আমারও তাই। যেন ওটা নিলেই এতদিনের সব রহস্য আমার মরে যাবে বিজু। আমি সবকিছু হারিয়ে ফেলব। অথবা এক জীবন থেকে অন্য জীবনে ঢুকে যাব। বড়ো ভয় করে বিজু।
অন্ধকারটা কখনো ফিকে হয়ে যাচ্ছে। দুজন লোক কথা বলতে বলতে এদিকে এগিয়ে আসছে। মানুষের কী যে আছে। অন্ধকারে মানুষ অন্য রকমের হয়ে যায়। এবং যে বিজুটা এমন দেখতে সুন্দর, চোখ তুলে কারো দিকে তাকায় না, ঘন অন্ধকারে সেও সব কেড়ে নিতে চাইছে। সে নিজের সঙ্গেই আবার কথা বলল, বিজু আমাদের বাড়িতে একদিন এস না। বাবা-মার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। তা হলেই আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে যাবে। তুমি আমি, তারপরই হুঁস করে একটা সাদা রঙের গাড়িতে দেখল, সে বিজুর সঙ্গে হাইওয়ে হয়ে ছুটে যাচ্ছে। কিছুটা বড়ো জোরে গাড়ি চালাচ্ছে হাওয়ায় চুল এলোমেলো হয়ে গেল। বুকের আঁচল পড়ে গেল। বিজু একটা সিগারেট ধরি বিজু তুমি সিগারেট খাও কেন। সিগারেটের গন্ধ আমার একদম সহ্য হয় না। আমার বমি বমি পায়। তোমাকে সব দেব বিজু। ফুলটা। লক্ষ্মীটি, সিগারেট খেও না।
—সত্যি দেবে?
মাথা নীচু করে রাখল শ্রাবণী।
—কী কথা বলছ না কেন?
–কী বলব বিজু।
—এই যে বললে ফুলটা আমাকে দেবে।
—তোমরাই তো কেউ না কেউ নেবে। কত গোপনে তাকে রক্ষা করে আসছি। কেলে পাগলা সুনীলদাটা একবার দেখতে চেয়েছিল।
—দেখিয়ে ছিলে? শ্রাবণী চুপ।
–কী কথা বলছ না কেন বিজু।
–এ সব কথা বলা যায়?
-আমার খুব হিংসে হচ্ছে।
–তোমার হিংসে হবে কেন।
তুমি তো আমার দিকে ফিরেও তাকাও না।
—শ্রাবণী তোমার নাম। তুমি সুন্দরভাবে হেঁটে যাও। যখন যাও পৃথিবীর এমন কোন অহংকারী যুবক আছে তোমার দিকে না তাকিয়ে থাকতে পারে।
আর তখনই বাড়ির কাছাকাছি বড় শিরিষ গাছটার নীচে সে এসে গেল। আর ভয় নেই। ওর ঘরের জানলাটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। পাশের বাড়িগুলোয় কেউ মাসি কেউ মেসো। সুতরাং বেশ অবজ্ঞা ভরে সে হেঁটে যেতে থাকল। সারাটা অন্ধকার রাস্তায় সেই সুন্দর মতো ছেলে বিজুটা ছিল বলে যতটা ভয় বাপার কথা ছিল তা সে পায়নি। এমন সুন্দর ছেলেরা পাশে না থাকলে পৃথিবীতে বাঁচারও কোনো অর্থ হয় না। গাছটার নীচে সেই তিনজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে এবং মনে হল দূর থেকে ওরা শিস দিয়ে হাতে তুড়ি মেরে কি একটা গান গাইছে। পাশে যেতেই গানটা কেন যে তার ভালো লেগে গেল। অনেক পুরোনো হিন্দি ফিল্মের গান-ওরা নিজেরাই তুড়ি দিয়ে অন্ধকার আকাশের নীচে গাছের আবছা অন্ধকারে গাইছে—জেরা বাচকে জেরা হাটকে—বোধ হয় তাকে উদ্দেশ্য করে গাইছে। সে প্রায় দৌড়ে এবার বাড়ির দরজায় ঢুকে গেল। এদিকটায় লোডশেডিং ছিল না বলে সত্যি বাবা-মা বসে বসে টেলিভিশন দেখছে। তার সামান্য অভিমান হল। বাবা বললেন, এলি। মা বললেন, অভিযান’ বই হচ্ছে। আয় তাড়াতাড়ি আয়। সে গেল না। বারান্দায় বসে থাকল। আসলে সে বেশ ঘামছিল। পাখা ছেড়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকল। বাবা-মার সঙ্গে আরও দু-তিনজন বসে আছে।
কাজের লোক শ্যামলাল এখন বাবুর মতো একেবারে টিভির ফুট তিনেক দূরে বসে আছে। খুব কাছে থেকে ভালো করে দেখতে না পেলে তার মন ভরে না। একটু দূর থেকে এ সে দেখে না। আর মার পান সাজা, বাবার সিগারেট, কখনো গেট খোলার দরকার হলে—এই এমন ধরনের ফুট-ফরমাস বাদে তাকে দিয়ে। এখন আর কোনো কাজই করান যাবে না। শ্রাবণীর খুব জলতেষ্টা পেয়েছে। অথচ উঠতেও ইচ্ছে করছে না। ভিতরটা কেমন মাঝে মাঝে আশ্চর্য সব চিন্তায় অবশ হয়ে যেতে থাকে।
শ্রাবণী উঠে পড়ল। বাথরুমে ঢুকে চোখে-মুখে সামান্য জল দিয়ে মুখ মুছল তোয়ালে। শরীরের গরমটা যাচ্ছে না। সে আপাতত ঘাড়ে গলায় জল দিয়ে শরীরটাকে সামান্য ঠান্ডা করতে চাইল। কিন্তু পারছে না। সে তবু বাথরুম থেকে। বের হবার আগে সামান্য হালকা প্রসাধন করে নিল। বাবা বসে রয়েছে কে জানে।
শত্রুপক্ষ
সকালেই অরূপার গলা পাওয়া গেল।
সে কী যেন বলছে। বেশ জোরে জোরে। কিছুটা তিরস্কারের ঝাঁঝ আছে কথায়।
সাধারণত এত সকালে কেউ বাড়িতে জোরে কথা বলে না। তিরস্কার তো নয়ই। জোরে কেউ কথা বললেই সে রেগে যায়।
তার তো বাড়িতেও থাকার কথা না। স্কুলে চলে যাওয়ার কথা।
আজ স্কুলে গেল না কেন তাও বুঝতে পারছি না।
সকাল আটটার আগে আমার সাধারণত ঘুম ভাঙে না। শীতের সকাল দেখতে দেখতে বেলা হয়ে যায়। অরূপার মর্নিং স্কুল। কখন সে স্কুলে বের হয়ে যায় টেরও পাই না। কারণ নিঃশব্দে অরূপা সিঁড়ি ধরে নামে। চা করে এবং খায়। তার এই সকালে বের হয়ে যাওয়ার দরুন কারও বিন্দুমাত্র অসুবিধে হয়, কিংবা ঘুম ভেঙে যাক, সে চায় না। অরূপার সহজে স্কুল কামাইও করে না। শরীর খারাপ হলে সে আগেই জানিয়ে দেয়, জ্বরজ্বালা যাই হোক না, স্কুলে যে সে যাচ্ছে না জানতে আমার অসুবিধে হয় না।
সে ইংরেজির শিক্ষিকা। সে মনে করে ছাত্রীদের সম্পর্কে তার আলাদা একটা দায় আছে।
এমনিতেই স্কুলে ইংরেজি পড়ানো নিয়ে সরকার যেভাবে বিরূপ হয়ে উঠছে এবং সরকার যেভাবে স্কুল থেকে ধীরে ধীরে ইংরেজি তুলে দেবার তালে আছে তাতে সে ক্ষুব্ধ। গোড়াতে ইংরেজি পড়িয়ে যাদের শেষ পর্যন্ত কিছু হয় না, ক্লাস সিক্স থেকে ইংরেজি পড়িয়ে তাদের কতটা উপকার হবে অরূপা বুঝতে পারে না।
