–পাগলামির কী। মেয়েদের বিয়ে একদিন করতেই হয়।
শ্রাবণীর বলার ইচ্ছে হল, বিয়ের ইচ্ছে আমার বারো পার না হতেই। কিন্তু বিয়ে করলে সব পৃথিবীটা একজনের হয়ে যায় বাবা। সেটা কেন বোঝ না। শ্রাবণীকে চুপ করে থাকতে দেখে মা বলল, ছেলের মতো ছেলে।
-সব ছেলেই ছেলের মতো ছেলে।
মা কী ভেবে বলল, তোর কী অন্য কাউকে পছন্দ। তবে সেটা বল।
শ্রাবণী বলতে পারত, যখন যেখানে যত সুন্দর ছেলে দেখি সব আমার পছন্দ। তাই বলে তারা একজন কেউ আমার সব অহংকার লুটে পুটে খাবে। আর আমি একটা মরুভূমির বাঘের পাল্লায় পড়ে যাব। আর শ্রাবণীর এটা হয়, অপছন্দের কিছু হলেই সেটা তার কাছে মরুভূমির বাঘের মতো মনে হয়। সুনীলদা, সূর্য, সমীরণ, বিজু এরাও সেই চেয়ে এসেছে। কাউকে আমি কিছু দিইনি। দিলেও ফুলটি অক্ষত রেখেছি। আর সেই লোকটা তাই এখন মজা করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে।
শ্ৰবণী বলল, কাউকে পছন্দ করতে আমার বয়েই গেছে। তারপরই কেমন ভার ভার গলায় বলল, আচ্ছা মা, আমার কী বয়েস, পড়াশোনাটাও তোমরা শেষ করতে দেবে না।
বাবা খুব উঁচু লম্বা মানুষ। খুব সুপুরুষ। বাবার মতোই সে দেখতে হয়েছে। বাবার মতো মেয়ে দেখতে হলে খুবই পয়মন্ত হয়। সুতরাং মেয়েটার সব কিছুতেই সুখ হবে—এবং তিনি সব সময়ই ভাবেন, খুব আদুরে মেয়ে বলে সামান্য বোকা। নিজের ভালোমন্দ বোঝার বয়স হয়নি। তিনি কাছে বসে মাথায় হাত রেখে বললেন, সব সময় তো ভালো ছেলে পাওয়া যায় না।
শ্রাবণী কিছু বলল না। এ-সময় কিছু বলাও যায় না। এক মাস ধরে শুধু তার কথাই ভেবেছে। বিয়ের বছর খানেক তার কথাই ভাববে। তারপর বাসের সেই কাকা বাবা মেসো হয়ে যাবে। শ্রাবণী ফিক করে নিজের মনেই গোপনে হেসে দিল। এই হচ্ছে জীবনের মজা।
বাবা বলল, আমি ওদের কথা দিয়েছি।
শ্রাবণী বলল, আমাকে এত কেন বলছ বুঝি না।
শ্রাবণী আর দাঁড়াল না। সে ভাবল, এত সব সুন্দর গাছপালা বৃক্ষের মধ্যে এতদিন সে বেশ বেঁচে ছিল, এখন একটা গাছের সঙ্গে তাকে বেঁধে দেওয়া হবে। সে হেসে দিল কথাটা ভেবে। শরীরের রক্ত টগবগ করছে। ভেতরে কেউ যেন ঘোড়ায় চড়ে ছুটছে। এটা কিছুতেই থামছে না।
সে তার বাবা-মার সঙ্গে চুপচাপ খেয়ে নিল।
সে শোবার আগে খুব সুন্দর করে সাজল। তারপর আলাদা। বৈঠকখানার আগের ঘরটা তার। বাঁদিকে ব্যালকনি, ভেতরে বাবা-মার ঘর। রান্নাঘর স্টোর রুম। সে তার ঘরে ঢুকলে বুঝতে পারে এখন আর তার সঙ্গে তার বাবা-মার ঘরের কোনো সম্পর্ক নেই। সে খিল তুলে আয়নায় দাঁড়াল। স্নান করেছে। চুলে শুকনো তোয়ালে। সে তোয়ালে খুলে আয়নায় সামনে দাঁড়াল। শরীরে ঘোড়সওয়ার তেমনি টগবগিয়ে ছুটছে। সারাটা রাস্তায় সে গাছপালা বৃক্ষের ছিল। এখন সে একটা গাছের সঙ্গে বন্দি হয়ে যাবে। সে তার নখে নেলপালিশ লাগাল। চোখে আইগ্লাস ছিল। সে তার সব চেয়ে দামি বেনারসি বের করল। তার যা কিছু অলংকার ছিল এক এক করে পরল। পায়ে আলতা দিল। আয়নায় দাঁড়িয়ে দেখল, তার আর কি বাকি রয়েছে সঠিক সৌরভে ফুটে উঠতে। পায়ের আঙুলে সে অনেক দিন পর রুপোর ফুল পরল। আর কি বাকি আছে। বাকি, বাকি কি বাকি–কিছু নেই—তবে সে এই। এটুকু হলেই সে যুবতী, মায়াবী, মরীচিকা সব। তারপর সে তার যাবতীয় গাছপালা বৃক্ষ,—যেমন নন্তু, রমেন, সমীর, বলু, গজা, সূর্য, সাধন—যত মুখ যত প্রিয় মুখ, সবার কথা ভাবতে লাগল। এরা সবাই সেই একই আশা নিয়ে পৃথিবীতে তার পাশাপাশি বড়ো হচ্ছিল। তারা তাকে পেল না। কোথাকার একটা উটকো লোক এসে তুলে নিয়ে যাবে তাকে। সবার জন্য শ্রাবণীর কষ্ট হল। মায়া হল। বেচারা। আর এক বেচারা এখন মাথার ওপরের ঘরটায় রাত জেগে পরীক্ষার পড়া পড়ছে। গুন গুন আওয়াজে সে টের পায় সব। সবার হয়ে, সে সেই এক বেচারা বৃক্ষলতায় জড়িয়ে যাবার জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছে। রক্তে ফুটছে পদ্ম। রক্তে ফুটছে বুদবুদ। রক্তে ঘোড়া ছুটছে। রাত গভীর। সুতরাং শ্রাবণীর ক্ষুরের শব্দ ভেতরে ক্রমে আরও প্রখর হতে থাকল। সব নির্জন হয়ে আসছে। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। মা, বাবা, শ্যামলাল। সামনের বৈঠকখানা পার হলেই সিঁড়ি। দোতলার ঘর। সামনের ঘরটায় সেই বেচারা।
শ্রাবণী খুবই সতর্ক পা ফেলে উঠে যাচ্ছে। সতর্ক পা ফেলে স্বর্গের আসল সিঁড়ি ভাঙছে। ভাঙছে আর কাঁপছে প্রতিমা নির’নের মতো তার মুখ ঝলমল করছে।
কোথাও তখন বিসর্জনের বাজনা বাজছিল। শ্রাবণী যেন উঠতে উঠতে স্বর্গের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে কেবল তার বিসর্জনের বাজনার শব্দ শুনতে শুনতে সেই ঘরটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তার কোনো হুস ছিল না। সেই ঘরটা সেই কাপুরুষের ঘরটা শব্দ। ….
-তুমি আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে। কিছুই তো চাইনি। সামান্য একটা কদম ফুল চেয়েছি। যত বড়ো হয়েছি, যত বড়ো খেলোয়াড় হয়েছি সব সময় আমার জন্য কেউ একটা কদম ফুল তুলে এনেছে। বলেছে, নিন। নিতে সাহস পাইনি। কে কী বলবে। ভয় হয়েছে। যদি সত্যি নিলে রাগ করে। অথচ দেখুন কত রাতে স্বপ্নে দেখেছি, ফুলটা গাছে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে। পাড়তে গেলেই মনে হয়েছে —সেটা আর গাছ নেই। সুন্দর একটি কিশোরী লজ্জায় মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গেলে বলেছে লজ্জা করে, বিজুদা, তুমি ওটা নিয়ে নিলে সত্যি আমার আর অহংকার করার মতো কিছু থাকল না।
