ত মানতে রাজি না।
সে সার এনে গুঁড়ি খুঁড়ে এবং গত বর্ষার কিছুটা ডালপালা হেঁটে গাছটাকে আবার সতেজ করে তুলেছে। এটা যে বুড়ো গাছ বোঝাই যায় না এখন। ফুলও এসেছে কেঁপে। গোটা বারান্দা এবং বাড়ির আলাদা সৌন্দর্য গড়ে তুলেছে গাছটা। বাড়িটার কথা কারও মনে থাকলেও, একবার দেখলে গাছটার কথা কেউ ভুলতে পারে না। গেরস্থের রুচিবোধের প্রশংসা করতেই হয়।
যেন এই বোগেনভেলিয়া গাছটা বাড়ির প্রাণ। আর কারও কাছে না হলেও, অরূপার বুঝতে কষ্ট হয় না।
এটা অরূপার স্বভাব। যেখানে যেটুকু ফাঁকা জায়গা সেখানেই ফুলের গাছ। পেছনের খালি জায়গায় রজনিগন্ধা, গন্ধরাজ, কাঠমালতী ফুলের গাছও লাগিয়েছে অরূপা। কামিনী ফুলের গাছটা লাগাবার সময় না বলে পারিনি—তুমি কি পাগল! কামিনী ফুলের গাছ কত বড়ো হয় জানো?
