আর ঠিক রাস্তার অন্ধকারে ঢুকে যেতেই মনে হল গায়ে কারও নিশ্বাস পড়ছে। শ্রাবণী আর্ত গলায় পেছনে তাকিয়ে বলল, কে!
-আমি সুন্দর মতো ছেলেটা।
–উঃ কী ভয় পেয়ে গেছিলাম।
—এত ভয় কেন?
—জানি না।
—আসুন এই অন্ধকারে একটু ঘুরে বেড়াই।
–কেন?
—এই দুজনে ঘুরব, কথা বলব।
—আর কিছু না?
—আর আর আর…
–তোতলাচ্ছেন কেন?
–মানে, আপনার চুলে এত সুগন্ধ থাকে কী করে?
–কই আমি তো পাই না।
–আমি পাই।
–আপনি পান যখন তখন প্রাণভরে নিন।
–বলছেন নিতে?
-বড়ো হতে গিয়ে বার বার মনে হয়েছে কেউ আমার মাথায় মুখ রাখুক, চুলের গন্ধ নিক।
–তবে আসুন—একটু এদিকে।
-ভয়, করে।
—আমি তো আছি।
—তবু ভয় করে।
—এত ভয় নিয়ে বেঁচে থাকেন কী করে?
—এই ভয় নিয়ে বেঁচে থাকতে কেমন মজা পাই।
—পাহাড়ে সমুদ্রে সূর্যাস্তে কোন বালিয়াড়িতে আপনি কতবার তো আমার সঙ্গে একা হেঁটে গেছেন। দুজনে কখনো ক্লান্ত হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বালিয়াড়িতে শুয়ে পড়েছি। কখনো দুজনে হাত ধরাধরি করে ছুটেছি। কত চড়াই উত্রাইয়ে উঠতে নামতে বলেছেন, তুমি আমার হাত ধর।
রাস্তাটার বাদিকে নোনা ধরা পাঁচিল। ভয় এখানটাতেই পেল। শ্রাবণী খুব দ্রুত পায়ে হাঁটছে।
-এত জোরে হাঁটছেন।
–তিনটে ছেলে কিছুক্ষণ আগে এখান দিয়ে গেছে।
–তার জন্য জোরে হাঁটার কী হল?
–ওরা ভালো না।
–ওরা কিছু ছিনতাই করে নিয়ে গেছে।
–না ওদের একজন আমাকে দেখলেই কেমন বোকার মতো তাকিয়ে থাকে।
–বোধহয় ভালোবাসে।
—ভালোবাসা এত সোজা।
–কেন, এই তো সময় সবাইকে ভালোবাসার।
–সত্যি। সুন্দর মতো ছেলে দেখলেই আমার কেন জানি তার সঙ্গে কোনো ডাকবাংলোয় রাত কাটাতে ইচ্ছে করে।
-মুরগির ঝোল, গরম ভাত।
খুব শীত। র্যাপার গায়। আকাশে কিছু নক্ষত্র, ঝাউগাছগুলির শন-শন শব্দ।
তারপর ব্যালকনিতে বসে কত কথা। কথা ফুরোয় না। ব্যালকনিতে শীতের ঠান্ডা হাত-পা জমে যাচ্ছে। তখন খুব ইচ্ছে করে দুজনে আরও একটু ঘনিষ্ঠ হতে। তারপর নরম বিছানায় কত ব্যস্ত তুমি আর আমি। জীবন কী সুন্দর লাগে তখন।
-তুমি বুঝি তাই চাওয়?
–তুমি চাও না।
—না।
—কেন মিছে কথা বল। এস না, খেলার মাঠটার ওদিকে আমরা যাই।
—চুলের সুগন্ধ নিই।
—আর কিছু নেবে না, বল।
–না চাইলে কিছুই নেব না। শ্রা
বণী উত্তেজিত হয়ে পড়ল, না না, তুমি আমার সব নিয়ে নাও।
শুধু কদমফুলটা অক্ষত রাখ।
–ওটাই তো সব। ওটা আমি নেব।
শ্রাবণীর ভেতরটা আরও বেশি ধুকপুক করছে। এই বুঝি সেই তিনটে ছেলে ওরা যদি এই নির্জন পথটায় সত্যি ছিনতাইকারী হয়ে যায়? শ্রাবণী প্রায় দৌড়ে সেই খাল পাড়ের রাস্তার দিকে ছুটে যেতে থাকল।
এ ছাড়া সে সব সময় মুখে হালকা প্রসাধন রাখতে ভালোবাসে। সে জানে মেয়েরা অনেকক্ষণ বাইরে থাকলে কিছু উটকো গন্ধ শরীরে গজাতে থাকে।
এ-সব গন্ধ থেকে আপাতত রেহাই পাবার জন্য সে সেন্ট পাউডার মেখে ঘরে ঢুকতেই বুঝল—এদের কাউকে সে চেনে না। বাবা-মার সঙ্গে এদের কবে পরিচয়! বাবা-মার সঙ্গে পরিচয় থাকলে তার সঙ্গে থাকবে না, সে হয় না। বাবার অফিসের প্রায় অনেককেই সে চেনে। দিদির বিয়েতে ছাড়াও কোনো কোনো কাজে উৎসবে তারা আসেই। সুতরাং এ-ক্ষেত্রে যতটা বিনয়ী নয়, তার চেয়েও বেশি বিনয়ী—অন্তত চোখে মুখে। কারণ এরা কেউ জানে না, মেয়েটা পড়ার ফাঁকে, রাস্তার অথবা নির্জনে, কখনো জানালায়, কতটা পর্যন্ত এলিয়ে ভাবতে পারে। সুন্দর মতো ছেলেটার সঙ্গে সে অন্ধকার রাস্তায় মনে মনে যে খেলা খেলে এল তার বিন্দুমাত্র আঁচ এখন ওরা কেন স্বয়ং ঈশ্বর দেখেও বিশ্বাস করবে না। সে প্রায় বালিকার মতো, (না তার বয়স আরও কম, কে জানে) বড়ো বেশি নিবিষ্ট হয়ে দেখছে সেই সুদূর উষর মরুভূমির মতো একটা রাস্তা ধরে নায়ক তার নায়িকাকে নিয়ে চলে যাচ্ছে। ভাঙা সেই মোটর গাড়িটির অ্যাসিস্টান্ট রবি ঘোষ মজার কথা বললেই বালিকার মতো হেসে ফেলছে সে। যখন শো শেষ হল, বাবা দেরি করলে না আর। মেয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। প্রণাম করতে বললেন। প্রণাম করার সময় ভীষণ রাগ হচ্ছিল বাবার ওপর। তারপর বাবা-মা ওদের নিয়ে বৈঠকখানা ঘরে চলে গেলেন। শ্যামলাল খুব হাসিখুশি এবং দিদিমণির সঙ্গে খুশিতে বেশ দুটো একটা রসের কথাও বলে ফেলল। আর কী এবার তুমিও চললে। খুব মজা। কেমন সুন্দর ছেলে, কত বড়ো চাকরি। তোমাকে ওরা আগেই দেখেছে। কোথায় সেটা? সে প্রশ্ন করলে বলল, ওই যে গড়ের মাঠে বড়ো একটা হলঘরে তুমি গান গেয়েছিলে—ওর মনে পড়ল, সত্যি সে একবার সবার সঙ্গে একটা গান গেয়েছিল—আর তারই জের
সেই সুন্দর মতো ছেলেটাকে সে বলল, হল তো। সব যাবে। আমার আর কোনো অহংকারই থাকবে না। তুমি যে কী একটা বোকা না। পারলে না, কিছুই পারলে না।
ওরা চলে গেলে বাবা-মাকে ভীষণ খুশি দেখাল। অথচ কেন এরা এসেছে, কী ব্যাপার কিছুই তাকে বলছে না। মেয়েটা বিয়ের নাম করলেই চটে যায়। মুখ গোমড়া করে শুয়ে থাকে—বাবা-মার জন্য মেয়েটার কষ্টের শেষ নেই, এ-সব ভেবেই হয়তো বাবা-মা বলল, এই কী, তুই এখন পড়তে বসলি। খাওয়া-দাওয়া সেরে নে।
শ্রাবণী বলল, তোমরা খেয়ে নাও। ঘণ্টা খানেক পড়াশোনা করে গা ধোব। তারপর খাব।
আজ আর পড়তে হবে না।
শ্রাবণী বলল, আবার তোমাদের পাগলামি শুরু হয়েছে।
